লিপিকা নাথ

আমার জীবনে দুঃখ আছে, কিন্তু আমি দুঃখী নই।
আমার জীবনে ফটোশপ আছে, ফ্রিজশট নেই।
আমার জীবনে অভাব আছে, কিন্তু আমি দরিদ্র নই।
আমার জীবনে ভুল বোঝাবুঝি আছে, কিন্তু শত্রু নেই।
আমার জীবনে বহু নাকানিচোবানি আছে, কিন্তু হে আমার
শুভাকাঙ্খীগণ— আমি পর্যুদস্ত নই।
যেদিন আমার মেরুদণ্ডটা প্রথম ভাঙল, সেদিন আমি লাল
জারদৌসিটা পরে, খোঁপায় একটা এত্তবড় চন্দ্রমল্লিকা লাগিয়ে,
শাল পিয়ালের জঙ্গলে গিয়েছিলাম জ্যোৎস্না দেখবো বলে।
যেদিন আমার হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপিত হল, সেদিন পরেছিলাম
দুধসাদা সালোয়ার কামিজ, নানা রঙে চোবানো বাঁধনি ওড়না
দিয়ে। দলবেঁধে সেদিন আমরা গিয়েছিলাম এক মনোমুগ্ধকর
মিউজিক কনসার্ট শুনতে। যাতে অব্যক্ত যন্ত্রণা সুললিত সঙ্গীত
মূর্ছনায় ঢাকা পড়ে যায়।
আর, এই সেদিন, যখন আমার প্রতিস্থাপিত হৃৎপিণ্ডে মুহূর্তের
অসাবধানতাবশত থাবা বসাল এক ভালোবাসার বেড়াল…
তাড়াতাড়ি রক্ত ধুয়েমুছে সাফ করে পরে নিলাম হলুদ মসলিনটা।
চোখের মোটা আই-লাইনারে যন্ত্রণা মুহূর্তে ঢেকে গেল। সঙ্গে ম্যাচিং
ঝুমকো পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই যেন হাজার ওয়াটের
ঝাড়বাতি জ্বলে উঠলো।
বন্ধুরা দেখে চোখ মটকে বলল, “সত্যি ! তুই পারিসও বটে!”
আমি পারি…. আমিই পারি…।
কারণ আমি নিজের শর্তে বাঁচতে চাওয়া
এক অতি সামান্য নারী।
শুধু আমি নই। অনিমা, সুফিয়া, রাজিয়া, আশা, জয়ন্তী, যারা আজ নিজের শর্তে বাঁচার ক্ষমতা রাখে, তারা কেউই হয়তো নারীদিবসের খোঁজ রাখে না। তাঁদের কাছে প্রতিটা দিন নিজের জীবনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরব। তারা শুধু জানে শ্রম। তারা জানে মারের বদলে প্রতিবাদ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই, আর অসম্মানের বিরুদ্ধে মাথা উঁচিয়ে হেঁটে যাওয়া। তারা জানে আপসের জীবন মানেই পাপোশের জীবন। সে জীবনে ছাই।
তাই, এদের সবার জীবন দিয়ে তৈরি হয় একটা সম্মানের সেতু, যার একপাশে মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়ার দল। আর একপাশে নিয়ম ভাঙার দল। আমাদের কাজ সেতুটা শক্ত করার। আমার পৃথিবী নারীশাসিত। কারণ আমি জন্ম থেকে দেখে এসেছি, এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ নারী চালনা করছে সংসার, আর এক সহনশীল ক্ষমাসুন্দর শক্তিশালী পুরুষ ধারণ করে আছে তাকে। কখনও বাবা রান্না করছে, মা গলা সাধছে। কখনও মায়ের পাটিসাপ্টা তৈরির অর্ধ সফর প্রয়াসে উৎসাহ দিয়ে বাকিটা উৎরে দিচ্ছে বাবা। মেয়েকে সাঁতার, সাইকেল, গান, নাচ, পড়াশোনা, এমনকি চাকরির পরীক্ষায় তৈরি করছে যে মা, ঘরের কাজ বা রান্নাবান্নায় ভুল হলে তিরস্কারে পিছপা হয় না সেই মা-ই। সংসার সচ্ছল হলেও কখনও নিজে চাকরির ইন্টারভিউ দিচ্ছে, তো কখনও মেয়ের চাকরির জন্য পরীক্ষার ফর্ম তুলে আনছে।
