অনল আবেদিন

একজনের বাড়ি লালগোলায়। তিনি মাইনুদ্দিন শেখ। অন্যজন অনন্ত চৌধুরী। বাড়ি বহরমপুর শহরের খাগড়া এলাকায়। দু’জনেই আজ ষাটোর্ধ্ব। অভিধান মতে ‘হুজুর’ মানে প্রভু। অর্থাৎ স্রষ্টা। দু’জনেরই সৃষ্টিকর্ম সেবাধর্ম ঘিরে। এবং বিনা পারিশ্রমিকে। ভুল হল, তাঁরা ঘরের খেয়ে ও নিজেদের গাঁটের টাকা খরচ করে ‘বনের মোষ তাড়ান’।
ভুল করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমান্ত স্টেশন লালগোলায় চলে আসেন বহু অসহায় ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীনরা। তাঁদের আশ্রয়, চিকিৎসা ও পথ্য দিয়ে সুস্থ করার পরে তাঁদের নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া মাইনুদ্দিনের সৃষ্টিকর্ম। আর নিজের গাঁটের কড়ি খরচ করে ‘জনান্তর’ নামের একটি পত্রিকা ও দু’পৃষ্ঠার আর একটি কাব্যপত্র প্রকাশ করেন অনন্ত চৌধুরী। তারপরে বহরমপুরের রাজপথে পথচারীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিলি করা অনন্তের সাধ ও সাধনাও বটে। পত্রিকার সঙ্গে তাঁর কাছ থেকে উপরি উপহার হিসাবে মেলে নিষ্পাপ মিষ্টি হাসি ও এক কাপ লাল চা। এটাই তাঁর সাহিত্যসেবার ব্রত পালন।
মাইনুদ্দিন ও অনন্তের আড়ালে আবডালে অনেক লোকজন তাঁদের ‘পাগল’ বলেন বটে। দুই হুজুর সে কথা ভালো মতোই জানেন। তবু তাঁদের ভ্রুক্ষেপ নেই। থাকবে কী করে? স্বয়ং ঈশ্বর নাকি অহৈতুকী আনন্দ পাওয়ার জন্য বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। এঁরাও অহৈতুকী আনন্দ পেতে ‘পাগলপারা’ কর্মে মগ্ন।
মাইনুদ্দিন সাদামাটা লোক। দেখতে আটপৌরে আম-পাবলিকই বটে। তবুও তিনি অনন্য। জমাট বাঁধা নিকষ কালো মেঘের গর্ভে যেমন লুকানো থাকে বজ্র নির্ঘোষ, তেমনটাই তিনি। চরাচরের আঁধার চিরে যেমন বিদ্যুৎ রেখা চতুর্দিকে তার নিজের উপস্থিতি জানান দেয়, তেমন ভাবেই প্রায় সাড়ে চার দশক আগে তাঁর নিজের কিশোরবেলায় মাইনুদ্দিন শেখ অজান্তেই তাঁর মহানুভবতা জানান দেন লালগোলা ও কলকাতার মানুষের সন্নিকটে।
‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র কাজে তাঁর যখন হাতেখড়ি, তখন তিনি নবম শ্রেণির কিশোর। তাঁরই সমবয়সী এক কিশোরকে উদভ্রান্ত অবস্থায় লালগোলা বাজারে ঘুরে বেড়াতে দেখে মাইনুদ্দিনের মনে সংশয় জাগে। অবশেষে জানতে পারেন, অসহায় ভবঘুরে কিশোরের নাম কবীর কাজি। বাড়ি কলকাতা। তারপর বেশ কয়েকদিন ধরে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে কবীরকে তার কলকাতার বাড়িতে পৌঁছে দেন মাইনুদ্দিন। পরোপকারে তাঁর হাতেখড়ি এ ভাবেই। লালগোলা রেল স্টেশন থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দূরে প্রসাদপুর গ্রামের সম্পন্ন চাষি পরিবারে মাইনুদ্দিনের জন্ম।
