অনল আবেদিন

‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’। কথাটি ভোট-বাতাসে বেশ খেলে বেড়াচ্ছে। তার রাজনৈতিক তাৎপর্যও মারাত্মক। ‘টুম্পার সঙ্গে ব্রিগ্রেড যাওয়া’র মতোই ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’ ও ‘ঘাস কাটলেই গরু পালাবে’— এই লব্জ দু’টিও বাম-মগজ থেকে উৎপন্ন বলে জনশ্রুতি। ওই জনশ্রুতির বাস্তবতার অনেকটা আভাস মেলে বামনেতাদের রাজনৈতিক আচরণ থেকে। তা না হলে ‘আত্মঘাতী’ ওই বিষাক্ত স্লোগান দু’টি ধুয়েমুঝে সাফ করে দেওয়ার দারুণ সুযোগ হাতের কাছে পেয়েও হেলায় কখনও হারায় ১০ বছর আগে গদিচ্যুত হওয়া বামেরা! গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেডের নজরকাড়া জনসমাবেশের মঞ্চ থেকে পক্ককেশ বামনেতাদের কেউ একজন ঘোষণা করতেই পারতেন, ‘‘কমরেডস! সোশ্যাল সাইটে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’ কথাটি আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক শত্রুতা থেকে কেউ বা কারা তৈরি করেছে। অনেকের মুখে ঘুরতে থাকা ওই ষড়যন্ত্রমূলক কথার ফাঁদে কেউ পা দেবেন না। আপনারা কেউ শত্রুর তৈরি করা ওই মিথ্যা কথাগুলো বিশ্বাস করবেন না।’’ তা হলেই ল্যাঠা চুকে যেত।
তা না-করে প্রায় প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে উল্টো আচরণ করছেন বিধানসভার সিপিএমের পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী। তিনি প্রায় প্রতিদিন বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের অপকম্মের সমালোচনা শুরু করেন নরেন্দ্র মোদী দিয়ে। তারপর দ্রুত পৌঁছে যান তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝাঁঝের পরিমাণ কিঞ্চিৎ বেশিই থাকে। তাঁদের ঘোষিত রণনীতি অবশ্য ‘বিজেপি ও তৃণমূল সমান শত্রু’। দুই ‘সমান শত্রু’র সঙ্গে বামেদের বাস্তব আচরণ তবে এমন অসমান কেন? তাই প্রশ্ন জাগে, ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’ ও ‘ঘাস কাটলেই গরু পালাবে’—এর মতো অলীক স্বপ্নগুলো গোপনে নেতারাও দেখছেন না তো? স্বপ্ন দু’টি অলীক কেন? এক বার রাজ্যপাটের ক্ষমতা দখল করলে আরএসএসের মতো রেজিমেন্টেড সংগঠনের ভক্তরা কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে। প্রাক্তন আরএসএস নেতা দিলীপ ঘোষ সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণাও করে দিয়েছেন। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর বর্তমান দশা দেখলে দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের ঘোষণার ভবিষ্যৎ সহজেই অনুমেয়। তাই, তখন প্রায় অস্তিত্বহীন কমরেডদের ‘ছাব্বিশে বাম’ দেখা আর সম্ভব হবে না।
