সোহম চক্রবর্তী

 তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর নদীর ধারের বনবাংলো।
এক সন্ধেবেলা সেখানে বারান্দায় বসে আছি। সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল। কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ, একটানা – কুলকুল, কুলকুল… এইসব মিলে কতক্ষণ যে ঝিম মেরে আছি, খেয়াল নেই। প্রাথমিক জড়তা কাটাতে আমি একটা সিগারেট ধরাই। হাতে সময় বলতে এই রাতটুকু। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাততাড়ি গুটিয়ে রওনা দিতে হবে দূরে কোথাও।
ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার আগে নাগালের একদম বাইরে পৌঁছে যাওয়া চাই। অবশ্য দেখতে দেখতে চার নম্বর কেস হয়ে গেল এটা। আগের তিনটেতে যখন পার পাওয়া গেছে, তখন এ বারেও ব্যতিক্রম কিছু হবে বলে মনে হয় না।
তাছাড়া এইসব কেস থিতু হতে দিনকয়েকের বেশি সময় লাগা উচিত নয়। আর পাবলিককে একটু সামাল দেওয়া গেলেই উপরওয়ালারা হাত গুটিয়ে নেন। সব কানেকশন বাবা, সব কানেকশন… সিচুয়েশন যদি একেবারেই হাতের বাইরে চলে যায় তাহলে শ্রীঘরের হাঁ-মুখ দেখা কপালে নাচতেও পারে, তবে তলায় তলায় জামিন পেতে কতক্ষণ?
আগের তিনটে কেসে সাকসেসের পর এই সব ভয় চলে গেছে আমার। কিন্তু মুশকিল হল, ব্যাপারটা সাল্টে ফেলার পরে বেশ কিছুক্ষণ একটা খিঁচ থেকে যায়, এই এখন যেমন… সাতপাঁচ কতকিছু ভেবে চলেছি বসে বসে। বস্ বলে, এই নেচারটা চেঞ্জ করতে হবে। নইলে এ লাইনে উন্নতি করা মুশকিল… ‘ওরে, ইমোশন মাড়িয়ে কি দুনিয়া চলে, শালা?’
ঠোঁটে খাওয়া আলতো ছেঁকায় হঠাৎ-ই সম্বিৎ ফেরে আমার। সিগারেটটা জ্বলতে জ্বলতে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এতক্ষণে। বাকি আগুনটুকু বুটের চাপে নিভিয়ে দিয়ে ঘরে গেলাম আমি। দরজা দিলাম। গোছগাছ বাকি আছে বেশ অনেকটাই।
অদিতির লম্বা দু’ তিনটে চুল এখনও আটকে আছে বালিশে, বিছানায়। এইসব খুচখাচ প্রমাণ-টমান যতটা পারা যায় লোপাট করে যেতে হবে। নইলে আবার উটকো ঝামেলা।
লাশটা ফেলতে যেতে একটু তাড়াহুড়ো করা হয়ে গেল কি? আলোটা পুরোপুরি নিভে এলেই হত। বিকেল বিকেল আবছা আলোয় যদি দূর থেকে ঘটনাটা দেখে থাকে কেউ? অবশ্য এই জঙ্গলের মধ্যে, নদীর ধারে ত্রিসীমানাতেও তো লোকজন ছিল না কোনও… থাকার কথাও নয়। চারদিক দেখে, মোটামুটি সিওর হয়েই তো নদীতে ছুড়ে দিলাম বডিটা! আহা রে, এই তো কিছুক্ষণ আগেও কেমন ওই নদীর মতোই খলবল করছিল মেয়েটা। অদিতি, আমার বউ। চোখ বন্ধ করে শেষবারের মতো যখন এগিয়ে দিয়েছিল তুলতুলে ফুলের মতো ঠোঁট দুটো আমার দিকে, আমার বাঁ হাত তখন ওর বুকে, আর ডানহাতে খাপখোলা লকলকে ছুরি, খেয়ালই করেনি বেচারি… তাই তো এতটা সহজ হল কাজটা এ বার। তবে আফটার অল্, নিজের বউ তো… ঝোঁকের মাথায় সাপটে দিলাম বটে, কিন্তু অন গড, কেমন একটা লাগছে মাইরি…
দরজায় এইমাত্র ঠকঠক শব্দটা না হলে এমনই ভাবনার জালে আরও হয়তো জড়িয়ে যেতাম আমি। কিন্তু ঘোর কাটতেই বুকটা নিমেষের জন্য ছ্যাঁৎ করে উঠল আমার।
সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়েছে অনেকটাই। কুয়াশার চাদর আরও পুরু হয়ে এসেছে বাইরে। ঠিক যে সময়টুকুর মধ্যে কারও আর আসা উচিত নয়, কে এল ঠিক তক্ষুনি? পুলিশ না তো? অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী কেউ – ব্ল্যাকমেল করতে এসেছে? নাকি রাইভাল গ্যাং? তা হলে কি এ বার হাতেনাতে ধরা পড়ে যাব আমি? তিন বারের পর এই চতুর্থ বার?
নাকি… নাকি দরজা খুলতেই দেখব বনবাংলোর দিকে খিলখিল করে এগিয়ে আসছে নদী – জল নেই, রক্তের ঢেউ শুধু ছিটকে লাগছে গায়ে; আর সেই ঢেউ ভেঙে ভেঙে ভেসে উঠছে কে ও?– দুই স্তনের মাঝে বিঁধে থাকা ছুরি… হাসিমুখ আশ্চর্যময়ী… এগিয়ে আসছে… অদিতি… এরপরেও ও আমায় ক্ষমা করে দেবে না তো?
ছিটকিনিতে হাত রাখার এই দৃশ্যে আমি সেই থেকে দাঁড়িয়ে আছি। ওপারে কে, ওপারে কী – তা আমার মনে নেই। আজও শুধু নার্স এই দৃশ্যে এসে ঘণ্টায় ঘণ্টায় ওষুধ দিয়ে যায়…

(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)