কাবেরী বিশ্বাস

গরম পড়তে শুরু করেছে। শুরু হয়ে গিয়েছে জলসঙ্কট। ২০১৮ সালে নীতি আয়োগ বলেছিল, ভারতের ২১টি বড় শহরে ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ জলস্তর। ২০১৯ সালে তীব্র জলসঙ্কটে ভুগেছিল চেন্নাই। তারপরে এক বছর যেতে না যেতেই আমরা সব ভুলে গিয়েছি। কারণ, গত বছরে জলের সঙ্কট তীব্র ছিল না। আমরা ভাবলাম, কোনও সঙ্কট নেই। সব ভয় দেখানো রিপোর্ট। সবচেয়ে অদ্ভুত  মানুষের মন। কুযুক্তি তাকে এক লহমায় বাস্তব ভোলায়। আমরা অনেকেই ভেবে নিলাম, করেনায় ধোয়াধুয়ি, কাচাকাচি অনেক বেড়েছে। তবু তো জলের টান ছিল না। তার মানে নীতি আয়োগ ঠিক বলেনি। অতএব, মাটির নীচে জলের ভাণ্ডার ফুরোচ্ছে না। তা হলে চিন্তা কিসের? দেদার জল নষ্ট করো!
এটা ভেবে দেখলাম না যে, গত বছর বর্ষার দাক্ষিণ্য ছিল অঢেল। তাই কৃষিতে সেচের জলের জন্য মাটির জল ব্যবহার কম হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পেও জলের খরচ যথেষ্ট। অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, হোটেল রেস্তোরাঁতেও প্রচুর জল লাগে। যানবাহন, রেল ইত্যাদি চালাতেও জল লাগে। যেগুলো করোনাকালে ছিল সম্পূর্ণ বন্ধ। জলের সাশ্রয় হয়েছে। তাই ফুরোয়নি। আর তাই নীতি আয়োগের সতর্কবাণী শোনার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমানে ৬০ কোটি, মানে অর্ধেক ভারতীয় চরম জলকষ্টের শিকার। বছরে প্রায় দু’লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে। এই রিপোর্টে আছে, মাথাপিছু দৈনিক জল খরচে কলকাতা প্রথম। একই সঙ্গে জল অপচয় আর ভূগর্ভস্থ জল তুলে ফেলার ক্ষেত্রেও কলকাতা এগিয়ে। সেটাও অবশ্য গড় হিসাব। আমাদের অনেকেই তিন জনের পরিবারে রোজ তিন হাজার লিটার জল খরচ করছি। আর কোনও কোনও বস্তিতে তিন জনের পরিবারের জন্য বরাদ্দ তিরিশ লিটার জল। অথচ দেদার জল অপচয় করেও আমরা অনেকেই বলি, জলসঙ্কট কোথায়? সব বোগাস!
কলকাতাও যে এমন করে ভাবছে সে কথা প্রমাণ ছাড়া আমি বলছি না। সম্প্রতি বাঘাযতীন এলাকায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। একদিন সকালে সেই বাড়ির পিছনের বাগানে ঘুরতে গিয়ে দেখি পড়শির রিজার্ভার থেকে জল উপচে ড্রেন দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। শুনলাম, ওই এলাকায় সব বাড়িতে কর্পোরেশনের জল এসে রিজার্ভারে জমা হয়। তারপরে পাম্পে করে তোলা হয় ওভারহেড ট্যাঙ্কে। ওভারহেড ট্যাঙ্কের জলের ওভার-ফ্লো আটকাতে আছে বেলুন। কিন্তু নীচের রিজার্ভারে তা লাগানোর সিস্টেম নেই। দিনে তিন বার জল আসে আর বাড়তি জল প্রতিবারই অনেকক্ষণ ধরে বেরিয়ে যায়। এমনকি তিন মাস ধরে ফাঁকা থাকা বাড়িতেও। রিজার্ভারে বেলুন লাগানো থাকলে বাস্তবে কিছু সমস্যা তৈরি করে। যেমন আমরা আত্মীয়েরা লাগিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন জল আসেনি। বেলুন থাকায় ওভার-ফ্লো হয় না। এটা তাঁরা জানতেন বলে বুঝতেই পারেননি যে, রিজার্ভারে জল নেই। পাম্প চালিয়ে রাখায় পাম্প পুড়ে যায়। অথচ এক মিনিট ওভার-ফ্লো হলে নষ্ট হয় ৪০০-৬৫০ লিটার জল। তা হলে ঘণ্টায় নষ্ট হচ্ছে ২৪০০০-৩৯০০০ লিটার জল। পুরো পাড়ায় কত জল প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে, ভাবুন। অন্ধ্র ইউনিভার্সিটির রিপোর্ট বলছে, ভূগর্ভস্থ জল বেশি তুলে নেওয়ায় কলকাতার মাটি বসে যাচ্ছে প্রতি বছর ৭-১১ সেন্টিমিটার। বাড়ছে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা।
এর সমাধান করতে হবে কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনকেই। তাদের এমন প্রযুক্তি আনতে হবে যা দিয়ে ভর্তি হয়ে যাওয়ার পরে রিজার্ভারে অটোমেটিক জল ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়। প্রয়োজনে উপভোক্তার কাছ থেকে অর্থ নিতে হবে এর খরচ বাবদ। তা হলে তাঁরাও জল অপচয় করবেন না। কংক্রিটে মোড়া পুরো কলকাতা, ফুটপাতও। নেই মাঠ, পুকুর। বৃষ্টির জল চুঁইয়ে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। হাজার বছর ধরে কলকাতার বুকের মধ্যে যে জল সঞ্চিত হয়েছিল তা নিঃশেষ হয়ে গেলে চেন্নাই হবে কলকাতাও। চারশো টাকা লিটার জল খাব নাকি রান্নার কাজে ব্যবহার করব? টয়লেট আর স্নানের জলের কথা না হয় বাদই দিলাম!

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)