দেবকুমার সোম

এ বারের ২৩ মার্চ দেশজোড়া কৃষক আন্দোলনের জন্য ঘটনাবহুল। ১৯৩১ সালে এই দিনে সন্ধে ৭টার সময় সভ্য দেশের যাবতীয় রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে ব্রিটিশরাজ লাহোর সেন্ট্রাল জেলে সর্দার ভগৎ সিংয়ের সঙ্গে তাঁর আরও দুই সাথী শিবরাম হরি রাজগুরু ও শুকদেব থাপারকে ফাঁসি দেয়। যদিও তাঁরা তিন জন ছিলেন সমবয়সী, তবুও রাজনৈতিক বীক্ষা আর নেতৃত্বের গুণে পরবর্তীকালে আমরা সর্দার ভগৎ সিংকেই ‘শহীদ–এ–আজ়ম’ এর মর্যাদা দিয়েছি।
ভগৎ সিং এই উপমহাদেশের এমন এক সর্বমান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা সবকিছুই দেশজ। তিনি জন্মেছেন কৃষিপ্রধান অর্থনৈতিক সমাজের এক কৃষক পরিবারে। তাঁর বেড়ে ওঠা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে, অথচ তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ মার্কসবাদ নির্ভর সমাজতন্ত্রে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক চেতনা আর আন্দোলন গ্রামভিত্তিক এই উপমহাদেশের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী এবং বিশিষ্ট।
গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে দিল্লির উপকণ্ঠে কৃষকেরা যে অবরোধ আন্দোলন শুরু করেছেন, দেখতে দেখতে আগামী ২৬শে মার্চ ভারত বনধের মধ্যে দিয়ে তা চার মাস পূর্ণ করবে। এই আন্দোলন দেশজ সংবাদমাধ্যমের গরিষ্ঠ অংশের অসহযোগিতা থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব বাজারে নরেন্দ্র মোদী সরকারের মুখ পুড়িয়েছে। বর্তমান ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যে সাধারণ কৃষকের স্বার্থ বিরোধী তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়েছে। এখনকার কেন্দ্রীয় সরকারের ফ্যাসিস্ত রাজনীতির সঙ্গে সূক্ষ্মভাবে মিশে আছে কর্পোরেট কালচার। সরকার যে দেশটাকে ক্রমশ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করেতে চলেছে নয়া কৃষক আইন তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
ভগৎ সিং জেল থেকে এক চিঠিতে তাঁর মাকে লিখেছিলেন, তিনি নিশ্চিত দেশ স্বাধীন হবে। তবে তাঁর সংশয় ছিল দেশটা নামে স্বাধীন হলেও আসলে বাদামি চামড়ার সাহেবদের খপ্পরে পড়বে। তিনি চিঠিতে তাঁর মাকে খুব স্পষ্ট করে লিখেছিলেন যে, স্বাধীন দেশে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর কোনও উন্নতি হবে না। আমাদের মনে রাখতে হয় ব্রিটিশরাজের শুরুয়াৎ হয়েছিল বেনেগিরির  মধ্যে দিয়ে। পরে তার সঙ্গে সূক্ষ্ম ভাবে মিশেছিল ধর্ম। শেষটায় রাজনীতি। আজকের সরকারি শোষণ ব্যবস্থায় আশ্চর্যজনক ভাবে পদ্ধতিগত হুবহু একই কায়দার অনুশীলন আমরা দেখতে পাচ্ছি। ধর্ম আর কর্পোরেট কালচারের মিশেলে মানুষের শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার ফ্যাসিস্ত কৌশল শুরু করেছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।
ভারতের সত্তর শতাংশ মানুষ এখনও গ্রামে বাস করেন। ফলে এ দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ কৃষি নির্ভর। অথচ ভারতীয় কৃষি ব্যবস্থার প্রধান অসুখ হলো আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অসাম্য। এখনও দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক মাত্র তিন–চার শতাংশ কৃষক পরিবার। যাঁদের জীবনযাত্রা অতীতের দেশীয় রাজাদের চেয়ে কিছু কম নয়। তাঁরাই দেশের রাজনীতির প্রধান মুখ। গ্রামীণ সমাজের ভাগ্যবিধাতা। সবুজ বিপ্লবের নামে যে ধোঁকাবাজি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় করা হয়েছিল, তার ফল লাভ করেছেন কেবলমাত্র এইসব মুষ্টিমেয় বিত্তশালী পরিবার। ফলে অসাম্য আর জাত–ধর্মের অসুখে আক্রান্ত ভারতীয় গ্রামীণ অর্থনীতি। নরেন্দ্র মোদী সরকার মূল অসুখ সারানোর কোনও চেষ্টা তো করলেন না, বরং এক সময় যে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল তাঁর দলের মূল শ্লোগান, সেই কংগ্রেসি ধোঁকাবাজিকে আজ তিনি শিল্পের স্তরে নিয়ে গিয়েছেন। প্রতিবাদের কেউ নেই। প্রতিরোধের কেউ নেই। কারণ আজকের দিনে রাষ্ট্রবিরোধীদের দেশবিরোধী হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁদেরকে সেন্সর করা হচ্ছে মিথ্যে মামলায়। বিনা বিচারে জেলবন্দি করে রাখা হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র-বিরোধিতা আর দেশ-বিরোধিতা এক নয়, তার প্রমাণ সর্দার ভগৎ সিং।