বামেদের কাছে প্রকৃত অর্থে তৃণমূল ও বিজেপি ‘সমান বিপদ’ হলে কেবল ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’- এর মতো ভোটমন্ত্রের জন্ম হত না। এ রাজ্যে অ্যাডলফ হিটলারের মতো সর্বগ্রাসী ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন ঠেকাতে বাম-মগজে তখন ‘একুশে ঘাস আর ছাব্বিশে কাস্তে’র কথাও ঘুরপাক খেত। তা কিন্তু হয়নি। তা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কোন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী তত্ত্বের দাঁড়িপাল্লায় ‘স্বেচ্ছাচারী ও একনায়কতন্ত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর ‘ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট’ নরেন্দ্র মোদী’র শাসন-শোষণের ভার-ভর সমান হয়? কোনও মতেই যে সমান নয় তা অন্তত দেড় দশক ধরে মোদী-যোগী-শাহ থেকে শুরু করে সঙ্ঘ পরিবারের অন্তত আড়াই ডজন নেতানেত্রীর বাক্যে ও কর্মে প্রমাণ মিলেছে ধারাবাহিক ভাবে। গত ৬ মার্চ ফ্যাসিবাদের বিষাক্ততম বিদ্বেষ বিষ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। সেদিন তিনি কোনও রকম রাখঢাক না করেই কম্বোডিয়ায় এক অনুষ্ঠানে খুল্লামখুল্লা ঘোষণা করেন, ‘‘ভারতের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি সবচেয়ে বড় বিপদ। এর থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য বড়সড় প্রচেষ্টা করতে হবে।’’  ধর্মনিরপেক্ষদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ এবং তাঁদের ‘কোনও ভাবেই সহ্য করা যাবে না’ বলেও ঘোষণা দেন যোগী। এর পরেও কমরেডরা বলবেন ‘মমতা-মোদী সমান শত্রু’? অতীত ইতিহাস বলছে, তারপরেও তাঁরা তাই বলবেন, ‘হ্যাঁ মমতা-মোদী সমান শত্রু।’

তবুও কেন ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’-এর মতো ‘একুশে ঘাস , ছাব্বিশে কাস্তে’র জন্ম হল না, কমরেড?

মাথায় ঘোমটা দেওয়া, ইদের নমাজের আসরে ও ইফতার মজলিসে দোয়া-দরুদ পড়া, ইমামভাতা দেওয়া ও রোজার মাসে মসজিদে ইফতার পাঠানোর জন্য মমতাকে মুসলিম তোষণের দায়ে দায়ী করেন রামভক্তদের মতো বামভক্তরাও। ঠিকই করেন। তাঁদের প্রচারে কিন্তু ঠাঁই পায় না রাজ্যের সর্বজনীন পুজো কমিটিগুলোকে আর্থিক অনুদান দিয়ে, রেডরোডে পুজোর কার্নিভাল করে, গঙ্গাসাগর, কালীঘাট ও বেলুড়ের তীর্থযাত্রীদের পরিষেবার জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচ করে, পুরোহিত ভাতা চালু করে ও ছটপুজোয় তিন দিন ছুটি দিয়ে মমতার ‘হিন্দু তোষণ’-এর কথা। নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করা দলগুলোর প্রচারে একই ভাবে ঠাঁই পায়নি পার্লামেন্ট ভবনে প্রথম প্রবেশের সময় ষাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে, গঙ্গাতীরে রাজকীয় সান্ধ্যারতি করে, করোনা আবহে রামমন্দিরের শিলান্যাস করে সাংবিধানিক ভাবে ধর্মনিরপেক্ষ দেশে প্রধানমন্ত্রীর ‘হিন্দু তোষণ’ করার কথা। এটা কি মমতার ‘মুসলিম তোষণ’-এর মতো মোদীর ‘হিন্দু তোষণ’ নয়?
