দেবকুমার সোম

প্রতিবার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়। নির্বাচন প্রাক–মরসুমে তাদের কাছে এমন বিড়ম্বনা নতুন কোনও উৎপাত নয়। গণতন্ত্রের এই মহোৎসবে অতি উৎসাহিত ছোট–বড়ো রাজনৈতিক নেতাদের নিজস্ব স্বপ্নপূরণের পয়লা নম্বর ধাপ হল প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হওয়া। ফলে তাঁরা যদি দল কর্তৃক প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত না হন, তবে তা ব্যক্তিগত হতাশার কারণ হয় বইকি। কিন্তু এ বারে বিজেপির প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে রাজ্য জুড়ে যে হাঙ্গামা আর বিক্ষোভ শুরু হয়েছে তার নজির সাম্প্রতিক কালে পশ্চিম বাংলায় ঘটেনি। কারণ এ বারের নির্বাচনের মূল ফ্যাক্টর ‘দলবদলু’দের সঠিক ব্যবহার। গত কয়েকটা নির্বাচনে আমরা দেখেছি, এ রাজ্যে সব ক’টা আসনে একক দক্ষতায় সর্বমান্য প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা কোনও পক্ষেরই নেই। ফলে গত নির্বাচন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে হচ্ছে, তিনিই ২৯৪টি আসনের প্রার্থী। মানুষ যেন তাঁকেই প্রার্থী ভেবে তাঁর দলকে ভোট দেন।
গত কয়েক দশক ধরে তৃণমূল চুপিচুপি বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিক্ষুব্ধদের দলে টেনে নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছে। বিজেপি সেই কাজটা করছে অনেক বড়ো মাপে। অর্থাৎ তৃণমূল যদি ছিপ ফেলে বিক্ষুব্ধদের দলে টেনে থাকে, বিজেপি সেটাই করছে জাল ফেলে। কারণ, তৃণমূলের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে লড়তে তারা এখনও সাংগঠনিকভাবে সক্ষম নয়। ফলে, তাদের জালে যেমন রুই–কাতলা ধরা দিয়েছে, তেমন চুনোপুঁটিও প্রচুর ঢুকে গিয়েছে। বিজেপি-র কাছে বাছ–বিচারের মতো না আছে হাতে সময়, না আছে ভরসা করার মতো যোগ্য কোনও নেতৃত্ব। গোল পেকেছে সেখানেই।
নির্বাচনের আগে দলের জার্সি পাল্টানোর নজির পশ্চিম বাংলায় অতীতেও আমরা দেখেছি। কিন্তু এ বারের মতো তা এত ব্যাপক আর সর্বাত্মক ছিল না। গত দশ বছর ধরে এ রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূলও মূলত দলবদলুদের নিয়েই গঠিত (তখন অবশ্য ‘দলবদলু’ না বলে ‘বিক্ষুব্ধ’ শব্দটার চল বেশি ছিল)। তবে সেখানে প্রধান বিরোধী মুখ হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বমান্যতা ছিল। গত দশ বছর সরকারে থাকার কারণে তৃণমূল যেমন আড়ে–বহরে বেড়েছে, তেমন অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে–ফেঁপেও উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝেছেন এমন অস্বাভাবিকতা তাঁর একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বহুদলীয় গণতন্ত্রের মধ্যেও যে বিষধর একনায়কতন্ত্র লুকিয়ে থাকে তার সাক্ষাৎ নমুনা ভারতবাসী গত সাত দশকে বিভিন্ন সময়ে দেখেছে। কেন্দ্রীয়স্তরে একনায়কতন্ত্র টিকিয়ে রাখার চলতি পদ্ধতি হল আইন ব্যবস্থা, সেনা ব্যবস্থা, অর্থনীতি ইত্যাদিকে কুক্ষিগত করা। রাজ্য বা প্রান্তিকস্তরে ক্ষমতার একচ্ছত্র ভোগের তেমন কোনও চালু রুট নেই। ফলে অধুনা ইউরোপ বা আমেরিকার মতো কর্পোরেট কোন সংস্থাকে ভাড়া করার রেওয়াজ শুরু হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তেমন সফল এক কর্পোরেট সংস্থাকে ভাড়া করেছেন।
বাজার অর্থনীতিতে অন্য প্রতিযোগীদের হটিয়ে একচেটিয়া মুনাফা লাভের কিছু চালু কৌশল আছে, যা বিভিন্ন কর্পোরেট স্ট্যাট্রেজির অঙ্গ। পশ্চিম বাংলার মতো পিছিয়ে থাকা এক রাজ্যের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে সেই কর্পোরেট কালচারকে আত্মস্থ করা বেশ মুশকিলের। কারণ কর্পোরেট ব্যবস্থায় মুনাফার ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রধান শেয়ার হোল্ডারদের হাতে। এখন তৃণমূলের মুনাফার ভাগ–বাঁটোয়ারা স্থানীয়ভাবে সফল রাজনৈতিক নেতাদের হাতে বিশেষ নেই। ফলে দলবদল ছাড়া তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত সঙ্কটময় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকছে।
