রচনা মজুমদার

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ…
এখন কথা হল, কেউ জিজ্ঞাসা করলেই কি আমরা হৃদয় উজার করে বলে দিই? নাকি বলতে চাই? বরং আমরা গোপন কথাটি গোপনে রাখাই পছন্দ  করি। এ ভাবে চলতে চলতে কখনও আমাদের হৃদয়ের উত্তাপ কমে আসে। কখনও অন্তরঙ্গতা চলে যায়। এর মাঝে বসন্ত আসে, বসন্ত যায়।  আমাদের ছেলেবেলা মানে নব্বইয়ের দশক। সজনে ফুল নোয়ানো বসন্ত আসত তখন। পাখি ডাকত ‘মাছ মারিল রে’। সকাল থেকে রাত এ গাছে, ও গাছে কোকিল ডেকে যেত। ধুপধাপ প্রেমে পড়তাম আমরা। হৃদয়ের একূল-ওকূল দুকূল ভাসত। কিন্তু তখন প্রেমে পড়লে বন্ধু-বিছেদ হত অহরহ। কী রকম? একটু বুঝিয়ে বলি বরং। আমার বাবার মুখে শোনা, বাবার কোনও এক বন্ধু আট-দশ বার অসফল হওয়ার পর শেষমেশ যখন পরীক্ষায় বসলেন, তখন বন্ধুমহলে ভারী ধুম পড়ে গেল। বাবা ও তাঁর বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে চোথা সাপ্লাই করলেন এবং সেই মহোদয় শেষমেষ পাশ করলেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তিনি বলেছিলেন, ‘‘মীনাক্ষীকে আজ থেকে বোনের চোখে দেখব।’’ তাঁর এই উক্তির মধ্যে কিন্তু লুকিয়ে রয়েছে অনেক কিছু । সেই দলে, মানে যাঁরা চোথা সাপ্লাই করেছিলেন, তাঁদের একজনের হৃদয়ে মীনাক্ষীর জন্য গোলাপ ফুটেছিল। এ বলিদান কৃতজ্ঞতার বলিদান। ‘যার জন্য পাশ করলাম, তার কথা ভেবে এটুকু করতে পারব না!’ অতএব, প্রেয়সী আজ থেকে বোন। বছর কয়েক পরে যিনি বৌঠানও হয়েছিলেন।
তবে আমাদের মেয়েবেলা ছিল একেবারে উল্টো। আমরা ন্যূনতম পরিচিতকেও বন্ধু বলতাম। কিন্তু হৃদয়ে কাউকেই বসাতাম না। আমরা একাকিত্বে ভুগতাম। কারণ মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরের প্রবেশ পথে লেখা থাকত ‘ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড’। আমরা অভিনয় করতাম। আন্তরিকতা ছিল না। শুরুর দিকে বলছিলাম, প্রেমে পড়লে বন্ধুবিছেদ হত। এ বার দুটো উদাহরণ দিই। তখন শ্রেণি বিভাজন হত লেডিবার্ড সাইকেল দিয়ে। যার কাছে আছে, বন্ধু মহলে সে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়। অর্থাৎ এলিট ক্লাস। আমার তখনও লেডিবার্ড হয়নি। আমার ছিল ডায়না। ইতিহাস পড়তে যেতাম বাড়ি থেকে দূরে। যাওয়ার পথেই পড়ত একটা সোনা-রুপোর দোকান। দোকানের কর্মচারীর প্রেমে পড়েন আমার পাশের লেডিবার্ডের মালিক। সে আড়চোখে দেখত। উল্টো দিক থেকে কোনও সাড়া শব্দ আসত কিনা আমার জানা নেই। এমনই এক বসন্তের বিকেলে, উচ্চ মাধ্যমিক যখন প্রায় দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, লেডিবার্ড এল বাড়িতে । মাকে ডেকে বলল, ‘‘কাকিমা, এ বার থেকে আমি একাই যাব।’’ কারণও দর্শিয়েছিল, ‘‘জুয়েলার্সের দোকানের ছেলেটা আপনার মেয়েকে দেখে টিটকিরি দেয়। আমার মা মিশতে বারণ করেছে।” লজ্জা, নাকি রাগ— কী যে হচ্ছিল আমার। সেদিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া ছিল হয়তো। কিংবা বসন্তের মাতাল সমীরণ। আর আমি তখন লজ্জা-ঘেন্না-ভয়, সবেতেই মরছিলাম। এত বড় প্রতিশোধ? কেন? জুয়েলার্স দোকানের ছেলেটা লেডিবার্ড না দেখে ডায়নাকে দেখেছিল বলে? লেডিবার্ডের পরের ইতিহাস আমার অবশ্য অজানা।

মায়া কাটিয়ে যেদিন কলকাতা ফিরলাম, সেদিনই দেখলাম, শালপাতার ঠোঙায় খিচুড়ি দিচ্ছে কিছু লোকজন। আর একদল দুধমাখানো শিশু মন ভরে খিচুড়ি খাচ্ছে। খিলখিলিয়ে হাসছে। মনে হল এরাই তো পলাশ, এরাই কৃষ্ণচূড়া। এদের সামনে উজার করে বসন্ত এনে দিয়েছে কেউ। কে বলেছে, কোকিল ডাকলে বসন্ত আসে? বুকের জমা কান্নার বিশ্রামের দিন বসন্ত।