বাংলাদেশ লাগোয়া পদ্মাপাড়ের লালগোলায় দেশের সীমান্ত রেলস্টেশন। সেখান থেকে দু’কিলোমিটার দূরে কৃষ্ণপুর স্টেশনে আছে লোকোশেড। এটা ট্রেনের বিশ্রামাগার। এখানেই ট্রেনের ইঞ্জিন বদলানো হয়। ফলে পূর্বরেলের শিয়ালদহ বিভাগের কৃষ্ণনগর-লালগোলা শাখার ট্রেনের সওয়ারি ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীনদের বরাবরের আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ লাগোয়া লালগোলা স্টেশন ও কৃষ্ণপুর স্টেশন। অস্থায়ী আশ্রয় না হয় হল, কিন্তু পেটের দানাপানির কী হবে? পেটের জ্বালা মেটাতে হাত পাতলে খাবারের দোকানের গরম তেল, ফুটন্ত জল ও লাঠির আঘাতের মতো অনেক কিছুই অতি সহজেই ওই অসহায়দের শরীরে বরাদ্দ হয়। সেই দৃশ্য অনেকের কাছেই জলভাত ও প্রতিক্রিয়াহীন হলেও মাইনুদ্দিন কিন্তু ব্যতিক্রমী। ফলে তিনি প্রতিক্রিয়াহীন হতে পারেননি। মন কেঁদেছে তাঁর।
তিনি একাধারে ইটভাটার মালিক, আবার সম্পন্ন চাষিও বটে। অতঃপর মাইনুদ্দিন নিজস্ব অর্থ খরচ করে লালগোলা স্টেশনে, কৃষ্ণপুর স্টেশনে, লালগোলা বাজারে ও কৃষ্ণপুর হাসপাতাল চত্বরে আশ্রয় নেওয়া ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীনদের দু’বেলা পেটপুরে খাবারের ব্যবস্থা করেন। কেবল খাবারই নয়, লালগোলার কৃষ্ণপুর গ্রামীণ হাসপাতালে, লালবাগ মহকুমা হাসপাতালে ও বহরমপুরে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওই অসহায়দের ভর্তি করে, তাঁদের সুস্থ করে তোলার ব্যবস্থাও করেন তিনি।
দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের প্রতিমা দর্শনেরও ব্যবস্থা করেন ষাটোর্ধ্ব স্নাতক মাইনুদ্দিন। এই কর্মযজ্ঞে তিনি সঙ্গে পেয়েছেন শাহিদুজ্জামান, সাগির, কুনাল, হাসানুজ্জামান, কুশল, সালাউদ্দিন ও জনিদের মতো এক ঝাঁক যুবককে। বহু কষ্টে ভবঘুরেদের কাছ থেকে অসম্পূর্ণ ঠিকানা জোগাড় করে ‘টিম মাইনুদ্দিন’। গুগলের সাহায্য নিয়ে সেই অসম্পূর্ণ ঠিকানা থেকে ‘টিম মাইনুদ্দিন’ সম্পূর্ণ ঠিকানা উদ্ধার করে ওই অসহায়দের বাড়ি পৌঁছে দেয়।
ওই তালিকায় আছেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলা থানার ৮১ বছরের বৃদ্ধা সন্ধ্যারানি গুছাইত, উত্তর প্রদেশের বরেলি জেলার হাফিজগঞ্জ থানার ধর্মেন্দ্র কুমার ও প্রভু যাদব, গোয়ার সাইমন উইলিয়ামস, সুন্দরবন, ওড়িশা, মুম্বই, মেদিনীপুর, বীরভূম ও কলকাতার হারিয়ে যাওয়া অসহায়রা ছাড়াও মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ থানার উসমানপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কালীদাসীদের মতো অনেকে। ফলে লালগোলায় এমন অসহায় মানুষের দেখা মিললেই খবর যায় মাইনুদ্দিনের কাছে। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির দেহ সৎকারের জন্যও পুলিশ ও হাসপাতাল থেকেও ডাক পড়ে মাইনুদ্দিনের। থানা ও হাসপাতালের তখন মাইনুদ্দিনই মুশকিল আসান।
এই মহৎপ্রাণ মানুষটি অতি সম্প্রতি অভিনব একটি উদ্যোগে হাত লাগিয়েছেন। পথভোলা মানুষদের শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষার দুর্গতি থেকে রক্ষা করতে কৃষ্ণপুর গ্রামীণ হাসপাতালের সন্নিকটে নিজের ১০ কাঠা জমিতে নির্মাণ করেছেন ‘নব আশ্রয়’ নামের একটি আবাসন। সেই ৪২০০ বগর্ফুটের প্রশস্ত জায়গায় ঢালাই ছাদ তৈরি করে পথভোলা ৩০-৩৫ জন মানুষের একসঙ্গে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন অতি সাধারণ জীবনযাপন করা এই অনন্য মনের মানুষটি।
