অভিজিৎ রায়

বাঙালি ভোটে নাচছে আর বলছে, ‘মিঠুনদা নাচুন না!’ মিঠুনদা অবশ্য গোখরোর গর্তে ঢুকে ছোবল দেওয়া প্র্যাকটিস করছেন। আর প্রকৃত কালগোখরোরা ইতিমধ্যেই প্রতিদিন ছোবল বসাচ্ছেন ভারতীয় গণতন্ত্রের উপর। দিল্লির নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা হ্রাস করা বা বিহারের গ্রেফতারের আইন পরিবর্তন তারই ইঙ্গিত। বাংলার ভোট নিয়ে বিজেপি এত লাফালাফি করছে কেন? কারণ, ক্রমশ উত্তর ভারত ও উত্তর পশ্চিম ভারতে দলের মুঠো আলগা হতে শুরু করেছে। রাজ্যসভার ঘাটতি মেটাতে পাঁচ রাজ্যের এই সাম্প্রতিক নির্বাচন জেতা খুবই উল্লেখযোগ্য বিষয়। এতে দলের মনোবল যেমন বাড়বে তেমনই পূরণ হবে রাজ্যসভার ঘাটতি। যদিও বিজেপি সরকার এই ঘাটতিকে প্রাধান্য না দিয়েই অতি অপ্রয়োজনীয় এবং জনবিরোধী বেশ কিছু আইন ইতিমধ্যেই পাশ করিয়েছে গণতন্ত্রকে উপেক্ষা করে। এর ফলে ভারতের সংবিধান ক্রমশ বিপদের মুখে পড়ছে। যে ভাবে সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলোকে খর্ব করা হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের সংবিধান বিপদের মুখে পড়তে বাধ্য। হয়ত এই সরকার আমাদের গর্বের গণতন্ত্রকে হত্যা করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ভক্তদের অবশ্য এতে কিছুই যাবে আসবে না। তাঁরা থালা বাজাবেন, টর্চ জ্বালাবেন এবং তালি দেবেন। আর্থিক বিকাশ দূরে থাক, ভারতের অর্থনীতির ভিত গত বছর সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে পড়েছে। ভুল তথ্য প্রচার করে মিডিয়া ভক্তগণের মনোবল এমন বাড়িয়ে রাখছে যে ধর্মের আফিমে ডুবে থাকা মানুষ বুঝতেও পারছেন না যে তিনি প্রতিদিন একবার করে আত্মহত্যা করছেন সপরিবারে। গণতন্ত্রে প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা ভীষণ ভাবে যেমন বেড়েছে, তেমন ভাবেই বেড়েছে আপনার ব্যাঙ্কে জমানো টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার ভয়।
তাতে অবশ্য আমজনতার অনেকেরই কিছু যায় আসে না। সেই অনেকে করোনার ভয়ে বাড়িতে ঢুকে বসে থাকবেন আর আপনাদের পাড়ার অজস্র ছেলে লকডাউনে আবার কাজ হারাবে! সেই অনেকে ১৬০ টাকায় ফরচুন সরষের তেল কিনে খেয়েও নিজেদের ফরচুন কিছুতেই তেলতেলে মসৃণ করে উঠতে পারবেন না। এতেও আপনদের অবশ্য কিস্যু যাবে আসবে না। আপনারা তো মেতে আছেন এনআরসি হলে মুসলিম ভাইদের দেশ ছাড়া করার আনন্দে! অথচ আপনাদের কাছে খবর নেই কত লক্ষ হিন্দু অসমে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢুকেছেন বা ঢোকার অপেক্ষায় আছেন! ব্যাঙ্কের সুদের হার কমতে কমতে শূন্যের দিকে এগোচ্ছে যা কিনা উন্নত অর্থনীতির ইঙ্গিত অথচ আমাদের দেশের জিডিপি দৌড়চ্ছে মাইনাসে। এ সব খবরে আপনাদের কিছুই যাবে আসবে না জানি কারণ আপনাদের মতো সাহসী, অকুতোভয়, দেশপ্রেমী বাঙালি এখন জাত গোখরোর ছোবল খেয়ে ছবি হওয়ার অপেক্ষায় ক্যালেন্ডারে ২ মে-র দিকে তাকিয়ে আঙুল চুষতে ব্যস্ত আছেন।
