মামুন আব্দুল কায়েম রানিনগর

মনটা কেমন চা চা করছে? বাড়িতে হাঁক দিলে বেজার হতে পারেন গিন্নি? পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানটাও বন্ধ?
তা হলে?
নাছোড়বান্দা ইচ্ছেটা ভিতর থেকেই যেন গর্জে ওঠে, ‘‘চা কি খাব না তা হলে? তা হলে কি চা খাব না?’’ ঠিক তখনই মুশকিল আসান করে দেয় মোবাইলের দশটি নম্বর। সেই নম্বরে ফোন করতেই ওপ্রান্ত থেকে নরম গলায় ভেসে আসে, ‘‘কোথায় আসতে হবে?’’
ব্যস! গুপি-বাঘা এক তালিতেই মনপসন্দ খাবার আনিয়ে নিত। সীমান্তের গ্রাম রানিনগরে এক ফোনেই মিলছে চা! চা-চর্চার ফাঁকে চা-প্রেমীরা বলছেন, ‘‘রঙে, স্বাদে, গন্ধে এ চায়ের কোনও তুলনা হয় না।’’ চায়ের দামও নাগালের মধ্যে। দুধ চা পাঁচ টাকা, লাল হলে আড়াই।
এক জায়গায় চা-পর্ব শেষ হতে না হতেই ফের বেজে ওঠে খোদাবক্স আনসারির ফোন। চা-তেষ্টা মেটাতে ফের ছুটতে থাকে খোদাবক্সের সাইকেল। রানিনগরের লোকজন আবার খোদাবক্সের চায়ের নাম রেখেছেন— ‘ফ্লিপকার্ট চা’। তাঁরা বলছেন, ‘‘মোবাইল খুলে ‘অর্ডার’ দিলেই ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনের মতো নানা কোম্পানি বাড়িতেই জিনিসপত্র পৌঁছে দেয়। খোদাবক্সও তো তাই। চায়ের ‘অর্ডার’ করলে সে-ও সঙ্গে সঙ্গে হাজির হয়ে যায়। তাই তার চায়ের নাম দিয়েছি ফ্লিপকার্ট চা।’’
খোদাবক্স অবশ্য এ সব কোম্পানির ‘বেওসা’র খবর রাখেন না। তাঁর একটাই লক্ষ্য— দ্রত চা পৌঁছে দেওয়া। গোটা রানিনগরে তাই কাকভোর থেকে রাতদুপুর পর্যন্ত সমানে ছুটে বেড়ায় খোদাবক্সের সাইকেল।
লকডাউনের আগে পর্যন্ত খোদাবক্স ছিলেন রাজমিস্ত্রি। লকডাউনে সে কাজ শিকেয় ওঠে। আগে বারকয়েক ভিনরাজ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে সে রাস্তাও বন্ধ হয়ে যায়। খোদাবক্স বলছেন, ‘‘বাড়িতে রয়েছে বৃদ্ধ বাবা, তিন ছেলে ও স্ত্রী। জমানো সব টাকাও ফুরিয়ে আসছিল। বুঝতে পারছিলাম না, কী করব?’’
সেই সময় পথ দেখান খোদাবক্সের পাড়াতুতো ভাবি বেদানা বিবি। তিনিই চা বিক্রির পরামর্শ দেন। কিন্তু খোদাবক্স ভাবতে শুরু করেন, চা বিক্রি মানেই তো একটা দোকান করতে হবে। কিন্তু বাড়ির সামনে তাঁর দোকান করার মতো জায়গা নেই। আবার অন্য কোথাও দোকান করতে গেলেও বিস্তর টাকার দরকার।
তখন হাসতে হাসতে বেদানা বলেন, ‘‘তোমার সাইকেলটা মেরামত করে ওটাকেই দোকান বানিয়ে নাও।’’ কথাটা মনে ধরে খোদাবক্সের। স্থানীয় দোকানে সাইকেলটা সারিয়ে তিনি প্রথমে একটা বড় ফ্লাস্ক কেনেন। সেই ফ্লাস্ক নিয়েই তিনি প্রথমে নিজের পাড়ায় ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি শুরু করেন। বুদ্ধি করে চা-প্রেমীদের কাছে নিজের মোবাইল নম্বরও দেওয়া শুরু করেন।
এখন অবশ্য চা-প্রেমীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ফ্লাস্কের সংখ্যাও এক থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারে। বাড়িতে দু’টো ফ্লাস্কে চা তৈরি করে রাখেন খোদাবক্সের স্ত্রী রোজিনা বিবি। আর দু’টো ফ্লাস্ক নিয়ে বেরিয়ে পড়েন খোদাবক্স। সে দু’টো ফাঁকা হলেই ফের তিনি বাড়ি থেকে তুলে নেন ভর্তি ফ্লাস্ক। খোদাবক্স বলছেন, ‘‘লকডাউনের সময় মূলত গ্রামেই ঘুরতাম। এখন এলাকা বেড়ে গিয়েছে। থানা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজার সর্বত্রই ছুটতে হয়। রানিনগরের প্রায় সকলেই আমার ফোন নম্বর জানেন।’’
কথা বলতে বলতে বেজে ওঠে খোদাবক্সের ফোন। ‘‘পরে আবার কথা হবে কত্তা…’’ বলে ফের প্যাডেলে পা রাখেন খোদাবক্স।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here