নির্মল সাহা

প্রথমেই বলে রাখি, স্বাস্থ্য আর স্বাস্থ্য-পরিষেবা এক নয়।
দুটো গ্রাম রয়েছে। একটা গ্রামে রাস্তা আছে, বিদ্যুৎ আছে, বিদ্যালয় আছে, নারীশিক্ষা আছে, পানীয় জল আছে, স্যানিটেশন আছে, অর্থনৈতিক স্থিরতা আছে, টিকাকরণ আছে, প্রসূতি মায়ের যত্ন আছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই, ধর্মের নামে নোংরামি নেই। আর পাশের গ্রামের সামগ্রিক পরিস্থিতি ঠিক তার উল্টো। আমরা সবাই বলব, প্রথম গ্রামের স্বাস্থ্য ভালো। আর দ্বিতীয় গ্রামের বসবাসকারী মানুষের সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো নয়। সমাজে যে বিষয়গুলির উপর সরাসরি স্বাস্থ্য নির্ভর করে তার প্রতিটি দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সুতরাং, আমরা বলতেই পারি ‘অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য’ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রকে তাঁর পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে।
একটা সময় আমরা শপথ নিয়েছিলাম ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্য— ২০০০ সাল’। অর্থাৎ, সবার জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্য-পরিষেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২০০০ সাল। সে সব কথা আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। কারণ, স্বাস্থ্য-পরিষেবা এখন পণ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। পণ্যের বাজার তৈরি হতে শুরু করেছে, ক্রেতা-বিক্রেতা বেড়েছে। বেড়েছে পুঁজির বিনিয়োগও। পুঁজির সঙ্কটকালে পুঁজিপতিরা এই স্বাস্থ্যবাজারে প্রচুর পরিমাণে বিনিয়োগ করছেন বিপুল মুনাফা অর্জনের আশায়। উন্নত চিকিৎসার মোড়কে মানুষকে নিষ্পেষিত করার নাম ‘স্বাস্থ্য পরিষেবা’। স্বাস্থ্যবিমা এবং ক্রেতা সুরক্ষা আইনের দোহাই দিয়ে অপ্রয়োজনীয় তদন্ত স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের জিয়নকাঠি।
বেশিরভাগ চিকিৎসক এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য। কারণ, এই কর্পোরেট ব্যবস্থা প্রচুর অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে এই চিকিৎসকদের দাসে পরিণত করে। এদের একটাই স্লোগান— ‘জেনারেট’ করতে হবে, নইলে চাকরি ছাড়তে হবে।’ রোগী তৈরি করতে হবে। ‘ইনভেস্টিগেশন’, ‘অপারেশন’, ‘ভেন্টিলেশন’ সব কিছু ‘জেনারেট’ করতে হবে, এটাই কর্পোরেটের মূলমন্ত্র ।
চিকিৎসক আর রোগীর মাঝে এই তৃতীয় ব্যক্তি বা পক্ষের উপস্থিতি চিকিৎসা ব্যবস্থাটাকে এই নিম্নস্তরে নামিয়ে ফেলেছে। এর থেকে আশু মুক্তির আশা, এখন দুরাশা। বেশিরভাগ চিকিৎসক এই অদ্ভুত ব্যবস্থার শিকার। তবে কালো ভেড়ার সংখ্যাও কম নয়।
তাই, সেই ভালো ব্যবস্থা দেখার আশায় রইলাম।

(লেখক বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক। মতামত ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)