আব্বাসের সঙ্গে জোটের সমালোচনা করায় বামপন্থীদের অনেকেই বেজায় চটেছিলেন। তাঁরা এ বারেও খুব লাফালাফি করবেন! করুন। কিন্তু অন্যদের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের ভুলগুলো নিজেরাও আলোচনা করুন, প্রশ্ন তুলুন। গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ প্রশ্ন তোলা এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। এটা ভুলে গেলে আমরা বারবার স্বৈরাচারী শাসকের হাতের পুতুল হয়েই থাকব। আমি অন্তত এই ভোটে সেরকম কিচ্ছু চাই না। তৃণমূলের সমালোচনা করলাম না বলে যাঁরা গালাগাল দেবেন বলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের বলি নীতিগত দিক থেকে তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে কোথাও পার্থক্য নেই। অর্থবল এবং সাংগঠনিক ভাবে বিজেপি একটু বেশি শক্তিশালী। দল নয় মানুষ আর তাদের স্বার্থে এগিয়ে থাকুক এই জনগণ; ‘জয় শ্রীরাম নয়, নয় জয় বাংলা; স্লোগান হোক— জয় গণতন্ত্র, জয় ভারতের সংবিধান।’’
বামপক্ষের তরুণ শিক্ষিত প্রার্থীরা আমাদের মতো কলমচিকে কিছুটা ভরসা জোগালেও এ কথা খুব সত্যি যে, ভারতবর্ষের ভোট কোনও প্রকৃত গণতন্ত্রের নিদর্শন নয়। চায়ের কাপে তর্ক উঠলেই নিন্দুকেরা খুব সহজেই অতীতে বাম প্রার্থীর নিরানব্বই শতাংশ ভোট প্রাপ্তির গল্পের ডালি খুলে বসেন। আর এখনকার তরুণ কিশোর বাম সমর্থকদের টুম্পা সোনা আর আব্বাসের সহজ সমীকরণে বিধানসভা সরগরম করার দিবাস্বপ্ন দেখলে বিস্মিত হতে হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুললে তৃণমূল বা বিজেপির কোন নেতা কবে কোন ইমামের সঙ্গে ছবি তুলেছেন তার ফিরিস্তি দেওয়া দেখে হাসতেই হয়। ‘সততার প্রতীক’, ‘বাংলার গর্ব’-এর মতো আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের লাইনগুলোর মতো হাস্যকর হয়ে ওঠে ব্রিগেড মঞ্চের পিছনে লেখা ‘আমরাই ধর্মনিরপেক্ষ’। বামপক্ষও কোনওদিন ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না। থাকলে বুদ্ধবাবু তসলিমাকে বাংলা ছেড়ে যেতে বলতেন না বা তসলিমার মুণ্ডচ্ছেদের নিদান দেওয়া ইমামের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতেন। পারেননি, কারণ ভোটব্যাঙ্কের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক সমানুপাতিক। এখন এই লড়াই যে কারণে অনেকবেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩০% মুসলিম তোষণের ক্ষোভ ৬৭% হিন্দু ভোট স্বাধীনতার ৭৫ বছর ধরে বয়ে বেড়ানোর সুযোগে বিজেপির ধর্মের আফিমে ক্ষমতা দখলের লড়াই অনেক মসৃণ হতে দেখা যাচ্ছে। গোয়েবেলসের মিডিয়া হাত ধুয়ে নেমে পড়েছে মোদীর বাংলা দখল প্রকল্পে। যেখানে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে প্রতিশ্রুতির খেলা চলছে। খেলা হবে নয়, খেলা হচ্ছে। হচ্ছে ভোটের আগে থেকেই।
আরও একটা খেলা হচ্ছে আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে। উন্নয়ন আর বিকাশের মুখোশ পরে প্রতিদিন দেশের গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে একটু একটু করে আঘাত করা হচ্ছে। ভাবা যায়? সংবিধানকে চ্যালেঞ্জ করে এক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষতা এখন বিশ্বের দরবারে ভারতের উন্নয়নের পথের কাঁটা। গোলাম হয়ে থাকা মিডিয়া সেই খবর ছাপছে কিন্তু পাল্টা প্রশ্ন করছে না। একটু একটু করে মানুষকে অভ্যেস করাচ্ছে, বোঝাচ্ছে যে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা খারাপ। এ সবের জন্যই প্রকৃত বিকাশ আটকে আছে। আমার, আপনার ছেলে চাকরি পাচ্ছে না। ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? এখনও পর্যন্ত অনেকেই জানি যে এটা সত্যি নয়। দেশের কিছু হাতেগোনা পুঁজিপতিদের হয়ে কাজ করছে নির্বাচিত সরকার। এদের উদ্দেশ্য এখন সাধারণ মানুষকে এমন বিপদের মুখে ঠেলে দাও যাতে তারা বেঁচে থাকাটাকেই তাদের সৌভাগ্য বলে মনে করে। বাকি পড়ে থাকা কোনও ব্যাপারে উৎসাহ বা প্রতিবাদ দেখানোর ফুরসত যাতে না পায়। আমি বা আপনি যে কতটা খারাপ আছি প্রচারের আলোয় তা ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। দশচক্রে ভগবান ভূত। আমরা যে ইতিমধ্যেই গণতন্ত্রের লাশ কাঁধে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছি তা ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত দেশপ্রেমের জিগিরে। অথচ দ্বেশপ্রেম কী অদ্ভুত ভাবে মাথা তুলছে গ্রাম, গঞ্জ থেকে শহরে। আমাদেরকে আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী স্বার্থপর করে তোলা হচ্ছে আর সামনে গাজর ঝুলিয়ে খুড়োর কলের নির্বাচন আমাদেরই ট্যাক্সের টাকা তছরুপের পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারপরে? এই ধারণা থেকে, এই বিরক্তি থেকে হয়ত স্বৈরাচারী শাসক তার কেনা মিডিয়ার মাধ্যমে দেশের মানুষকে সরকারের টাকা বাঁচানোর গল্প শোনাবেন আর প্রস্তাব দেবেন নির্বাচন তুলে দেওয়ার। বিকাশের নামে দেশ বেচার প্রক্রিয়ায় যখন তেমন কোনও বাধা আসছে না তখন সরকারের সাহস যে দিনে দিনে বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। এখন এই কথাগুলোকে কষ্টকল্প বাহুল্যতা মনে হলেও পশ্চিমবঙ্গ-সহ বাকি চার রাজ্যের নির্বাচন এই কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে বিজেপির কাছে। সমস্ত জনবিরোধী কাজের পরেও কী ভাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে রাখা যায় বিজেপিকে তার দায়িত্ব খুব ভাল করে পালন করছে গোদি মিডিয়া। আর আমরা আশা রাখছি শিক্ষিত, তরুণ বাম ব্রিগেড হাল ফেরাবে শিল্পের? নির্বাচন ব্যবস্থার? সম্ভব নয়। যতদিন না সাধারণ মানুষ এই ষড়যন্ত্রের কথা বুঝে নিজেরা পথে না নামছেন প্রতিবাদী মশাল নিয়ে ততদিন এই প্রচারসর্বস্ব স্বৈরতান্ত্রিক শোষণের হাত থেকে আমাদের রক্ষা নেই কারও। আমরা শুধু আমাদের সবার শুভবুদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে পারি।  যদিও কালচক্র তার নিজের গতিতেই ইতিহাসের আবর্তন পূর্ণ করতে ভারতবর্ষকে বেছে নিয়েছে এ খুব আতঙ্কের খবর। গণতন্ত্রের একশো বছর পূর্ণ করার আগেই কি আমরা স্বৈরাচারী শাসনের স্বাদ পুরোদমে ভোগ করব কি না তার জন্য আর কিছুদিন অপেক্ষা করে শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া এই নির্বাচনে আর কিছুই আমাদের করার আছে কি? উন্নয়নে আর বিকাশের খেলা কী হবে তা না জেনেও বলতে পারি যে গণতন্ত্র আর সংবিধান ইতিমধ্যেই আঘাত পেয়ে মাঠের বাইরে। আমরা কি দর্শক হবো নাকি রেফারি তা ঠিক করার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া। মতামত লেখকের নিজস্ব)