সারথি বিশ্বাস

ফিরে আসার সময় গাড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল। টা-টা দিয়েছিল যতদূর দেখা যায়। ওরা পিউ, সূর্য, অম্বিকা…। নামে আর কী যায় আসে! আসলে তো এই পিউয়ের নীড় নেই, এই সূর্যের আকাশ নেই, এই অম্বিকার মহাভারত নেই। এদের ছিল এক ‘আনন্দমন আশ্রম’, যাকে আমফান এসে তছনছ করে দিয়েছিল, মাথাটুকু তোলার পরে আবার আগুন এসে পুড়িয়ে দিল।
ওদের ‘ভরসা থাকুক’, আমাদের অপাদার উপরে। ‘অসময়ে আমরা আছি’ এই কথাটা বলতেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাকদ্বীপ গিয়েছিলেন অপাদা (অর্পন বন্দ্যোপাধ্যায়)। ফিরে আসার সময় আমার এক টুকরো ভারত আঙুল দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে হাত নেড়েছিল। এ হাত ভারতবর্ষের ভোটারের হাত নয়, এ হাত মানুষের। এরা কোনওদিন যদি ভোটার হয়ে উঠতে পারে, সেদিন, সবসময় না হলেও, অন্তত ভোটের আগে দরকারি সাহায্যটুকু সরকারি ভাবে পেলেও পেতে পারে। সেদিন হয়তো আকাশের কোনও তারা ওদের আশ্রমের অপরিষ্কার মাটিতে নেমে এসে ক্ষণিকের আলো ছড়িয়ে দিলেও দিতে পারে। আজ কিন্তু ওরা ঘোর অমাবস্যায়।
আশ্রমে ১৮টি ছোটপ্রাণে একখানা অন্য ভারতবর্ষ আঁকা আছে। ওরা কেউ বাগানে ঘুমোতো, কেউ রোজ আত্মীয়ের হাতে মার খেত, শিশুকন্যা হওয়ার ‘অপরাধে’ কেউ পড়েছিল রাস্তার ধারে। পিউ আরও শিশুকালে মাত্র ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। এক পুলিশকর্তা উদ্ধার করে ওকে আশ্রমে রেখে যান। পিউয়ের মা না হয় জীবনের অন্ধকার গলিতে পথ হারিয়েছে! কিন্তু অন্ধকারের কোন অতলে নামলে মাতৃত্বও এমন করে ডুবে মরে!
অম্বিকার মহাভারত ‘সারদা’ পুড়িয়ে দিয়েছে। ওর বাবা সেই অর্থলগ্নি সংস্থার এজেন্ট ছিলেন। ‘সারদা কেলেঙ্কারির’র পরে লোকজন ওদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এক এক করে ওর বাবা-মা দু’জনেই আত্মহত্যার পথে মুক্তি খোঁজেন। ছোট্ট অম্বিকা আর তার দাদা পড়ে থাকে তাদের ভারতবর্ষে! সেই ভারতে যে ভারতে ‘সারদা’ বলতে আর মায়ের মুখ ভাসে না, ‘সারদা’র নামে বস্তা বস্তা টাকা ওড়ে! কে জানে সেই টাকার রং কী! আমার ভারতে ক্যাটমানি আছে, র‍্যাটমানি আছে, ব্যাটমানি আছে, লাল হলুদ সাদা কালো না জানি আরও কত রকম মানি আছে। কিন্তু অম্বিকাদের বড় হওয়ার কোনও সংস্থান নেই।
উপরন্তু বিড়ম্বনা অনেক, ক্রাচ নিয়ে অসহায় মুখে বলছিলেন আশ্রমের উদ্যোক্তা দিলীপ করণ। মেয়েদের নিয়ে উনি বেশি চিন্তিত। আশ্রমে চারটি মেয়ে-প্রাণ আছে, ওদের বাড়তি নিরাপত্তা, আলাদা রাখার ব্যবস্থা কী করে করবেন, তাদের ভবিষ্যৎই বা কী হবে, ভেবে কুল-কিনারা পাচ্ছেন না দিলীপ। মেয়েরা বড় হচ্ছে, আর ওঁর দুশ্চিন্তা বাড়ছে। ভবিষ্যৎ কী হবে, ভবিষ্যৎই বলুক। আপাতত, ওরা সকালে আর রাতে দু’বেলা মুড়ি আর দুপুরে চাট্টি ডাল-ভাত খেয়ে বড় হচ্ছে এক নতুন পৃথিবী গড়বে বলে।
আমাদের উপর, মানুষের উপর ওদের ‘ভরসা থাকুক’। আর অর্পিত প্রাণ নিয়ে আপন পথ চলুক আমাদের ‘ভরসা থাকুক’, আমাদের অপাদা। মানুষের কাছে হাত পেতে পেতে সবকিছু আয়োজন করে, পথে নামমাত্র কিছু মুখে দিয়ে, বিনা বিশ্রামে দীর্ঘ পথ পাড়ি অপাদাই এ সব করতে পারেন! রাস্তায় পুলিশের ঝামেলা তো দূর, পথের ক্লান্তিটুকুই সহ্য হবে না আমাদের অনেকের, তা-ও আবার ‘পরের’ জন্য! অপাদা কিন্তু এ পথে পাড়ি দিচ্ছেন হাসিমুখেই। আমফান ঝড়ে, কোভিডের মড়কে, তাঁকে একই রকম নির্ভিক, অক্লান্ত দেখেছি আমরা।  নিন্দুকেরা কিন্তু এর পরেও বলেন, এ সব নাম কামানোর ব্যবসা। সত্যি,  টাকা কামানোর ব্যবসা না করে, ভোট বাগানোর ধান্দা না করে, সকলে যদি এমন নাম কামানোর ব্যবসাই করতে পারতেন, পৃথিবীটা তাহলে অন্য রকম হয়ে যেত কবেই!
