অনল আবেদিন

সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে দেশের বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ অর্মত্য সেন ও প্রণব বর্ধন-সহ রাজনীতি অভিজ্ঞ অনেক গুণীজন চেয়েছিলেন, বিজেপি বিরোধী বাম ও গণতান্ত্রিক দলগুলো জোট গড়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে এ বারের বিধানসভা ভোটে লড়ুক। তবুও বরাবরের মতো এ বারের ভোটেও ‘রবিনহুড’ ও ‘অগ্নিকন্যা’র মধ্যে দলীয় জোটবন্ধন সম্ভব হয়নি। জোট গড়া বহু দূরের কথা, তা নিয়ে কোনও বাক্যই খরচ করেননি ‘রবিনহুড’, তথা প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী ও ‘অগ্নিকন্যা’, তথা তৃণমূল ‘সুপ্রিমো’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আসলে এঁদের দু’জনের মধ্যের সিকি শতকের অভূতর্পূব রাজনৈতিক রসায়নই জোটবন্ধন না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গেও তৃণমূলের একাধিক বার জোট হয়েছে। সেই জোটকে কোনও বারই অধীর নিয়ন্ত্রিত মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস পাত্তা দেয়নি। একই কারণে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট আকাশকুসুম কল্পনাতেও ঠাঁই পায়নি। অধীর-মমতা দু’জনেই নিজের নিজের রাজনৈতিক মাঠে চরম লড়াকু। সোনার চামচ মুখে দিয়ে তাঁরা কেউ-ই জন্মাননি। এমনকি স্টিলের চামচও না। নানা ধরনের দুরূহ চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে তৃণমূলস্তর থেকে উঠে আসা ওই দুই ব্যক্তি আজ রাজনীতির শীর্ষদেশে অবস্থান করছেন। দু’জনেরই তুল্যমূল্য জেদ আজ ‘মিথ’। আবার দু’জনেই বেশ আবেগপ্রবণও বটে। এমন মিল থাকা দুই নেতানেত্রীর রাজনৈতিক অবস্থান কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে বিপরীত দুই মেরুতে অবস্থিত। সাপে-নেউলে সর্ম্পকের মতো সেই অবস্থান। রাজনীতিতে কেউ কারও চিরস্থায়ী শত্রু হয় না। আবার চিরস্থায়ী মিত্রও হয় না। রাজনীতির মাঠে বহুল প্রচলিত এই কথাটি ‘অগ্নিকন্যা’ ও ‘রবিনহুড’- এর ক্ষেত্রে একেবারেই অচল।

সোনার চামচ মুখে দিয়ে তাঁরা কেউ-ই জন্মাননি। এমনকি স্টিলের চামচও না। নানা ধরনের দুরূহ চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে তৃণমূলস্তর থেকে উঠে আসা ওই দুই ব্যক্তি আজ রাজনীতির শীর্ষদেশে অবস্থান করছেন। দু’জনেরই তুল্যমূল্য জেদ আজ ‘মিথ’। আবার দু’জনেই বেশ আবেগপ্রবণও বটে। এমন মিল থাকা দুই নেতানেত্রীর রাজনৈতিক অবস্থান কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে বিপরীত দুই মেরুতে অবস্থিত। সাপে-নেউলে সর্ম্পকের মতো সেই অবস্থান। রাজনীতিতে কেউ কারও চিরস্থায়ী শত্রু হয় না। আবার চিরস্থায়ী মিত্রও হয় না। রাজনীতির মাঠে বহুল প্রচলিত এই কথাটি ‘অগ্নিকন্যা’ ও ‘রবিনহুড’- এর ক্ষেত্রে একেবারেই অচল।

বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবস্থানের বিচিত্র পরিবর্তন ঘটতে দেখা যায়। একদা সিপিএম নিয়ন্ত্রিত সমাজবিরোধীদের আক্রমণে অধীর চৌধুরীর প্রাণ খোয়ানোর যাবতীয় উপক্রম হয়েছিল। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে তিনি বরাতজোরে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপে ২০১৬ সাল থেকে সেই সিপিএমের সঙ্গেই তিনি একাধিক বার জোট বেঁধেছেন। কিন্তু জোট তো বহু দূরের কথা, অধীর-মমতার বৈরিতা প্রায় তিন দশক ধরে একই রকম অটুট রয়েছে। তার বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। শোষণমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়ার স্বপ্ন অধীর দেখেছিলেন স্কুল জীবনেই। সেই স্বপ্নপূরণের আবেগে দশম শ্রেণির পড়ুয়া অধীর চৌধুরী নকশালপন্থী রাজনীতির গেরিলা সংগ্রামকে হাতিয়ার করেন। মাও জে দং-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত কিশোর অধীর আত্মগোপনে থেকে ‘শ্রেণিশত্রু’র বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়েছেন।  আত্মগোপন করে থাকা অধীর চৌধুরী কয়েক বছর জেলবন্দি ছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার দেড় দশক পরে ১৯৯১ সালে ভোট-রাজনীতিতে অধীর চৌধুরীর হাতেখড়ি।
