অসিত পাল

তিরুঅনন্তপুরুমের আরিয়া রাজেন্দ্রন একুশ বছর বয়সে মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিকেন্দ্রীকরণের ভিতকে শক্ত করেছেন— এটা রাজনীতির বিশ্লেষকেরা দাবি করছেন, সমাজতাত্ত্বিকেরা হাততালি দিচ্ছেন। ‘এলিট’ শ্রেণির এই তাত্ত্বিকেরা মাঝেমধ্যে গাঁ-গঞ্জে গিয়ে বিকেন্দ্রীকরণের ভাঙা ভাঙা কিছু ছবি তুলে ধরেন হয়তো। কিন্তু আমরা যারা ছবির মধ্যেই থাকি, তারা জানি বাস্তব চিত্র বড্ড তেছড়া। অভিজ্ঞতা আমাদের বইপড়া নয় বা গবেষণার জন্য ‘থিসিস’ টোকাও নয়। আমরা ভুক্তভোগী। কেন? একটু বলি।
আমাদের পঞ্চায়েতে একজন দলিত মহিলা একবার প্রথম প্রধান হলেন। অনেকদিন আগের ঘটনা সেটা। দলিত মহিলা অঞ্চলে প্রথম প্রধান হচ্ছেন— বিষয়টা গণতন্ত্রের বিকেন্দ্রীকরণে সাড়া জাগানো ব্যপার হতে পারত। কিন্তু আমাদের অঞ্চলের দেহাতি জীবনে বিষয়টি বড্ড বেখাপ্পা লাগল সবার। আমাদের গাঁ-জীবনে মেয়েদের দাবিয়ে রাখতে এমন কিছু শব্দ এমন ভাবে ব্যবহার করা হয় যা ভদ্রলোকদের কানে বাজে। ভদ্রসমাজেও মেয়েদের দাবিয়ে রাখা হয়। ভাষাও হয়তো ভদ্র হয়। কিন্তু গ্রামের এবড়োখেবড়ো চালচিত্রে সেই মহিলা যখন প্রধান হলেন, গ্রামের বহু মহিলা-পুরুষ বলতে লাগলেন, ‘‘মাগি প্রধান! পঞ্চায়েত শেষ!”
গণতন্ত্রে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য পঞ্চায়েতরাজ শুরুর ভাবনা এবং সেটাকে আরও মজবুত করতে মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ। কিন্তু ভাবনা আর বাস্তব এক রেখায় তো চলে না। ঠান্ডা ঘরে তৈরি হওয়া  ভাবনা যখন সিদ্ধান্তে রূপায়িত গ্রামের গরম হাওয়ায় আসে, তা থেবড়ে যায়। দলিত সেই মহিলা যখন প্রধান হলেন, কী ভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মোয়া চটকে গেল তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি, সংরক্ষণের সুবাদে সেই মহিলা প্রধান হয়ে আমাদের অঞ্চলের মাথাব্যথা কী ভাবে বাড়িয়েছিলেন। সেদিন এটাও আমরা দেখেছি, মহিলা শুধু নামেই প্রধান হন। সই বা টিপসই করা ছাড়া কোনও সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারেন না।

বৌদি জিতলেন। কিন্তু পঞ্চায়েতের প্যাড থাকে দাদার দোকানে। ঠিকাদারদের সঙ্গে টেন্ডারের রফা করেন দাদা। পার্টির বড় নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেন দাদা। বৌদি মাঝে মাঝে পঞ্চায়েতের চেয়ারে বসেন বটে, সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু দাদাই। মানুষ দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে ভুলেই যান ‘ওরিজিনাল’ প্রধানের কথা।

সেই প্রধান ছিলেন দলিত, দরিদ্র, প্রান্তিক। তাঁর স্বামী খেত নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। প্রধানকে মোটরবাইকে নিয়ে বেড়াতেন এক গ্রাম্য নেতা। আসলে সেই নেতাই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যে জানি না, তখন আমি ছাত্র। তবে শোনা যায়, সেই প্রধানকে ফাঁসানোর জন্য পঞ্চায়েতের প্যাডে প্রধানেরই ডেথ সার্টিফিকেট লিখে প্রধানকে দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছিলেন কে বা কারা। প্রধান তেমন লেখাপড়া জানতেন না বললেই চলে। নেতা যেখানে সই করতে বলতেন, তিনি সেখানেই সই করতেন। সেই নেতাই প্রধানকে শিখিয়েছিলেন, পঞ্চায়েতের প্যাডে কী ভাবে ‘ইনিশিয়াল’ করতে হয়। সেই মহিলা প্রধান পেন চালিয়ে ‘ইনিশিয়াল’ আঁকতেন প্যাডে। সেটা যদি তাঁর নিজের ডেথ সার্টিফিকেট হয়, সেখানেও। শিক্ষিত, সম্পন্ন বা শহুরে মহিলাদের এতে মুখটিপে হাসার কিছু নেই কিন্তু।
বাস্তবে বাড়ির বৌ প্রধান কখন হয়? বাড়ির কর্তার টিকিট পাওয়া সংরক্ষণের কারণে আটকে গেলে। তাই না? মানে, টিকিট পাওয়ার কথা ছিল বুদু ঢালির। কিন্তু সংরক্ষণের গেরোয় দেখা গেল সেই আসন এসসি মহিলা। তখন বুদুদা না দাঁড়িয়ে ভোটে দাঁড়ালেন বৌদি। ভোটের প্রচার থেকে রিগিং সবই করলেন দাদা। বৌদি জিতলেন। কিন্তু পঞ্চায়েতের প্যাড থাকে দাদার দোকানে। ঠিকাদারদের সঙ্গে টেন্ডারের রফা করেন দাদা। পার্টির বড় নেতাদের সঙ্গে মিটিং করেন দাদা। বৌদি মাঝে মাঝে পঞ্চায়েতের চেয়ারে বসেন বটে, সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু দাদাই। মানুষ দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে ভুলেই যান ‘ওরিজিনাল’ প্রধানের কথা। সবাই বলে বুদু প্রধান। হঠাৎ কোনও ক্লাবের রক্তদান শিবিরে যখন মাইক গর্জে ওঠে, ‘‘আজকের অনুষ্ঠানের সভাপতি মাননীয়া প্রধান শেফালি ঢালি!’’ লোকজন তখন একে অপরের মুখের দিকে তাকান। কেউ কেউ প্রশ্নও করে বসেন, ‘‘শেফালি ঢালি প্রধান নাকি? বুদু তা হলে কী?”
রাজনীতিও আসলে পুরুষতান্ত্রিক। সংসদে মহিলা-বিল পাশ করাতে কেমন জলঘোলা হয়েছিল তা আমরা কমবেশি জানি। লালুপ্রসাদ যাদব জানিয়েছিলেন,  জান থাকতে তিনি এই বিল পাশ করাতে দেবেন না। রাবড়ীদেবীকে মুখ্যমন্ত্রী করেছিলেন যদিও। জানি না রাবড়ীদেবী শেফালি বৌদির মতো শুধুই চেয়ার সামলাতেন কিনা!
(লেখকের মতামত ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)