বর্তমান বিজেপি-র রাজ্য নেতৃত্ব মিডিয়ায় বাইট দেওয়ায় যতটা দড়, স্থানীয় স্তরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ততটা পোক্ত নন। এর অন্যতম কারণ তাঁদের দলের মূল নীতিগুলো এই রাজ্যের পক্ষে খুব লাগসই নয়, বরং এমন বহু নীতির প্রণেতা তাঁদের দল যার সঙ্গে সাবেক বাঙালিয়ানা মিশ খায় না। অসমের মতো রাজ্যে বিভিন্ন ধর্ম আর জাতপাত নিয়ে যে রাজনীতিটা করা সম্ভব, পশ্চিম বাংলায় তা সম্ভব নয়। কারণ এখানে মেধা আর অর্থনীতির দাদাগিরি চলে শহরকে কেন্দ্র করে। আরও সঠিক ভাবে বললে বলতে হয় কলকাতাকে কেন্দ্র করে। এ রাজ্যের কলকাতামুখী হওয়ার প্রবণতা পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই চালু হয়। আজও তা থেকে আমরা বের হতে পারিনি। ফলে কলকাতার দলীয় কার্যালয়ে বসে সাংবাদিক সম্মেলনের সফলতা দিয়ে নেতার মাপকাঠি তৈরি হতে পারে না।
বিজেপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেই সার সত্য বুঝেছেন সেটা অনুমান করা যায়। ফলে তাঁদের দলবদলুদের উপর নির্ভর করতেই হবে। আর দলবদলুদের মধ্যে যারা রুই কিংবা কাতলা তাঁদের জনভিত্তি অনেকটাই জেলাকেন্দ্রিক। ফলে জেলায় ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপিকে এ বার অন্তত দলবদলুদের উপরে ভরসা রাখতেই হচ্ছে। বিজেপি দলটার কার্যক্রম নিয়ে আমবাঙালির তেমন কোনও হেলদোল নেই। থাকার কথাও নয়। গো বলয়ের রাজনীতি থেকে অনেকটা দূরে আমবাঙালির বেঁচে–বর্তে থাকা। গত দশ বছর তৃণমূল পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি করেছে। কারণ দলটার উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে বামফ্রন্ট বিরোধিতার মধ্যে দিয়ে। কোনও রাজনৈতিক দিশা এই দলের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এখন সমস্যা হল যেখানে অর্থনৈতিক কোনও উন্নয়ন নেই, সামাজিক বা রাজনৈতিক কোনও দিশা নেই, সেখানে ক্ষমতার মধু ক’জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া সম্ভব? রানি মৌমাছির নিয়ন্ত্রণাধীন মৌচাক ভাঙে ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্বে। তৃণমূলের ভাঙন অনেকটা তেমনই।
বিজেপি-র স্থানীয় স্তরের যাঁরা নেতা তাঁরা স্থানীয় রাজনীতিতে বিজেপি-র মুখ। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বহু কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে দলকে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। আর আজ যখন অমিত শাহ তাঁদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন দু’শো আসনের, তখন সেখানে যদি তাঁরা বাদ পড়ে যান, তবে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বলে আর কিছু থাকে না। সমস্যাটা তাই স্থানীয়ভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিজেপি-র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গত লোকসভার ফলাফলের নিরিখে যে আগাম সাফল্যের স্বপ্ন দেখছেন, তার যথার্থতাকে বাস্তবায়িত করতে হলে তাঁদেরকে দলবদলুদের উপরেই ভরসা করতে হবে। স্থানীয় পার্টি কর্মীদের মধ্যে থেকে জনপ্রতিনিধির মুখ যদি খুঁজতে হয়, তবে হয়তো বহু ক্ষেত্রে তাঁরা প্রার্থী দিতে পারবেন না। রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে সুযোগ আছে, মোদীজির তা নেই। কেন্দ্রীয় ভাবে বিজেপির সমস্যা সেটাই। এই দুই সমস্যার ঠোকাঠুকির ফলে ভোটের আগেই বিজেপি তৃণমূলের কাছে গোল খেয়ে গিয়েছে। ‘খেলা’ শুরুর মুখে এক গোলে পিছিয়ে থেকে বিজেপি-র চাপ তাই বেড়ে গেল।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া। মতামত লেখকের নিজস্ব)