দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

ভিড় ট্রেনে দু’জন মেয়ের কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে তাঁদের জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম, “আপনারা কী নিয়ে পড়ছেন?” একজন অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘‘মাস্টার্স করছি৷’’ জানতে চাইলাম, “কোন বিষয়ে?” উত্তর এল, “বেঙ্গলিতে”৷ আর কথা বাড়ালাম না৷ ভাবলাম, ওঁরা বাংলা নিয়ে পড়ছেন, তা-ও বাংলা বলতে এত অনীহা! তা হলে কি আমরাই ওঁদের মধ্যে প্রকৃত অর্থেই মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে পারছি না? নাকি বর্তমান পরিস্থিতিই তাঁদের নিজগৃহে পরবাসী করে তুলছে? বর্তমান প্রজন্ম মাতৃভাষার প্রতি আবেগপ্রবণ নয়, এ আক্ষেপ আমাদের যতই থাকুক, দায় কিন্তু সকলকেই নিতে হবে৷ কারণ, একমাত্র বাঙালি নামক আজব জাতিই নিজের ভাষা না জানা নিয়ে গর্ব করতে পারে৷ নিখুঁত উচ্চারণের বদলে ইচ্ছাকৃত ভাবে শুধু অন্য ভাষা ব্যবহারই নয়, অন্য ভাষার সুরটিও বাংলার মধ্যে নিয়ে এসে শ্লাঘা অনুভব করেন অনেকেই৷
অথচ এই ভাষার জন্যই কত রক্তপাত! কত আবেগ বর্ষণ! আর যার ফলশ্রুতিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রসঙ্ঘ কর্তৃক ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারিই নির্দিষ্ট হল৷ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশ এই দিনটিকে উদযাপন করে৷ দিনটি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ বিসর্জনের দিন৷ ধর্ম, বর্ণ, জাতিগত আগ্রাসন নয়, মায়ের ভাষার প্রতি আবেগেই সেদিন ঘটেছিল গণ-অভ্যুথ্থান৷ আমরা যখন বইয়ের পাতায় পড়ি সেই ইতিহাস, আমাদের চোখের পাতা ভিজে যায়৷ আর ঠিক তখনই হাল আমলের বাঙালির বাংলা ভাষার প্রতি অসম্মানজনক আচরণ দেখলে বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হয়৷ মনে মনে শব্দ সাজিয়ে ফেলি প্রবল আক্ষেপে— “বাংলা আমার মাতৃভাষা, অবহেলা তার সয় না,/ দেখছি বাঙালি আজকাল ঠিক, বাংলাতে কথা কয় না৷”
মাতৃভাষা বিষয়টি বাঙালির জাতিসত্তার সঙ্গে জড়িত৷ আবার এর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির ঐতিহ্য তথা সংস্কৃতি৷ আমরা যদি একটু ইতিহাসটা খুঁজি তাহলে দেখব, বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠেছিল পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই৷ মহম্মদ শহিদুল্লাহ্ থেকে শুরু করে অনেকেই এটা চেয়েছিলেন৷ কিন্তু পাক গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলি জিন্নাহ্ পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশের ঢাকায় ১৯৪৭ সালের ২১ মার্চ লক্ষাধিক মানুষের সামনে ঘোষণা দেন যে, শুধুমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা৷ তখন থেকেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্মাতে থাকে৷ প্রথম পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান নিহত হওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দিন৷ তিনি ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় আসেন এবং ২৭ তারিখ জিন্নাহ্-র কথারই পুনর্ঘোষণা করেন যে, উর্দুই হবে রাষ্ট্রের একমাত্র ভাষা৷ বাংলার কোনও স্থান হবে না৷ ছাত্ররা প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় ভাষা কমিটি ৩০ জানুয়ারি প্রতীকী ধর্মঘটের ডাক দেয়৷ সেদিনই ছাত্ররা শপথ নেন যে, তাঁরা ভাষা আন্দোলন তীব্রতর করে তুলবেন৷ সিদ্ধান্ত হয়, ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের৷ পরের দিনই ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সমস্ত রাজনৈতিক দলের একটি সভা হয় মৌলানা হামিদ খান ভাসানির সভাপতিত্বে৷ গঠিত হয় চল্লিশ সদস্যের একটি সর্বদলীয় জাতীয় ভাষাসংগ্রাম কমিটি৷ সেই কমিটি ৪ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটের সমর্থন জানায়৷ ৪ তারিখ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্তব্ধ হয়ে যায়৷ ভাষা আন্দোলনকে তীব্রতর করতে রাজ্যজুড়ে ২১ ফেব্রুয়ারি হরতালের ডাক দেওয়া হয়৷