তারপর একে একে পেরিয়েছে বেশ কয়েকটা বসন্ত। রাধাচূড়া ঝরেছে। আবার ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোকে পলাশে…।’ পথ চলা থামেনি। বরং সামনের বিশ্ব নিজেকে মেলে ধরেছে বারবার। ‘‘পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন– মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়? তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে, পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে…।”
একদিন দেখলাম হইহই করে নিমগাছ, সজনে গাছ কাটা হচ্ছে। বাড়ি অন্ধকার হচ্ছে। আহারে! ফলন্ত গাছটা! এর নীচেই তো কত নতুন সম্পর্ক গড়ে। কত মান-অভিমান মিটমাট হয়। এখানেই তো ছিল বসন্তের দুয়ার। এমন ভাবেই চলে যেতে দেখি কত বসন্ত। বিগতযৌবনা এক ভদ্রমহিলা আমাকে বলেছিলেন, ‘‘আমি কি বুড়ির তালিকায় পড়ে গেলাম তবে? কোকিল ডাকলে আমার আর ভাল লাগে না কেন?’’
পথের পাঁচালী পড়তে পড়তে আমার মনে হত, এর অধিকাংশ জুড়ে বর্ষা। যদি বসন্ত হত? ‘‘লুব্ধ দরিদ্র ঘরের বালকবালিকাদের জন্য তাই করুণাময়ী বনদেবীরা বনের তুচ্ছ ফুলফল মিষ্টি মধুতে ভরাইয়া রাখেন।’’ তখন যদি এমনই বসন্তের বাতাস বইত? কিংবা অপু-দুর্গা কাশ নয়, পলাশ-কৃষ্ণচূড়া পেরিয়ে ট্রেন দেখতে গেল। কোনও এক ফাল্গুনে রানুদিদির বিয়ে হল। পাতালকোঁড়ের তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় পুজোর দিন না গুণে ওরা দোলের দিন গুণত। মন্দ হত ব্যাপারটা?
এখনকার দোল আর আগের মতো নেই। সে সময় দোলে মুরগির মাংসের ঝোল-ভাত ছিল বাঁধাধরা। একটা নির্দিষ্ট জামা ছিল। প্রতিবার দোলে সেটাই পরতে হবে। আগের দিন নেড়াপোড়া। পোড়া মাংসের কাবাব। দোলের দিন রাস্তা ফাঁকা। রাস্তা কারও একার নয়। সাদা পাঞ্জাবি তো নয়ই। কেউ গাছের ফাঁকে, কেউ পাঁচিলের আড়ালে। সেদিন নালিশ করাও যাবে না। ড্রাম কে ড্রাম জল। সেখানে বাঁদর রং, ড্রেনের পাঁক কী নেই! মনে আছে এক বন্ধু নিজে আগেভাগে স্নান সেরে ফ্ল্যাটের ট্যাঙ্কে লাল রং ঢেলে দিয়েছিল। শাওয়ার খুললেই ‘মোহে রং দো লাল’। তবে বাঁদরামি করার আগে কিন্তু ইশ্বরের আশীর্বাদ ঠিক নেওয়া হত। প্রথমে ঠাকুরের পায়ে আবির, তারপরে গুরুজন, তারপরেই, ‘আজকে আমায় ঠেকায় কে।’ সন্ধে হলেই দলবেঁধে সব আসত। কটরমটর করে মট, ফুটকড়াই ভাঙার শব্দ। উল্লাস। পরের দিন দেখতাম, কারও কানের পাশে লাল রং। কারও মুখ সবুজ।
সে বসন্তদিন আর কোথায়! তা বলে কি বসন্ত আসে না? আসে। তবে এ বসন্ত আলাদা। নিজের মতো করে সুন্দরও বটে। গোলাপি রঙের কাগজ ফুল, কী যেন একটা দাঁত ভাঙা নাম, ছেয়ে গিয়েছে সর্বত্র। নীচে দাঁড়িয়ে কত ছবি তোলে বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো। সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়াল দেখি রঙিন হয়ে আছে। এ-ও তো চোখের শান্তি। রঙে ডোবানোর উচ্ছ্বাস নেই। তবু এ-ও তো অন্য বসন্ত। বোলপুরে বসন্তের বর্ষা দেখলাম। ভাবলাম আহা, এই তো স্বর্গ! ভাবছিলাম, এমন বসন্ত কি কলকাতায় পাব! মায়া কাটিয়ে যেদিন কলকাতা ফিরলাম, সেদিনই দেখলাম, শালপাতার ঠোঙায় খিচুড়ি দিচ্ছে কিছু লোকজন। আর একদল দুধমাখানো শিশু মন ভরে খিচুড়ি খাচ্ছে। খিলখিলিয়ে হাসছে। মনে হল এরাই তো পলাশ, এরাই কৃষ্ণচূড়া। এদের সামনে উজার করে বসন্ত এনে দিয়েছে কেউ। কে বলেছে, কোকিল ডাকলে বসন্ত আসে? বুকের জমা কান্নার বিশ্রামের দিন বসন্ত।
তবু এই বসন্তেই আসে ভোটের হাওয়া। বসন্তের হাওয়ায় ভোটের পতাকা দুলে ওঠে। কৃষ্ণচূড়ার  গায়ে পেরেক পোঁতা হয়। নেতা-মন্ত্রীরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন। আপনারে বড় বলেন। তাঁরা কোকিলকণ্ঠী নন। তবু কোকিল ডাকে। তার ব্যাকগ্রাউন্ডে আগুন লেগেছে বনে বনে মানাত। তবু বনে ফাগুনই লাগে। সবাইকে জানান দিয়েই আবির্ভাব। ‘জানি নাই কো তুমি এলে আমার ঘরে’ বলার সুযোগ কাউকে দেয় না। বসন্ত ভাবনার, ভালবাসার। ভোটাভুটির নয়। অবশ্য এ বসন্ত ভোটের বসন্ত হলেও বসন্ত, না হলেও বসন্তই।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)