এ কথা কমরেডরা প্রচার করেন না কেন? তা কি রামেদের প্রতি বামেদের প্রচ্ছন্ন প্রীতির কারণে? নাকি সাড়ে তিন দশক ধরে রাজত্ব করা সিংহাসন ১০ বছর ধরে বেদখল থাকার যন্ত্রণাজনিত কারণে? কারণ দুটোই। গুলি খাওয়া আহত বাঘের যন্ত্রণার কথা সিপিএমের মতো আর কে জানে! সেই যন্ত্রণা থেকেই তুলনামূলক ভাবে বিজেপির থেকে তৃণমূলের প্রতি প্রতিহিংসার তীব্রতা বেশি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে তা উচিত কিনা সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ— এই বিষাক্ত দুই আগ্রাসন থেকে রাজ্যকে মুক্ত রাখতে বিজেপি বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে জোট বাঁধার পরার্মশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুই অর্থনীতিবিদ— অমর্ত্য সেন ও প্রণব বর্ধন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়াকে রক্ষা করার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কমরেড স্ট্যালিন ফ্যাসিস্ট হিটলারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। গুণীজনদের কথা বা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত ভারতীয় কমরেডরা মানবেন কেন? সিপিএম মনে করে, বিজিপির সঙ্গে দু’বার ঘর করা, গুজরাত দাঙ্গার পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে লাল গোলাপ ভেট দেওয়া ও বর্তমানে নানা ভাবে বিজেপিকে পুষ্ট করা তৃণমূলের সঙ্গে বামেদের জোট অসম্ভব। কথাটি খানিক সত্য বটে। এই ব্যাখ্যাও এক কথায় ফেলে দেওয়ার নয়। তবে পাশাপাশি আরও একটি পরম সত্য আছে। একদা রাজনৈতিক ভাবে ‘অচ্ছুৎ’ জনসঙ্ঘ-বিজেপিকে জাতে তুলেছে সিপিএম-ই।
‘স্বৈরাচারী’ কংগ্রেস ও সেই দলের ‘ডাইনি’ দলনেত্রী ইন্দিরা গাঁধীকে গদিচ্যুত করার তাগিদে ১৯৭৭ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবাণীর জনসঙ্ঘ-এর হাত ধরেছিল জ্যোতি বসুর সিপিএম। বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি বীরেন জে শাহের দিল্লির বাড়িতে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আডবাণীর সঙ্গে জ্যোতি বসুর গোপন বৈঠকের কথা আজ আর অজানা নয়। এবং জনসঙ্ঘের সঙ্গে ঘর করতে সিপিএমের দশম কংগ্রেসে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাও গৃহীত হয়েছিল। সাম্প্রদায়িক দলের সঙ্গে বাম দলের ঘর করার তীব্র বিরোধী ছিলেন সিপিএমের তৎকালীন সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পি সুন্দরাইয়া। এই নীতিগত বিরোধের কারণে দলের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের মতপার্থক্য দেখা দেয়। সেই কারণেই পি সুন্দরাইয়া দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করেন। তার পরে ১৯৮৮ সালে লোকসভার উপ-নির্বাচনে এলাহাবাদ কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থীকে হারিয়ে জিতেছিলেন বসু-বাজপেয়ীদের প্রার্থী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিংহ।
জ্যোতি বসুর কলকাতার শহিদ মিনার ময়দানে ১৯৮৮ সালের ২ মার্চ ভি পি সিংহকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য বিশাল জনসভা করা হয়। একই সঙ্গে হাত ধরাধরি করে সেই মঞ্চ আলোকিত করেছিলেন সিপিএমের জ্যোতি বসু ও বিজেপির অটলবিহারী বাজপেয়ী। ১৯৮৪ সালে লোকসভার নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২টি আসন। ১৯৮৮ সালে শহিদ মিনার ময়দানে যৌথসভা করার পরের বছরে লোকসভা নির্বাচন হয়। ‘বোফর্স গাঁধী’ (রাজীব গাঁধী)-কে হারাতে অকংগ্রেসি দলগুলো মিলিজুলি ভাবে ভোটে লড়ে। আগের বারে একা লড়ে মাত্র ২টি আসন পাওয়া বিজেপি এ বার পেল ৮৬টি আসন। মমতার মতোই জ্যোতি বসুরাও তা হলে ‘অচ্ছুৎ’ বিজেপিকে জাতে তুলেছেন, ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক দলটিকে ভোট-বাতাস দিয়ে পুষ্ট করেছেন। ফলে বিজেপিকে তোল্লায় দেওয়ার খেলায় ঘাসফুল ও কাস্তে-হাতুড়ি-তারা সমান অবদান রেখেছে। খেলার ভাষায়— ড্র।
তবুও কেন ‘একুশে রাম, ছাব্বিশে বাম’-এর মতো ‘একুশে ঘাস, ছাব্বিশে কাস্তে’র জন্ম হল না, কমরেড?

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)