কল্লোল প্রামাণিক করিমপুর

নদী শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছলাৎ ছলাৎ জল। ঢেউয়ের তালে দুলছে ঘাটে বাঁধা নৌকো। ওই দূরে ডিঙি ভাসিয়ে মাছ ধরছেন কেউ। নদীপাড় থেকে একটু দূরে জল ছিটিয়ে সাঁতার কাটছে পাড়ার দামাল ছেলের দল।
কিন্তু এ নদী তেমন নয়। এ নদীতে স্রোত মরেছে কবেই। তিলতিল করে মরে যাচ্ছে আস্ত নদীটাই! মরে যাচ্ছে, নাকি মেরে ফেলা হচ্ছে? আজ্ঞে হ্যাঁ, নদীও খুন হয় বইকি! বিশ্বাস না হলে নদীর পাড়ে গিয়ে একবার দাঁড়ান।
এ নদীর নাম জলঙ্গি!
দিনকয়েক আগে এক পড়ন্ত বিকেলে মৃতপ্রায় সেই জলঙ্গিতেই কলার ভেলায় প্রদীপ ভাসিয়ে ওঁরা প্রার্থনা করলেন, ‘‘এই আলোর দিব্যি, সেরে ওঠো জলঙ্গি। আবার জেগে ওঠো। হারানো স্রোত বুকে নিয়ে ফের তুমি বয়ে চলো। ঠিক আগের মতো।’’
‘জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়’— এর স্রষ্টা জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে জলঙ্গিকে বাঁচাতে নানা রকম ভাবে উদ্যোগী হয় নদিয়ার বেশ কয়েকটি সংস্থা ও সংগঠন। করিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে জলঙ্গির ফেরিঘাট পর্যন্ত একটি পদযাত্রার আয়োজন করে অপরাজিতা পত্রিকা গোষ্ঠী। সেই পত্রিকার গোষ্ঠীর পক্ষে সারমিন আক্তার রিমি বলছেন, ‘‘চোখের সামনে একটা নদী এ ভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা কিছু করব না? নদীকে বাঁচাতে, লোকজনকে সচেতন করতে আমাদের এই পদক্ষেপ।’’
এ দিনই কৃষ্ণনগর, তেহট্টেও নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেভ জলঙ্গি কমিটির এক সদস্য জানান, নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে। বাঁচবে সভ্যতাও। এই বার্তাটা ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। সেই কারণে বছরের শুধু একটি বিশেষ দিনেই নয়, ধারাবাহিক ভাবে তাঁরা পথসভা, নদী-সমীক্ষা, মৎস্যজীবীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করেন। বিকেলে কৃষ্ণনগর বিসর্জন ঘাটে নদী নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শনিবার কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরির মাঠেও বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, নদী ও জলাশয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা, পথযাত্রা ও বাউল গানের অনুষ্ঠান হয়।
তেহট্টে জলঙ্গির ঘাটেও জলঙ্গি দিবস পালন, নাটক, পথনাটিকার আয়োজন করা হয়েছিল। জলঙ্গি বাঁচাও কমিটির পক্ষে তন্ময় সরকার বলেন, ‘‘জলঙ্গি কী ছিল আর জলঙ্গি কী হল, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। এখনও সচেতন না হলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর দিন অপেক্ষা করছে।’’ ভয়টা যে অমূলক নয় তা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় নদী বিশেষজ্ঞদের কথাতেও। তাঁরাও বারবার সাবধান করছেন, ‘‘প্রতিনিয়ত অত্যাচারের ফলে জলঙ্গির বহমানতার পাশাপাশি দূষিত হচ্ছে নদীর জল! অথচ বর্ষার সময় এই জলঙ্গিই কিন্তু অতিরিক্ত জল বহন করে বন্যার হাত থেকে আমাদের বাঁচায়। ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া এই নদী পরে ভারী বর্ষার জল ধারণে অক্ষম হয়ে উঠবে। আর তাতেই ভেসে যেতে পারে বাসভূমি।’’
নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার বলছেন, ‘‘জলঙ্গি পদ্মার শাখানদী। বহু বছর আগে এর উৎসমুখ ছিল জলঙ্গিতেই (এখন অবশ্য সেখানে জমজমাট বাজারহাট)। পরে পদ্মা তার গতিপথ পাল্টালে জলঙ্গির উৎসমুখ নেমে আসে আরও নীচের দিকে, চর মধুবোনা এলাকায়। সেই উৎসমুখও বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহু আগে। এখন সেখানে রয়েছে অত্যন্ত রুগ্ণ একটি জলধারা। জলঙ্গির এখন ভরসা বলতে ভৈরব, বৃষ্টি আর ভৌম জলস্তর। মোট ২২০.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই নদীপথের মধ্যে এখন অস্তিত্ব রয়েছে ১৯২.৫ কিলোমিটারের।’’
বাকি ২৮ কিলোমিটার নদী তা হলে গেল কোথায়? নদীপারের বাসিন্দারা ম্লান হাসছেন, ‘‘নিখোঁজ হয়ে গিয়েছে। তার উপরেই তো গড়ে উঠেছে রুখু পিচ রাস্তা, ইমারত।’’ যেটুকু এখনও বেঁচে আছে, সেটাও যে আর কত দিন থাকবে তা নিয়েও সংশয়ে আছেন তাঁরা।
অথচ এই জলঙ্গি নিয়ে একটা সময় গর্বের শেষ ছিল না। নদিয়া-মুর্শিদাবাদের নদীপারের লোকজনকে সেচ নিয়ে ভাবতে হতো না। বাপ-ঠাকুর্দার পেশা আঁকড়েই দিব্যি বেঁচেবর্তে ছিলেন মৎস্যজীবীরা। দুগ্গা ঠাকুরের বিসর্জন ও বাইচ প্রতিযোগিতা হতো এই নদীতেই। জলঙ্গি নিয়ে কবিতা, নাটক সিনেমাও বড় কম হয়নি। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ সিনেমার শ্যুটিং-এর বেশ কিছুটা অংশ তো এই নদীর পাড়েই হয়েছিল। এখন অবশ্য সে সবই অতীত। বরং জলঙ্গি নিয়ে আক্ষেপ করে মুর্শিদাবাদেরই এক কবি লিখেছেন— ‘নদীর বুকে পায়ের ছাপ/বন্যা খরা আমাদের পাপ’।
সেই পাপমোচন করতে পারে একমাত্র জলঙ্গির স্রোত। আর সেই স্রোত ফিরিয়ে আনারই পণ করেছেন সারমিন, তন্ময়রা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here