আসলে নারীদিবস হল শপথ নেওয়ার দিবস, প্রতিটা মা-বাবার। আমাদের সন্তানদের শুধু ‘মানুষ’ হিসেবে মানুষ করার অঙ্গীকারের দিন। সন্তানকে প্রথম আত্মনির্ভর করে তোলার পাঠ দেওয়া, যাতে যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতে লড়াই করার জন্য পায়ের তলায় একটা মাটি পায় সন্তান। লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা বা দুর্বলতা যেন আমাদের শক্তিশালী বা দুর্বল ভাবতে না শেখায়। না পোশাকে, না সাজগোজে, না লিঙ্গভেদে, ক্ষমতার বিকাশ হোক মেধায় বা প্রচেষ্টায়।
তবেই তো আমরা, মানে মেয়েরা ভাবতে পারব, আমার পৃথিবীটা একান্তই আমার। ভাবতে পারব, আমার জীবনের দায়িত্বটা আমারই, আমার সম্মান রক্ষার দায়িত্বও আমারই। এই একটা ক্ষেত্রে আমি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে পারি না, ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার, হে বিধাতা?’ শুধু বিধাতা চাইলেই হয় না, চাইতে হবে নিজেকেও।
বরং আমি সহমত তাঁর সঙ্গে এই ব্যাপারে যে ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।’ সে ফাঁদে পা দিয়ে নারী তুমি আত্মবিস্মৃত হয়ো না। ভালোবাসো, কিন্তু পরাশ্রয়ী হয়ো না। সংসারী হও, কিন্তু সংসারের জন্য বলিপ্রদত্ত হয়ো না। ভালো মা হয়ে ওঠো, কিন্তু সন্তানকে অজুহাত কোরো না।
আসলে তো নারীর নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। প্রতিদিন ভোর ৪টের ক্যানিং লোকাল, লক্ষীকান্তপুর লোকাল ধরে কলকাতায় আসা অনিমা, সুফিয়া, রাজিয়া, মিনতিরা যখন গর্বিত দৃপ্ত পদক্ষেপে রাজধানীর অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাঁদের ঘাম চকচকে মুখে আমি নারী স্বাধীনতার লিখন দেখি। যখন ল্যাম্পপোস্টের আলোর নীচে চড়া মেকআপ বিক্রি করা আয়েশা, বিন্দিয়ারা পয়সা জমিয়ে ভাইয়ের কলেজের ফি জমা দেয়, আর সেই সঙ্গে নিজের পয়সায় শহরে কেনে এক কামরার ফ্ল্যাট, তখন তাদের কপালের টিপে আমি স্বাধীনতা লেখা দেখি। যখন অপমানের ভাত খাবে না বলে তথাকথিত কর্পোরেটের স্ত্রী হয়েও এক লহমায় বিলাসিতার জীবন ছেড়ে ঝাঁপ দেয় অনিশ্চিত জীবনে আর খুদকুঁড়ো জমিয়েই তৈরি করে নিজের একটা খোলা হওয়ায় ভেসে যাওয়া আস্তানা, তার শাড়ির আঁচল তখন স্বাধীন পতাকার মতো হাওয়ায় ওড়ে। এই বসন্তের প্রতিটা গাছে, শিমুল-পলাশে আমি একটাই স্লোগান লেখা দেখি— ভিখারি হও, কিন্তু পরাধীন নয়। নারী তুমি ‘না’- এর নিগড়ে আবদ্ধ না থেকে খোলা হাওয়ায় ডালপালা মেলো।

(লেখক কলকাতার একটি বুটিক সংস্থার মালিক। কাব্যচর্চাও করেন। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)