সেই ‘নব আশ্রয়’-এ গত ২৬ জানুয়ারি অভিনব উপায়ে প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করেন তিনি। কোনও নেতা ছিলেন না সেখানে। দুঃস্থ হতদরিদ্র ১২৫০ জনকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, তাঁদের নিয়ে এসে চেয়ার-টেবিলে বসিয়ে পরিপাটি করে বেশ যত্নের সঙ্গে ডিম-ভাত খাইয়েছেন। ‘আনন্দভোজ’ নামের ওই বিশাল কর্মকাণ্ডের তদারকি করেছেন মাইনুদ্দিনের দুই সহকর্মী প্রদীপ বিশ্বাস ও আশিস ঘোষ। ‘না লাভ, না লস’- এর ভিত্তিতে গরিবদের পরিষেবা দেওয়ার জন্য ওই দিন একটি অ্যাম্বুল্যান্সের উদ্বোধন করা হয়। অ্যাম্বুল্যান্সটি কেনা হয় মাইনুদ্দিনের টাকায়। পথভোলাদের ঘরে ফেরাতে মুম্বইয়ের এক নার্সিংহোম মালিক ঠিক এমনই একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান চালান বছর তিরিশেক ধরে। মাইনুদ্দিন বলেন, “‘শ্রদ্ধা’ নামের ওই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কাজ ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জুড়ে। সম্প্রতি সেই প্রতিষ্ঠানের লোকজনের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়। ফলে যৌথ উদ্যোগে ঠিকানা হারানো আরও বেশি জনকে ঠিকানা মিলিয়ে দিতে পারব।”
নিজেকে ‘চারণ কবি’ ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন ষাটোর্ধ্ব অনন্ত চৌধুরী। বহরমপুর শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে পথচারীর হাতে লিফলেট-সদৃশ কাব্যপত্র বিনা পয়সায় ধরিয়ে দেওয়া তাঁর বরাবরের দস্তুর। অনন্তের কথায়, “বাঙালি হয়ে কবিতা পড়বে না, এমনটা আবার হয় নাকি!” তাছাড়া এর জন্য তো তাঁকে গাঁটের কড়ি খসাতেও হচ্ছে না। সাহিত্য সেবার প্রসারের জন্য বরাবর নিজের গাঁটের খড়ি খরচ করেন তিনি। ব্যারিস্টার দাদু শরদিন্দু রায়ের নাতি অনন্তকে ইস্কুলের চৌকাঠ ডিঙানোর পরে আর কলেজমুখো করা যায়নি। তবে দাদুর লেখালেখির ‘বাতিক’ নাতির ঘাড়েও ভর করে যথা সময়ে। বিদ্যুৎ দফতরের টেকনিক্যাল কর্মী চার জনের সংসার চালানোর পাশাপাশি সারস্বত সাধনা চালিয়ে এসেছেন বরাবর। এখন অবসরের পরেও যতি পড়েনি।
দু’পৃষ্ঠার তাঁর সেই কাব্যপত্র পৌঁছে গিয়েছে কলকাতার কফি হাউস থেকে সাহিত্য আকাদেমি, শিলিগুড়ি থেকে কাকদ্বীপের আত্মীয় বাড়ি। শয়ন, স্নান ও আহারের সময়টুকু ছাড়া ৬৬ বছরের অনন্তের সদা সহচর তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘জনান্তর’। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে দু’পৃষ্ঠার ৮০০টি কাব্যপত্র। এ ছাড়াও ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ‘জনান্তর’ পত্রিকার ৬০টি ছিপছিপে সংখ্যা। প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর লেখা তিনটি নাটক এবং ১১টি কাব্যগ্রন্থ। কবিতার পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ থেকে শুরু করে, বানান সংশোধন, ছাপাখানার হ্যাপা, রাজপথে কাব্যপত্র বিলি এবং আর্থিক দায়ভার বহন করা পর্যন্ত সবটাই একা বইছেন ‘ওয়ানম্যান সাহিত্য সোলজার’ অনন্ত। এই ‘চারণ কবি’ তাই এখন অনেকের মুখে ‘কাব্যখ্যাপা অনন্ত’ বলে বেশি উচ্চারিত। তাঁর একটাই মন্ত্র, “কবিতা ছাড়া জগতে আর আছেটাই বা কী!”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here