সর্দার ভগৎ সিং ছিলেন চরমভাবে রাষ্ট্রবিরোধি এক সত্তা। তিনি মনে–প্রাণে ছিলেন ব্রিটিশরাজ বিরোধী। লালাজি (লালা লাজপৎ রায়) কংগ্রেসি নেতা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর খুনের বদলা নেওয়ার পরিকল্পনা ভগৎ সিং সম্পন্ন করেছিলেন। অথচ, তাঁর মতো প্রথম শ্রেণির দেশপ্রেমিক সারা পৃথিবীতেই বিরল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংস্থার মূল মন্ত্র, সবার ওপরে রাষ্ট্র। তাঁরা দেশ নয়, রাষ্ট্রকেই বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনকে তাঁরা গৌণ ভাবেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠাতারা চেয়েছিলেন স্বাধীন দেশ নয়, এক স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র। প্রস্তাবিত কৃষি আইন সেই রাষ্ট্রকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে।
ভারতের মতো প্রকৃতি নির্ভর বৈচিত্রময় কৃষিপ্রধান দেশে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজন ছিল সমবায় ব্যবস্থার। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল আমাদের দেশে সমবায় ব্যবস্থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সমবায় আন্দোলনের মূলমন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক ক্ষমতা লাভের সিঁড়ি হিসাবে তা ব্যবহারের দরুণ আজকের দিনেও দেশে উন্নততর কোনও কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করা যায়নি। স্থানীয় মান্ডি ব্যবস্থা প্রাথমিকভাবে ছিল সমবায় আন্দোলনের অংশ। মূল আয়োজন ছিল গরিব কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্য মান্ডি বা স্থানীয় বাজারে নিয়ে আসবেন, যেখান থেকে সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কৃষকের আর্থিক উন্নতি হবে। সেখানে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি ছিল কৃষকের রক্ষাকবচ। দুঃখের বিষয় আর পাঁচটা সাধু উদ্যোগের মতো এই ব্যবস্থাও ধনী কৃষকেরা কুক্ষিগত করে রাখায় সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা রাজনৈতিক সমতা আসেনি।
প্রস্তাবিত কৃষি আইনে নরেন্দ্র মোদীর সরকার মান্ডি ব্যবস্থার এই অসাম্যকে কাজে লাগিয়ে পুরো কৃষি অর্থনীতিকেই কর্পোরেটের হাতে তুলে দিতে চাইছে। একটু গভীর ভাবে যদি আমরা লক্ষ করি, তবে দেখতে পাব আজকে শহরের পণ্য ব্যবস্থায় সংগঠিত কর্পোরেটের সামনে প্রতিদিন কী ভাবে মার খাচ্ছে স্থানীয় অসংগঠিত ব্যবসায়ীরা। আজকে আমাদের শহর থেকে আধা গ্রাম সর্বত্রই মুদিখানার ব্যবসা প্রায় লাটে উঠেছে। যে মুদিখানা ব্যবস্থায় বহু ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও দোকানদারদের একচেটিয়া দখলদারি ছিল না। আর আজ সারা দেশে হাতে গোনা দু–চারটে কর্পোরেটের হাতে চলে গিয়েছে মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের মুদিখানা ব্যবস্থা। এখানে উপভোক্তার কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।
আমাদের দেশের আগামীদিনের কৃষি ব্যবস্থার ছবিটাও প্রায় অনুরূপ। যে কর্পোরেটের হাতে দেশের মুদিখানা ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে, তাদের হাতেই থাকবে কৃষি বণ্টন ব্যবস্থা। ফলে গ্রাম থেকে শহরের প্রতিটা ক্ষেত্রেই অর্থনীতির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কয়েকটা হাতে গোনা একচেটিয়া মুনাফাখোরদের কাছে। আর তাঁরাই নিয়ন্ত্রণ করবেন আগামিদিনের ভারতের অর্থনীতি থেকে রাজনীতি সবটাই।
এ বছরের ২৩ মার্চ আমাদের কাছে আর এক দাসত্বের আগাম সতর্কতা জারি করছে।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)