সারথি বিশ্বাস

আজ একটা বিশেষ দিন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। তবে কোনও বিশেষ দিবস রজনী বলে তো নয়, নারীর অধিকার নিয়ে কিছু বলতে গেলেই তার সঙ্গে একটা ‘বাদী’ জুড়ে দেওয়াই নিয়ম। এতে অসুবিধা বা আপত্তির কিছু নেই। তবে বাদী আছে মানেই ধরে নিতে হয় বিবাদী কেউ আছে, সমস্যা এই বিবাদী নিয়ে। কে বা কারা এই বিবাদী প্রতিপক্ষ? আর কেনই বা তারা বিবাদী? নারীও আর পাঁচটা মানুষের (পড়ুন পুরুষের)  মতো মানুষ, নারী শ্বাপদ বা সরীসৃপ তো নয়! তাহলে তার বিবাদী কেউ কী করে হতে পারে, যার জন্য আর একজনকে বাদী (নারীবাদী) হতে হয়! তাহলে, নারীবাদীর বিপরীত কি পুরুষবাদী? ‘পুরুষবাদী’ শব্দটা কেমন খাপছাড়া ভাবে বেখাপ্পা শোনাচ্ছে তো?
শোনাবেই, আসলে অনেক স্ত্রীলিঙ্গবাচক শব্দেরই কোনও পুংলিঙ্গ নেই, এমন শব্দের কোনও প্রয়োজনই পড়েনি আমাদের সমাজে। যেমন, সতীর কোনও পুংলিঙ্গবাচক শব্দ নেই, তার দরকারই পড়ে না। কারণ, সতীত্ব শুধু মেয়েদেরই রক্ষা করতে হয়। বালাই ষাট! পুরুষদের ওসব বালাই নেই! সেই জন্য আমাদের সমাজে প্রেমই বলুন, আর ধর্ষণ, সবই ‘নারীঘটিত কেস’। ‘কেস’টা কোনও অবস্থাতেই পুরুষঘটিত নয় কেন? অর্থাৎ, নারীঘটিত শব্দেরও কোনও পুংলিঙ্গ বাচক শব্দ আমাদের অভিধানে নেই। প্রয়োজনই পড়ে না !
উল্টোদিকে, দেখতে পুরুষ পুরুষ হলেও, গা থেকে পুরুষ পুরুষ গন্ধ বেরোলেও ‘পুরুষতান্ত্রিক’ শব্দটা কিন্তু কোনও লিঙ্গবাচক শব্দ নয়। এটা একটা দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক গড়ন। পুরুষ যেমন পুরুষতান্ত্রিক হয়, নারীও হয়। এমনকি, অনেক নারী অনেক পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি পুরুষতান্ত্রিক মন-মানসিকতা লালন পালন করে। আবার, একজন পুরুষও পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে পারে।
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস, পুরুষদের কথা ছাড়ুন, তারা তো নিজের গদি আঁকড়ে থাকতে চাইবেই, পুরুষতান্ত্রিক সংবিধান বয়ে বেড়াবেই,  আমরা নারীরাও কি তা থেকে আজও মুক্ত হতে পেরেছি? হলে, নিজের মেয়েকে দিনে সাত বার ‘দেখেশুনে চলিস মা’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক ততবারই ছেলের ‘দেখাশোনা’র দিকেও নজর রাখতাম। বলতাম, মেয়েদের সম্মান করিস। মেয়ে বলে নয়, মেয়ে বলে বাড়তি কিছুও নয়, শুধু মানুষ বলেই সম্মান করিস। রাস্তা-ঘাটে, ভর্তি ট্রেনে, ভিড় বাসে পুরুষের পাশে যে ভাবে দাঁড়াস, যে ভাবে বসিস, একজন মেয়ের পাশেও সে ভাবে থাকিস। পুরুষকে যে ভাবে দেখিস, নারীর দিকেও সে ভাবে তাকাস। ভোগ করার জন্য পৃথিবীর জল, আলো, বাতাস আছে, উপাদেয় খাদ্য আছে, দর্শনীয় স্থান আছে, নারী নয়। নারী ভোগ্য নয়, তাই ভোগ নয়— তুমি নারীর সঙ্গ লাভ করে ধন্য হও। তুমি পুরুষ বলে নয়, সে নারী বলে নয়, দুজনেই মানুষ বলেই মনুষ্যত্বের সম্মানটুকু দিও।
আমরা নারীরা যদি পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতাম, কন্যাসন্তানটিকে ছোটকাল থেকেই বিউটি প্রোডাক্ট করে গড়ে তুলতাম না, ভোগ্যপণ্য হিসেবে প্রস্তুত করতাম না। শুধুই একজন মানুষ হিসাবে মানুষ করতে পারলে, পুত্রসন্তানটি পুরুষ হয়ে ‘তু চিজ বড়ি হে মস্ত মস্ত’ গানে গলা মেলাতো না, শিশুকন্যাটিও যৌবনে ‘আমি কলকাতার রসগোল্লা’ বলে কোমর দোলাতো না। বস্তুত, এমন শিল্পের সৃষ্টিই হত না তা হলে।  ভাবতে অবাক লাগে, নারীরা নিজে কী করে এ ভাবে রসগোল্লার মতো প্লেটে সাজিয়ে নিজেকে পরিবেশন করে! অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত অসহায় নারীদের কথা বাদ দিলাম, ভাবতে আশ্চর্য লাগে, শিক্ষিত, স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী নারীরাও কী ভাবে যুগের পর যুগ পুরুষতান্ত্রিকতাকে পোষণ করে চলে!
আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে নারীর লড়াইয়ের অনেক জায়গা আছে, তবে সব আগে তার নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া জরুরি। অনেকগুলো ‘স্ব’ করায়ত্ত করলেই স্বাধীনতা লাভ করা যায় না। পুরুষতান্ত্রিকতার মূল আসলে অনেক গভীরে প্রোথিত, মনের বিষ রক্তে মিশে আছে। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্মনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি সবকিছুর শিরা-ধমনীতেই পুরুষতন্ত্রের রক্তবীজ।
খালি চোখে দেখলে তো পৃথিবীর আহ্নিক গতি, বার্ষিক গতি, অপসূর-অনুসূরের সবটাই মেয়েদেরও, তবুও দিগন্তে ঢলে পড়ুক আরও একটা নারী দিবস। আমরা অপেক্ষা করি সেই দিনের, যে আহ্নিক গতির শেষে সমস্ত তন্ত্র-বেদী সমূলে উপড়ে সমাজের ‘বোনম্যারো চেঞ্জ’ করার মতো উন্নত হব আমরা। সবাই একসঙ্গে বলতে পারব, মেয়েরা পণ্যও না, পূজ্যও না, দাসীও না, দেবীও না, নারীও মানুষ।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)