সেই লগ্নে মমতা-অধীরের মধ্যে আজকের মতো বৈরিতা ছিল না। বরং সম্পর্ক কিঞ্চিৎ মধুরই ছিল। সেই মাধুর্যের সৌজন্যে একদা সিপিএমের ‘ভিয়েতনাম’, তথা নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিটে জীবনে প্রথমবার ভোটে লড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। সে বার তাঁকে দলের প্রার্থী করতে সম্মত ছিল না প্রদেশ কংগ্রেস নেতা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ও অতীশচন্দ্র সিংহদের লবি। তখন রাজ্য যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অজিত পাঁজার স্নেহধন্য। যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ ঘনিষ্ঠ ছিলেন মুর্শিদাবাদ জেলা যুব কংগ্রেস সভাপতি মান্নান হোসেন ও তাঁর ছায়াসঙ্গী অশোক দাস। তাঁদের সৌজন্যে ও মমতা-অজিতের দৌলতে সে বারের ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রথম সুযোগ পেয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। সেই সখ্য অবশ্য বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
১৯৯১ সালের মে মাসে ভোটগ্রহণের দিন অধীর চৌধুরী ও জঙ্গিপুর লোকসভার কংগ্রেস প্রার্থী মান্নান হোসেনকে নবগ্রামের বাঘিরাপাড়া বুথে পুড়িয়ে মারার আপ্রাণ চেষ্টা হয়েছিল। পাশের রসুলপুর গ্রামে তাঁদের দু’টি গাড়ি পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করে দেয় দুষ্কৃতীরা। তারপরেই বিভিন্ন বুথ দখল করে অধীর-বিরোধীরা ছাপ্পা ভোট দেয়। কোনও মতে প্রাণে বাঁচলেও ছাপ্পাভোটের দৌলতে তাঁরা হেরে যান। তার পর ১৯৯৬ সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী মনোনয়ন ঘিরে মমতা-অধীরের ক্ষণিকের মিত্রতা চরম বৈরিতায় পৌঁছে যায়। তখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন মমতার চক্ষুশূল সোমেন মিত্র।
সোমেন মিত্রের মনোনীত তালিকায় ঠাঁই পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে চার জন— শঙ্কর সিংহ, সুলতান আহমেদ, অধীর চৌধুরী ও মৃণাল সিংহ রায়কে ‘সমাজবিরোধী’ আখ্যা দেন রাজ্য যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই চার জন ‘অ্যান্টিসোশ্যাল’কে প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে কলকাতায় হাজরার মোড়ে নিজের শাড়ির আঁচল নিজের গলায় পেঁচিয়ে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেন মমতা।  অনেকের মতে ‘নাটক’। সেই সময় কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখোপাধ্যায় কথিত ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বেশ ‘হিট’ হয়েছিল। মমতার দাবি অগ্রাহ্য করে সোমেন মিত্র চার জনকেই প্রার্থী করেন। নবগ্রাম থেকে অধীর চৌধুরী নির্বাচিত হন। মমতা-কথিত চার ‘অ্যান্টিসোশ্যাল’- এর মধ্যে তিন জনকেই পরবর্তীতে দলে গ্রহণ করে তৃণমূল সুপ্রিমো তাঁদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন দেন। অধীর কিন্তু ‘ঘাসপাতা’ খেতে আজ পর্যন্ত সে পথে হাঁটেননি।
সেই শত্রুতার কারণে রাজনৈতিক যাবতীয় সৌজন্যবোধ শিকেয় তুলে রেখে বিভিন্ন প্রকাশ্য সমাবেশে অধীরকে লাগাতার ব্যক্তি আক্রমণ চালিয়ে যান তৃণমূল সুপ্রিমো।  সেই ‘চির শত্রুতা’র আবহে ২০০১ সালে, ২০০৬ সালে এবং ২০১১ সালের বিধানসভা ভোটে এবং ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে তৃণমূলের সঙ্গে জোট গড়া হয়। সনিয়া ও প্রণবের নির্দেশ সত্ত্বেও প্রতিবারই জোট অস্বীকার করেন তৎকালীন মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী।