পরিস্থিতি বুঝে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করে সমস্ত সভা, মিছিল বা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে৷ ভোটের কথা মাথায় রেখে বিরোধী দলের নেতারাও সরকারের সঙ্গে সংঘাতে গেলেন না৷ আবার সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে স্থির করে ১৪৪ ধারা অমান্য করা ঠিক হবে না৷ এ দিকে একরোখা সিদ্ধান্তে অনড় ছাত্রসমাজ পালটা ঘোষণা করে, ‘‘মানব না৷’’ ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবিভাগ চত্বরে, যেখানে এখন মেডিক্যাল কলেজ সেখানে ছাত্ররা জমা হন৷ সেখানে সভা করে তারা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রাবাসের সামনে জড়ো হতে থাকেন৷ মিছিল করে তাঁরা এগোতে থাকেন আইনসভার দিকে৷ যেটি এখন জগন্নাথ হল৷ পুলিশ তাঁদের পথ রুদ্ধ করে৷ শূন্যে চালানো গুলির শব্দে বা কাঁদানে গ্যাসে ভয় পেয়ে পালিয়ে না গিয়ে ছাত্ররা তাঁদের লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে যান৷ মাতৃভাষার অপমানের জ্বালায় ওঁরা প্রাণ বাজি রাখতেও প্রস্তুত৷ পুলিশের গুলিতে কয়েকটি তাজা প্রাণ ঝরে পড়ে৷ তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত, মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র রফিকউদ্দিন আহম্মেদ এবং গফরগাঁয়ের তরুণ চাষি আবদুল জব্বার৷ ব্যাঙ্ককর্মী আব্দুস সালামকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরেই মৃত ঘোষণা করা হয়৷
পরের দিন, ২২ তারিখ সব বিধি লঙ্ঘন করে হাজার হাজার মানুষ এসে যোগ দেন ছাত্রদের সঙ্গে৷ দেহগুলি পাওয়া যায়নি৷ তবে দেহ ছাড়াই শেষকৃত্যের প্রার্থনা করা হয় মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে৷ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ের পর বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়৷ কিন্তু একুশের অভিজ্ঞতা সর্বস্তরের মানুষের মনে যে ঝড় তুলেছিল তা থেকেই মানুষ জোট বেঁধেছিলেন মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ মহিমায় স্থাপনের৷ আর তাই ১৯৭১ সালে মাতৃভাষার বিজয়গর্বে গর্বিত প্রথম রাষ্ট্র বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করলো৷ বাংলা ভাষার জন্য একটা গোটা রাষ্ট্রের নির্মাণ তথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভাষাদিবসের স্বীকতি— এ তো বাঙালির কাছে পরম গৌরবের৷ এ ছাড়া বাংলার সাহিত্যসম্ভার তো রয়েইছে৷
কিন্তু বাঙালির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা ইতিহাস সচেতন নন, তথা ঐতিহ্যবিমুখ সেটাই যে সত্যে পরিণত হচ্ছে৷ এই আত্মবিস্মৃত জাতি যে আজ কথায় কথায় But বলেন, হিন্দি কিউ কি-র প্রভাবে বাংলায় কেন কি বলেন! তাঁদের কাছে আবেদন, ইতিহাসের পাতায় একটু চোখটা বুলিয়ে নিন৷ তাহলে ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’ বলতে গেলে নিজেরাই লজ্জায় মুখ ঢাকবেন৷
(লেখক জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজের সহকারী অধ্যাপক। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here