সুমিত তালুকদার

সে এক দেশ ছিল। সে দেশে জন্মেছিলেন বিশ্বখ্যাত দার্শনিক কনফুসিয়াস (৫৫১–৪৭৯ বিসি)। ইংরেজ বণিকেরা আফিমের ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক চিনাদের আফিমের নেশায় বুঁদ ও কর্মহীন করে রেখেছিল। সে এক দেশ ছিল। বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম চিনের প্রাচীর  নির্মাণ করা হয়েছিল। সে এক দেশ ছিল। চিনের বিপ্লবী নেতা ও People’s Republic of China –র  প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাও জে দং-কে (১৮৯৩-১৯৭৬) ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা ‘আমাদের চেয়ারম্যান’ হিসাবে মেনে নিয়েছিল।
সে এক দেশ ছিল। ১৯২৪ সালে চিন ভ্রমণকালে উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ— “মাথা থেকে পা পর্যন্ত চীনাদের কাজে কোথাও অনিচ্ছা অবসাদ বা জরত্বের লেশমাত্র নেই। কর্মের যদি জয় হয়, তাহলে চীনাদের জয় অবধারিত। চীনের এই শক্তি আছে বলেই আমেরিকা চীনকে ভয় করেছে। এই এত বড় একটা শক্তি যখন আধুনিক কালের বাহনকে পাবে অর্থাৎ বিজ্ঞান যখন তার আয়ত্ত হবে, তখন পৃথিবীতে এমন শক্তি থাকবে না, যে চীনকে আর বাধা দিতে পারে।’’ আজ চিনের বড় শত্রু আমেরিকাও একসময় উষ্ণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল চিনের সঙ্গে। তারা পরস্পরকে ‘কৌশলগত বন্ধু’ মনে করত। ১৯৭১ সালে মার্কিন বিদেশসচিব হেনরি কিসিঙ্গার সেই বন্ধুত্বের হাত শক্ত করে এসেছিলেন বেজিং সফরে। একদিকে অবাধ বাণিজ্যের খোলা বাজার তৈরি আর অন্যদিকে চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অন্যতম শক্তিশালী সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়াকে কোণঠাসা করা।
সে এক দেশ ছিল! চিন আজ গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভাবধারার অনেকটাই হারিয়েছে। বলা ভাল, আধুনিক ও অত্যাধুনিক হওয়ার লক্ষ্যে, বিশ্বব্যাপী শাসন করার অভিপ্রায় বিসর্জন দিয়েছ। মাও মডেল থেকে, তাঁর কঠোর-কঠিন আদর্শ থেকে বিচ্যূত হয়ে রাশিয়ার গ্লাসনস্থ পেরেস্ত্রইকার খোলা হওয়ায় বাঁচতে চেয়েছে। বলপূর্বক দমননীতি প্রয়োগ, বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধ, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে জনগণকে দাবিয়ে রেখেছে। সমাজতন্ত্রে স্বেচ্ছাচারী একনায়কতন্ত্র চালানোর চেষ্টা করেছে। ১৯৮৯ সালে তিয়েনানমেন স্কোয়ারের অমানবিক ঘটনা চৈনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়। এ ছাড়া প্রতিবাদী লেখক লিউ জিয়াওবোকে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাঁকে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। তাঁকে পুরস্কার নিতে দেওয়া হয়নি। কোনও প্রতিনিধি পাঠাতেও দেওয়া হয় নি। অনুষ্ঠানের দিন একটি শূন্য চেয়ার রাখা ছিল তাঁর সম্মানে। সেই শূন্য আসনই তাঁর প্রতীক হয়ে থাকল। প্রায় শত বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধিকে ভুল প্রমাণিত করেছে। আধুনিক কালের বাহন বিজ্ঞানকে অপব্যবহার করেছে। বারবার বিশ্বাস ভঙ্গ করে বিশ্ব রাজনীতির আবহাওয়া উত্তপ্ত করেছে।
আজকের চিন আমাদের কাছে অচেনা। ১৯৬২ সালে চিনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের নেতৃত্বে চিন-ভারত যুদ্ধ হিন্দি চিনি ভাই ভাই সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছিল। সম্প্রতি লাদাখ ও গলওয়ান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সঙ্ঘাত চরমে ওঠার জন্য চিনের ভাবমূর্তি আমাদের কাছে ক্রমশ অস্পষ্ট ও অনুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সর্বোপরি করোনা ভাইরাসের উৎস ‘চিনের উহান পরীক্ষাগার বিবেচিত হওয়ায়’ বিশ্বাসের চিনের প্রাচীর আজ ভূলুণ্ঠিত। সন্ত্রাসবাদে নির্বিচারে মদত দেওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতকে শিক্ষা দেওযার ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় এক বিশ্বাসঘাতক অচেনা চিন। কেবলমাত্র ভারত নয়, আমেরিকা থেকে শুরু করে জাপান, তাইওয়ান, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া মায় সোভিয়েত রাশিয়া পর্যন্ত আজ চিনের বিরুদ্ধে। জিন পিং সরকারের আগ্রাসী ও অবিশ্বাসী মনোভাবের জন্য দক্ষিণ চিন সাগরে তৈরি হয়েছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। আমাদের দেশ ইতিমধ্যে সস্তা ও ক্ষতিকর  চিনা সামগ্রী বিক্রি এবং প্রথমে টিকটক-সহ ৫৯টি চিনা অ্যাপ্লিকেশন ও পরে আরও ৪৭টি ক্লোন অ্যাপ্লিকেশন নিষিদ্ধ করেছে। শত্রু পড়শি মুলুকের হাতে যাতে গোপন তথ্য বা ডেটা না চলে যায়, তার জন্য এই আগামত সতর্কতা অবলম্বন করা। পাশাপাশি আত্মনির্ভর হয়ে ওঠা এবং দেশীয় উৎপাদনে উৎসাহিত করাও একটা বড় লক্ষ্য।
