কাবেরী বিশ্বাস

আজ, ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারীর অধিকার আদায় ও বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে পালিত হয় দিনটি। ১৯১১ সাল থেকে দিনটি পালিত হয়ে এলেও ১৯৭৫ সাল থেকে দিনটি নারী দিবস হিসাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বীকৃতি লাভ করে। এই দিনটি পালনের মধ্য দিয়ে আমরা, নারীরা যা অর্জন করতে চাই তার পরিষ্কার চিত্র পাই চতুর্থ নারী সম্মেলনে।
১৯৯৫ সালে বেজিংয়ে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ১৮৯টি দেশের প্রতিনিধি ‘বেজিং ঘোষণাপত্র ও অ্যাকশন প্ল্যানে’ স্বাক্ষর করেন। এটি হল এখনও পর্যন্ত নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলনের দিশা নির্বাচনে সবচেয়ে প্রগতিশীল ব্লু-প্রিন্ট। এই ব্লু-প্রিন্ট কল্পনা করেছে এমন একটি বিশ্বের যেখানে প্রত্যেক নারী বুঝতে পারবেন নিজের অধিকার। পুরুষের মতোই পাবেন সমান শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্য পরিষেবা, হিংসামুক্ত পরিবেশ, সমান কাজে সমান মজুরি। পরিবার, কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে থাকবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। ২৬ বছর ধরে একটু একটু করে চলছে লক্ষ্যে পৌঁছনোর লড়াই। অনেক কিছু অর্জিত হয়েছে, কিন্তু অধরা রয়েছে তারও বেশি।
সমাজের একটা অংশের সমানাধিকার অর্জিত হলেও দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া সমাজ রয়েছে ঘোর তিমিরে। পৃথিবীতে বছরে ১২০ লক্ষ মেয়ের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। ১৮টি দেশে স্বামী তাঁর স্ত্রীর চাকুরি করায় আইনত বাধা দিতে পারেন। ৪৯টি দেশে গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধে কোনও আইন নেই। ৫ জনের মধ্যে ১ জন মহিলা যাঁদের বয়স ১৮-৪৯, তাঁরা স্বামী বা কাছের মানুষদের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হন। তাই বেজিং কর্মসূচি রূপায়ণ মঞ্চ চায় ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবীর সব দেশে মানুষের অর্জিত রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকারগুলি নারী-পুরুষ ভোগ করুন সমান ভাবে। নারীর চায় মানুষের অধিকার। কারণ, পুরুষের মতোই তিনিও আগে মানুষ, তারপরে নারী।
বিখ্যাত সাংবাদিক গ্লোরিয়া স্টেইনেমের মতে, ‘নারীর অধিকার রক্ষার লড়াই শুধু একজন নারীবাদীর বা একটি সংগঠনের একার লড়াই নয়। এই লড়াই হচ্ছে মানবাধিকারের জন্য যারা লড়ছে তাদের প্রত্যেকের সমবেত লড়াই।’ নারী দিবস যে লিঙ্গ সাম্যের ডাক দেয় সেখানে বঞ্চিত নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই সমান অধিকার চাওয়া হয়। গত বছর নারী দিবসের স্লোগান ছিল  ‘each for equal’। সকলের কাছে আহ্বান ছিল—  দেশ, জাতি, লিঙ্গ, বয়স, ধর্ম নির্বিশেষে সমতার পক্ষে দাঁড়ানোর এবং সকল মানুষের জন্য এমন এক বিশ্ব অর্জনের চেষ্টা করা, যেখানে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না। এই সমতার বিশ্ব আমাদের সকলের প্রাপ্য।