২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিন বারের বিধানসভা ভোটেই তিনি মুর্শিদাবাদ জেলায় জোটের তৃণমূল প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নিজের অনুগতদের ‌র্নিদল প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করান। সেই নির্দল প্রার্থীদের হয়ে প্রকাশ্যে তিনি নির্বাচনী প্রচারও করেন। প্রায় একক প্রচেষ্টায় আবু তাহের খান, নিয়ামত শেখ, মনোজ চক্রবর্তী ও অপূর্ব সরকারদের মতো নির্দলদের তিনি জিতিয়ে বিধানসভা ভবনে পাঠিয়েছেন। তাঁর দৌলতে জীবনে প্রথম বার বিধানসভা ভবনে প্রবেশ করতে পারা চার জন বিধায়কের মধ্যে তিন জনেই পরবর্তী কালে দলবদল করে তৃণমূলে চলে গিয়েছেন। যাননি কেবল মনোজ চক্রবর্তী।
তৃণমূলের সঙ্গে জোট গড়লে এ রাজ্যে কংগ্রেসের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে, মমতার সর্বগ্রাসী আগ্রাসনে কংগ্রেস বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রথম থেকেই এটা অধীর চৌধুরীর পূর্বানুমান ছিল। সেই কারণ দেখিয়ে তিনি মুর্শিদবাদ জেলায় মমতার সঙ্গে কোনও বারই জোট মানেননি। তাঁর সেই রাজনৈতিক দূরদর্শিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯৯৬ সালে হাজরার মোড়ে মমতার গলায় নিজের শাড়ির আঁচলের ‘ফাঁস’ দেওয়ার চেষ্টা। ২০১১ সালে তৃণমূল-কংগ্রেস রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরে অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে বিমাতৃসুলভ আচরণ ও আগ্রাসনে অতিষ্ঠ শরিক কংগ্রেস জোট সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
যাবতীয় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে দু’পায়ে মাড়িয়ে, লোভ ও ভয় দেখিয়ে বিরোধী দলগুলোর অনেক বিধায়ক, পুরসভা ও ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যদের তৃণমূল নিজের দলে নিয়ে যায়। বিরোধীশূন্য শাসনব্যবস্থা কয়েম করতে চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট না করার বাস্তব ভিত্তি আরও দৃঢ় হয় ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে। রাষ্ট্রশক্তি হাতিয়ার করে বিরোধীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দিয়ে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত জবরদখল করে তৃণমূল। বিজেপির সাম্প্রদায়িক রথের গতি ঠেকাতে বিরোধীদের সার্বিক জোটের ক্ষীণ সম্ভবনাটুকুও নস্যাৎ করে দেয় তৃণমূলের এই উলঙ্গ স্বৈরশাসন।
জোট সম্ভবনার মুমূর্ষু দেহের উপর মমতা শেষ পেরেকটি পুঁতলেন করোনা কালে। সাড়ে তিন ঘণ্টার নোটিসে প্রধানমন্ত্রী নিদর্য়ের মতো লকডাউন ঘোষণা করলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়েন বিভিন্ন রাজ্যের কয়েক কোটি অসহায় শ্রমিক-মজুর। অভূতপূর্ব বিপন্নতায় বহুদূরে আটকে পড়া এ রাজ্যের কয়েক লক্ষ মানুষকে নিজের জেলায় ফিরিয়ে আনার জন্য লোকসভার কংগ্রেসের দলনেতা অধীর চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়কে একাধিক বার চিঠি লেখেন, মেল করেন। প্রধানমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রী সাড়া দিলেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাড়া দেননি। বাধ্য হয়ে এক-দেড় হাজার কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে, সাইকেলে চেপে, দেড়-দু’লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে বিপন্ন, অভুক্ত ও অসহায় দিনমজুররা গ্রামে ফেরেন। নানা ধরনের চাপের ফলে, অনেক দেরিতে কিছু শ্রমিক নিয়ে কিছু ট্রেন ও বাস এ রাজ্যে আসার অনুমতি দেন মুখ্যমন্ত্রী। সেটাও সরকারি ঘোষণা মেনে বিনা ভাড়ায় নয়। চড়া দামে ট্রেন বাসের টিকিট কেটে তাঁরা বাড়ি ফেরেন।
অধীর চৌধুরীর এক অনুগামীর মন্তব্য, ‘‘এত কিছুর পরেও অধীরদা কোন ভরসায় বিজেপির সঙ্গে দু’বার ঘর করা এক হৃদয়হীনার সঙ্গে বিজেপি বিরোধী জোট বাঁধবেন?’’ তাই তৃণমূলের সঙ্গে জোট না বাঁধার ‘অধীর-আর্জি’তে সনিয়া গাঁধী এই প্রথম সিলমোহর দেন।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)