আবু তাহের

অদ্বিতীয়াদের বাড়িটা সদ্য তৈরি হয়েছে গুলশানবাগের কাছে। এখানে বেশ কিছু নতুন বাড়ি উঠলেও বেশিরভাগ জায়গাটাই  ফাঁকা। ফলে প্রচুর হাওয়া-বাতাস ওদের বাড়ির চারপাশে। তবু শহর, শহরই।
আগে থাকত গ্রামের বাড়িতে। যেখানে রয়েছে দাদু, ঠাকুমা। রনিতা ওর চেয়ে বছর তিনেকের ছোটো। ওর ক্লাস ফোর, আর রনিতার ক্লাস টু। গ্রামের একটা সরকারি বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করত ওরা। কিন্তু এই শহরে এসে নতুন ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে বাবা-মা। প্রথম প্রথম ওদের বেশ অসুবিধা হত কিন্তু টিউটর আর মায়ের তদারকিতে এখন বেশ চোস্ত হয়ে উঠেছে।
সকাল থেকে শুরু হয় ওদের টাইট শিডিউল। মা সকালে ঘুম থেকে তুলে দিয়ে টিফিন বানিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় টিউশন স্যরের কাছে। তারপরে সকাল ৯টার দিকে ফিরে এসে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে ওরা তৈরি হয়ে যায়। একদিকে বাবার অফিস আর একদিকে নিজের স্কুল। তার মাঝে ওদের জন্য সময় বের করতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায় মা।
বাবা তাড়া দেয়,— ‘দেখি, কে আগে খেয়ে রেডি হয়ে বেরোতে পারে, রনিতা নাকি অদ্বিতীয়া!’ বাবার সবকিছুতেই প্রতিযোগিতা করার অভ্যেস। অদ্বিতীয়া মাঝেমাঝে হাঁফিয়ে ওঠে। কিন্তু কিছু করার নেই। ওকে ক্লাসে ভাল রেজাল্ট করতেই হবে। প্রতিটা টার্মের পরীক্ষায় বাবা একটা করে টার্গেট তৈরি করে দেয়। এবং তার জন্য বরাদ্দ থাকে দারুণ সব দামি উপহার। রনিতা প্রতিবার টার্গেট ক্রস করে যায়। কিন্তু অদ্বিতিয়া কোনওবারই  টার্গেট পূরণ করতে পারে না। এ জন্য মনে মনে এক ধরনের হীনমন্যতায়ও ভোগে ।
বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে যে একটু মুক্ত বাতাস নেবে তার জো নেই। আবার ছোটো প্লে স্কুলে। প্রতিদিন  রাস্তায়  জ্যাম। দু’কিলোমিটার রাস্তা যেতে ওদের একঘণ্টা সময় লেগে যায়। বাবার প্রচুর সময় নষ্ট হয়। ওদেরও খুব অধৈর্য  লাগে গড়ির মধ্যে চুপ করে বসে থাকতে।
এ সময় গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজে কান ঝালাপালা হ‌ওয়ার জোগাড়। অবশ্য শুধুই গাড়ি, ঘোড়া নয়। ঘোড়া দেখা যেত তাদের গ্রামের বাড়ির রাস্তায়। টক টক টক আওয়াজ তুলে ছন্দোময় গতিতে ছুটে যেত ঘোড়ার গাড়ি। অদ্বিতীয়ার ইচ্ছে করে আবার একদিন সেই ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার। কিন্তু এখানে তো সেই জিনিস দুষ্প্রাপ্য।
এ দিকে মাস ছয়েক হল দাদুর কাছে যাওয়া হয়নি। সেই যে পুজোর ছুটিতে বেড়াতে গেছিল, তারপর থেকে আর ওদিকে পা মাড়ানোর মতো সময় হয়নি বাবার। মায়ের সাথে দাদু ঠাকুমার কী একটা হয়েছিল। কী সেটা মাকে অদ্বিতীয়া জিজ্ঞেস করেছিল। মা উত্তর দেয়নি। উল্টে চোখ রাঙিয়ে বলেছে, “এই সব বিষয় তোমাকে না জানলেও হবে।”
তারপর থেকে  সে আর মাকে জিজ্ঞেস করার সাহস‌ও পায়নি। কিন্তু মনে মনে প্রচণ্ড অভিমান হয় তার বাবা মায়ের  উপর। এই বাঁধনের জীবনের মধ্যে থাকতে ইচ্ছে করে না তার আর। কিন্তু রনিতাটা যেন কেমন, তার ঠিক উল্টো। গ্রামের বাড়ির কথা ওর বিশেষ মনেও পড়ে না। শহুরে জীবনে সে নিজেকে বেশ মানিয়েও নিয়েছে।
অনেকক্ষণ ধরে তাদের গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। পাশ থেকে টোটোগুলো টুকটুক করে হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে  চলছে। আর অদ্বিতীয়াদের চার-চাকাটা তার বড় শরীর নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। নড়তে চড়তে পারছে না একদম। বাবার কপালে ঘাম। প্লে স্কুলের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। কেন যে এখানকার ফ্লাইওভারের কাজটা এখনও পর্যন্ত আটকে আছে, কে জানে।
এতগুলো পয়সা খরচ করে ওদের প্লে স্কুলে ভর্তি করিয়ে যদি সময়মতো কোনওদিন যেতেই না পারে তাহলে বেকার বেকার পয়সাগুলো জলে দেওয়া হয় কেন? অদ্বিতীয়ার মনে হয়। ওদের বাবাও কি মনে মনে ভাবছিলেন এ সবই?
বাবা হঠাৎ সামনের সিগন্যালে গিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরেন। রনিতা, অদ্বিতীয়া অবাক হয়ে তাকায় বাবার দিকে। কী হল, ব্যাপারটা বোঝার আগে বাবাই খোলসা করে দেন— ‘আর প্লে স্কুলে গিয়ে তোমাদের খেলতে হবে  না। সকাল-বিকেল পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তোমরাও যা ইচ্ছে খেলবে।‘
বাড়ি পৌঁছে অদ্বিতীয়া ওদের ছোট মাঠের মতো ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে মিঠাই, পাপাই, সুনীতা, টুটুলদের সঙ্গে খেলা শুরু করে। বলে, ‘আজ থেকে আমি আর প্লে স্কুলে নয়, তোদের দলে খেলব রে!’

ওদের খিলখিল হাসিতে বিকেলের আকাশ-বাতাস যেন ঝলমল করে ওঠে।

অঙ্কন: অর্কজ্যোতি প্রামাণিক