লিঙ্গ সাম্যের প্রশ্নে ভারত কোথায় দাঁড়িয়ে? গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২০ অনুযায়ী, ১৫৩টি দেশের মধ্যে ভারত ১১২তম। বাংলাদেশের স্থান ৫০তম। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ২০০৫ সালে ছিল ৩৫%, ২০১৮ সালে ২৬%। অথচ বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট বলছে, পুরুষের সমসংখ্যক নারী যদি ভারতের অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতেন, তাহলে ২০২৫ সাল নাগাদ দেশের জিডিপি বাড়ত প্রায় ৬০%। দেশের শ্রমশক্তি এবং চাকরিতে মেয়েদের নিযুক্তি যদি এ ভাবে কমে যেতে থাকে, তাহলে আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ধাক্কা খাবেই।
কিন্তু ভারতীয় মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে পড়ার আগ্রহ বেড়েছে। তাহলে কেন এই অবস্থা? এই অবস্থার জন্য ভারতের সামাজিক রীতিনীতি অনেকটা দায়ী। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৮৪% ভারতীয় মনে করে, নারীদের চেয়ে পুরুষের কাজ পাওয়ার অধিকার বেশি। তাঁরা মনে করেন, সংসারে সচ্ছলতা থাকলে মেয়েদের চাকরি করার প্রয়োজন নেই। ইদানীং এই প্রচারটা বেশি হচ্ছে যে, অর্থ উপার্জন পুরুষের কাজ। নারী সংসার সন্তানের দেখভাল করবেন। মার্স অরবিটার মিশন সফল হওয়ার পিছনে যত মেয়ের দক্ষতাই থাকুক না কেন, মেয়েদের বিজ্ঞান পড়ার কোনও দরকারই নেই। তাঁরা পড়বেন গার্হস্থ্য বিজ্ঞান। বিশ্ব ব্যাঙ্কের এক জরিপ বলছে, গৃহস্থালির ৯০% কাজ ভারতে মেয়েদেরই করতে হয়। অন্য যে কোনও বড় দেশের তুলনায় ভারতেই মেয়েরা ঘরের কাজ বেশি করেন। বাসন মাজা, সন্তানকে দেখাশোনার মতো কাজ ভারতীয় পুরুষরা যদি কিছুটা করতেন তা হলে নারীর কর্মসংস্থান ১০% বাড়ত।
নারীদিবস পালনে উৎসাহী হলে সমাজে অনেকে মনে করেন, মেয়েরা পুরুষের অধিকার কেড়ে নিতে চান। একেবারেই না। তাঁরা চান, তাঁদের পিতা, ভাই, পুত্র সকল পুরুষের সঙ্গে সমান মানুষ হতে। তাঁদেরও মানবাধিকার সুনিশ্চিত করা নারীর লড়াইয়ের অঙ্গ। এ বছর নারী দিবসের মূল ভাবনা হল— নেতৃত্বে মহিলারা: কোভিড ১৯ পরবর্তী বিশ্বে সকলের জন্য সমান সুযোগ সমন্বিত বিশ্ব অজর্নের লক্ষ্যপূরণ।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের মতে, কোভিড ১৯ ছিনিয়ে নিয়েছে গত কয়েক দশকের অর্জিত লিঙ্গ সাম্যের অধিকার। কাজ হারানো থেকে বিনামূল্যে দেওয়া শ্রম, স্কুলছুট, গার্হস্থ্য হিংসা ইত্যাদির বৃদ্ধি মুছে ফেলেছে নারীর অর্জিত অধিকারগুলি। পুরুষের দ্বিগুণ কাজ হারিয়েছেন মেয়েরা। বাড়িতে থেকে বাড়ির সকলের কাজ বিনা পারিশ্রমিকে করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতাও তাই। যে বিপুলসংখ্যক কাজের মাসি ট্রেনে, বাসে শহরে আসতেন, লকডাউনে তাঁদের বেশিরভাগ কাজ হারিয়ে বাড়িতে বসে সংসারের কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। একটা পয়সা রোজগার নেই। ছিল শুধু মারধর, অনাহার, বিনা চিকিৎসায় ধুঁকতে থাকা জীবন। তবুও অতিমারির মোকাবিলায় মহিলারা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছেন। মহিলা চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি অসুবিধা ভোগ করেও করোনাকে হারানোর চ্যালেঞ্জে পিছিয়ে থাকেননি। যদিও রাষ্ট্রসঙ্ঘের সমীক্ষায় ধরা পড়েছে যে, তাঁদের মাত্র ৩.