আমরা হয়তো সবাই এ হিসেব বুঝব না, আমাদের নব গণিত মুকুল হয়তো এ হিসেব শেখাতে পারেনি। কিন্তু   জানেন তো, কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা একটু ‘সৃষ্টির বাইরে’, সৃষ্টিছাড়া বললেও বোধহয় ভুল হবে না। জীবনের হিসেব-নিকেশ তাঁদের ঠিক অঙ্কের নিয়মে মেলে না। তাঁদের জীবনের সব হিসাব দুই-এ দুই-এ চার-এর হিসেবে আসে না। আকাশে মেঘ করলে ‘মানুষ’ যখন দরজা-জানলা বন্ধ করতে ব্যস্ত থাকে, এঁরা তখন বাইরে গিয়ে দাঁড়ান। মেঘ ধরতে আকাশ পানে ছোটেন। আমাদের অপাদাও ঠিক তাই। আজীবন নামতা মুখস্থ করে বড় হওয়া আমজনতার অনেকেরই সাধ্য নেই এ হিসেব মেলানোর!
সূর্যনগর আনন্দমন আশ্রম কোনও সরকারি সাহায্য পায় না। মানুষের দানেই ওদের দিনগুজরান। দিন তো আমাদেরও শেষ হতে চলেছে, পথ আর কতই বা বাকি! লুকোনোর কোনও জায়গা তো নেই-ই, কিছু নিয়ে যাওয়ার উপায়ও এক্কেবারেই নেই। আমাদের তো অনেকেরই অনেক কিছু আছে, ফেলে রেখেই যেতে হবে সব! আসুন না আমরা হাত বাড়িয়ে দিই একটুখানি। রবীন্দ্রনাথও তাঁর মিনির বিয়েতে গড়ের বাদ্য বাদ দিয়ে, আলোকসজ্জা একটু কমিয়ে, কাবুলিওয়ালাকে সেই অর্থ দিয়েছিলেন যাতে তিনি আপনজনের কাছে ফিরতে পারেন।
আর আজ, চলুন, যাদের ফেরার মতো কোনও বাড়ি নেই, যাদের জন্য অপেক্ষা করার কোনও আপন নেই, সেই সব পিউ, সূর্য, অম্বিকাদের অন্ধকার থেকে তুলে আনি আমরা। এই সব নতুন নক্ষত্রদের কেন ব্ল্যাকহোলে হারিয়ে যেতে দেব আমরা! আসুন না হাতটা একটু ধরি। এর জন্য আপনি কিছু বাদ না হয় না-ই দিলেন , আপনার ‘মিনি’র জন্য সব গুছিয়ে রেখে উদ্বৃত্তটুকুই দেবেন। সেটাই অনেক। শুধু একটু ভালোবেসে দেখুন, দেওয়ার মতো আপনারও অনেক কিছু আছে। দিলে, পুণ্য হবে কিনা জানি না, স্বর্গের টিকিট মিলবে কিনা বলতে পারব না, বৈকুণ্ঠের চাবি পাবেন কিনা তা-ও জানা নেই,  তবে নিশ্চিত, আনন্দ পাবেন অফুরান। একবার হাতটা বাড়িয়েই দেখুন, তখন আপনিও বলবেন, ‘ভরসা থাকুক’।