গত বছর দীপাবলির আলোর উৎসবে তাই ‘ড্রাগনের আগ্রাসন’ রুখতে স্লোগান উঠেছিল ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। কালীপুজোর আলোর বাজারে জোর লড়াই জমেছিল ভারত ও চিনের। বলা হয়েছিল, সস্তার চিনা ফানুস, এলইডি লাইটের বদলে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আলোক সামগ্রীর উপর নির্ভর করতে হবে।  তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চিনের সঙ্গে আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্কের সুযোগে ভারতের বিপুল বাজার ধরতে বহু গুণ উৎসাহে ঝাঁপাচ্ছে মার্কিন তথ্য প্রযুক্তি বহুজাতিক সংস্থাগুলি। একটি বাংলা দৈনিকে লেখা হয়েছিল— “তথ্য হাতানো থেকে শুরু করে একচেটিয়া বাজার দখলের চেষ্টা— প্রায় সবক্ষেত্রেই আমেরিকা, ইউরোপ সহ সারা বিশ্বে পাহাড়প্রমাণ অভিযোগের মুখে যারা।’’ পরে আরও বলা হয়েছে— “চিনের সঙ্গে সম্পর্কে চিড় চওড়া হতেই অনলাইন পণ্য পরিষেবার বাজার ধরতে বিপুল উৎসাহে ঝাঁপিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশের সংস্থাগুলি। মুকেশ আম্বানির জিও প্ল্যাটফর্মে লগ্নি করেছে গুগুল…।’’ এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, আজ চিনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে পড়শি দেশটিকে বিভিন্ন কারণে ও অজুহাতে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে।
আমাদের কাছে চিনের সাম্প্রতিক ভাবমূর্তি অচেনা বলে মনে হলেও ক্রান্তদর্শী রবীন্দ্রনাথ ঠিক চিনেছিলেন। প্রতিবেশী চিন-জাপান সংঘাত ও সংঘর্ষে বিচলিত, বিক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী হয়েছেন বারবার। যে ‘ধ্যানী জাপান’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি জাপান সম্পর্কে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন, সেই জাপানের চিন আক্রমণের বীভৎসতা দেখে আর স্থির থাকতে পারেন নি। মনে পড়ে, শাওলীন বনাম নিনজার জাতিবৈরিতার প্রসঙ্গ। মনে পড়ে, বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র 36 Chambers of Shaolin এর কথা। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন— ‘‘চীনকে জাপান যখন অপমান করেছে সিনেমার ভিতর দিয়ে, সাহিত্যের ভিতর দিয়ে তখন এই প্রতাপশালীর দল কোনো বাধা দেয় নি। …এই ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অপমানিত জাতিরাই নুতন যুগকে রচনা করছে। চীনের প্রতি নিষ্ঠুর অত্যাচারে আজ আমাদের হৃদয় উৎপীড়িত, কিন্তু আমাদের কী করবার আছে? আমরা কী করতে পারি? আমরা অত্যাচারীর নিন্দা করেছি।’’
চিনে ছিলেন জন্মসূত্রে মার্কিন ও কর্মসূত্রে চৈনিক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখিকা পার্ল এস বাক ( ১৮৯২-১৯৭৩)। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস ‘দি গুড আর্থ’ (১৯৩১ সালে রচিত ও ১৯৩২ সালে পুলিৎজার পুরস্কারে ভূষিত)।  তিনি খুব কাছ থেকে বছরের পর বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন চিনাদের বেঁচে থাকার কঠোর লড়াই এবং তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আখ্যান লিপিবদ্ধ করেছেন এই উপন্যাসে। অনেকেই হয়ত বাংলা মাধ্যমের পুরনো সিলেবাসের লার্নিং ইংলিশ বইতে ‘রিফিউজি’ গল্পটি পাঠ করেছেন। এটি ‘দি গুড আর্থ’ এরই একটি অধ্যায়। এখানে শ্রীমতী বাক এক বাস্তুহারা বৃদ্ধ চিনা কৃষক ওয়াং লু-র জীবন সংগ্রামের কথা চিত্রিত করেছেন। চিনের দুঃখ হোয়াং হো নদীতে ভয়ানক বন্যার ফলে বাধ্য হয়ে শরণার্থী হয়ে চলে আসে শহরে। তবুও তার জমির প্রতি, শস্যবীজের প্রতি এবং সর্বোপরি অনাথ একমাত্র নাতির ভবিষ্যতের প্রতি তার অপরিসীম স্নেহ মমতা কতখানি নিবিড় ও অতলস্পর্শী তা দেখতে পাওয়া যায় ওই গল্পে। একজন মার্কিন হয়ে চিনে বসবাস করে চিনাদের জীবনযাপন নিয়ে গল্প লিখে নোবেল পাওয়া বাস্তবিকই আমাদের বিস্মিত করে।
চিন নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। আজ চিন নিয়ে চিন্তা আমাদের গ্রাস করেছে, চিন্তায় ফেলে দিয়েছে রাজনীতি থেকে বৈদেশিক নীতি, ব্যবসা বাণিজ্য থেকে ব্যবহারিক জীবন, সীমান্ত থেকে সমরাস্ত্র সজ্জিত রণাঙ্গন— প্রায় সর্বস্তরে সর্ববিষয়ে। আজ চেনা চিন বড্ড অচেনা হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)