৫% পুরুষের সমান বেতন পেয়েছেন। তবুও কাজ ছেড়ে চলে যাননি। স্বীকার করে নিয়েছেন মানুষ হিসাবে তাঁদের দায়িত্ব। তাই পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে সচল রেখেছিলেন অত্যাবশকীয় ও স্বাস্থ্য পরিষেবা, বয়স্ক ঘরবন্দি মানুষের সেবার কাজ।
এ বছরের ভাবনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জানিয়েছেন, মহিলারা নেতৃত্বে থাকলে ভাল কাজ করেন। তিনি নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, বর্তমানে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নেতৃত্বে মহিলা ও পুরুষ সমান ভাবে থাকায় শান্তি প্রচেষ্টা, সুস্থায়ী উন্নয়ন, মানবাধিকার রক্ষার কাজ অনেক বেশি সুসমন্বিত ও সহযোগিতার সঙ্গে হচ্ছে। মহিলারা যখন শান্তির জন্য আলোচনার টেবিলে বসছেন তখন সেই আলোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে। মহিলারা সরকারের উচ্চস্তরে থাকলে সামাজিক সুরক্ষায় ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিনিয়োগ বেশি হয়। মহিলারা পার্লামেন্টে বেশি থাকলে দেশগুলি অনেক বেশি পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়। গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে মানুষের জন্য অধিকার আদায়ের বিভিন্ন আন্দোলনে মহিলারা রাস্তায় নেমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনেও সামনের সারিতে আছেন মেয়েরা।
এ বারের স্লোগান ‘choose to challenge’, মেয়েরা তো সবসময়ই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই বেঁচে থাকেন। কর্মরত মহিলাদের চ্যালেঞ্জ ঘরে-বাইরে দু’জায়গায় নিজের সেরাটা দেওয়ার। বেকার মেয়েদের চ্যালেঞ্জ বাড়িতে নিজের মর্যাদা রক্ষা, শিশুকন্যার চ্যালেঞ্জ ভাইয়ের মতো খাবার ও পড়ার সুযোগ পাওয়ার, গর্ভবতী মায়ের চ্যালেঞ্জ পরিবারের সবাইকে দিয়ে, নিজের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করার। মায়ের চ্যালেঞ্জ সন্তানের চারপাশে সুস্থ পরিবেশ ও নিরাপত্তা বজায় রাখার। অসংখ্য চ্যালেঞ্জ তাঁরা গ্রহণ করছে, লড়ছেন। ১৯০৮ সালে আমেরিকার বস্ত্র শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কাজের দাবি, সমান মজুরি ও ভোটাধিকারের দাবিতে পথে নেমেছিলেন, আজ কেউ পরিবেশ রক্ষার দাবি নিয়ে নৌকায় সাগর পাড়ি দিচ্ছেন, কেউ বা স্বামী-পুত্রকে আন্দোলনে পাঠিয়ে খেত সামলাচ্ছেন। চ্যালেঞ্জ নিতে নিতে এগোচ্ছেন তাঁরা। দেশ চালানো হোক বা গণ-আন্দোলন, মেয়েরা শুধু নিজের জন্য লড়েন না, তাঁদের লড়াই সবার জন্য এবং বিশ্ব প্রগতির লক্ষ্যে।
তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে মানুষ নামক পাখিটার দুটো ডানা মজবুত করার লক্ষ্যে চলি। যে কোনও একটা ডানা, নারী বা পুরুষ দুর্বল হলে মুখ থুবড়ে পড়বে পাখিটা। আজ সময় এসেছে সমতার বিশ্ব গড়ার, নিজের জন্য এবং সকলের জন্য।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)