অঙ্কন রায়

চূর্ণি চার তলার জানলা দিয়ে বাইরের আকাশ যতটা দেখা যায়, তার মধ্যেই চোখ চেয়ে আজ আবার মেঘালিকে খুঁজছিল।
সেই যে জষ্ঠি মাসে ছাদে গিয়ে ওই দেড়দিনের কচি মিষ্টি মেঘের ছানাটার সঙ্গে সই পাতানো হল, তখনই সে ওর নাম দিয়েছিল ‘মেঘালি।’  কী মজাই না হয়েছিল সেদিন!  মেঘালি ওর গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ছিল। চূর্ণিও ওকে প্রায় জড়িয়ে ধরে সামাল দিচ্ছিল। তখন সন্ধে হয়ে আসছিল। মেঘালির ফিরে যাবার সময় হয়ে যাচ্ছিল বলে সে চূর্ণিকে কথা দিয়ে গেল পরদিনই আসবে।
চূর্ণি নতুন বন্ধু পেয়ে সেদিন কতই না খুশি। কত্তো আনন্দ। সে  ‘ওরে ওরে ওরে আমার মন মেতেছে… তারে আজ থামায় কে রে…. সে যে আকাশ পানে হাত পেতেছে, তারে আজ নামায় কে রে…’ গাইতে গাইতে সিঁড়ি দিয়ে ছুট্টে নীচে নেমে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে সব কথা বলেছিল। মাও খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, ‘এই তো  বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে না, স্কুলের জন্য মনখারাপ করে বলে কাঁদছিলিস। প্রকৃতি কেমন তোর জন্য নতুন বন্ধু পাঠিয়ে দিল।’
সেই দিন থেকেই মেঘালির জন্য চূর্ণির অপেক্ষা। না, পরদিন এল না মেঘালি। তারপরদিনও না। আজ অবধি না। সেই জষ্ঠি পেরুলো… আষাঢ় পেরুলো… এখন ভরা শ্রাবণ। পৃথিবীর নিয়ম নীতি সেই যে কবে থেকে পালটে বসে আছে, এখনও অবধি আর আগের মতো হল না। ইস্কুলের মুখ দেখেনি চূর্ণি আজ কতমাস যে হয়ে গেল। ওর বন্ধুদেরও একই অবস্থা। মাস্টারমশাই, দিদিমনিদেরও অবস্থা আলাদা কিছু নয়। সবাই ঘরে বন্ধ হয়ে আছে মাসের পর মাস। চূর্ণি শুনেছে ইদানিং অনেক দোকানপাট, অফিস, কিছু কিছু হোটেল বা খাবারের স্টল খুলেছে। মানুষজন বাইরে বেরোচ্ছেও। কিন্তু ও ছোট্ট বলে বাবা মা ওকে নিয়ে কোত্থাও বেরোন না। বলেন বাইরে অজানা অসুখের বিপদ এখনও কাটেনি, বরং আগের চেয়েও বেড়েছে। তাই তুমি বায়না কোরো না বন্ধুদের বাড়ি যাবার। দেখো, তোমাদের স্কুল কেন বন্ধ এতদিন? সব ঠিক হয়ে গেলে তো খুলেই যেত। তাই না? ‘
চূর্ণি বুঝতে পারে সব। কিন্তু মনখারাপ কি আর তাতে যায়? অনলাইনের ক্লাস, গল্প আর কতদিন ভাল লাগে? যাইহোক করে সেই জষ্ঠি মাসে পেল এক নতুন বন্ধুকে, সেও আর দ্বিতীয়বার ঘুরে এল না। কত ডেকেছে চূর্ণি আকাশের দিকে তাকিয়ে ‘মেঘালিইইইই…’। তা সে শুনলে তো! হয়তো বা অত্তো বড় আকাশটায় ভেসে বেড়াতে বেড়াতে চূর্ণির বাড়ির পথটাই ভুলে গেছে। পুরোপুরি দোষই বা ও দেয় কী করে মেঘালিকে। তাই চূর্ণির মনখারাপ আর যায় না। কিছুতেই যায়  না।
ক্রমশ অন্ধকার নেমে আসছে বাইরে। আকাশপাড়া একটু একটু করে কালো মেঘের চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। চূর্ণি ওদিকে চেয়ে রোজকার মতো আজও মেঘালিকে ডাকছিল। আজকের দিনটা একটু অন্যরকম হবে বলেই বোধহয় অপেক্ষায় ছিল। তাই হঠাৎ করে চূর্ণির জানলার এক্কেবারে কাছটায় আচমকা ঘিরে এল জমাট কালো একখন্ড সজল মেঘ। মেঘের ভিতর থেকে আওয়াজ এল, ‘এই তো চূর্ণি। তোমায় আজ দেখতে পেয়েছি। তোমার ডাক ঠিক আজ আমার কানে গেছে। ভাগ্যিস ডেকেছিলে। নয়তো আমি বুঝতুমই না তুমি কোথায় আছো?’
চূর্ণি অবাক বিষ্ময়ে সজল মেঘের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কে? তোমায় তো চিনি না! আমি আমার বন্ধু মেঘালিকে ডাকছিলাম।’
সজল মেঘ বলল, ‘আমিই তো মেঘালি গো। সেই যে জষ্ঠি মাসে তোমার সঙ্গে সই পাতালাম। তারপর তো পরদিন আমি রাস্তা ভুলে গিয়েছিলাম তোমার বাড়ির ছাদের। আসলে আমার বাবা মা আমায় নিয়ে এত দূরে দূরে বেড়াতে চলে যেতেন যে আমি ফিরে আসার রাস্তাটাই গুলিয়ে ফেলতাম। তারপর যখন ঘোর বর্ষাকাল এসে গেল আষাঢ়ে, তখন তো অহরহ শুধু বৃষ্টি। হাজারো লাখো মেঘের আনাগোনা। তবু তারই মাঝে একে তাকে পাশ কাটিয়ে, ডিঙিয়ে একদিন তোমার ছাদ খুঁজে পেয়েছিলাম। সেদিন তুমি ছাদে আসোনি।’
চূর্ণি সবটা শুনে বলল, ‘কি করে আর যাব বল। ওই ঘোর বৃষ্টিতে তো মা আমায় ছাদে আর যেতেই দেন না আগের মতো। বলেন ঠান্ডা লেগে যাবে বৃষ্টিতে ভিজলে। আর এই সময়টা আমাদের মানের মানুষ জাতির জন্য খুবই খারাপ সময়।  এখন ঠান্ডা লাগানো আমাদের কোনওমতেই যাবে না। তা তুমি যদি মেঘালি হও, তোমায় এরকম দেখতে হয়ে গেল কি করে? তুমি তো ছিলে ছোট্ট মতন, মিষ্টি মতন আমার সই। এখন তো কত্তো বড়, কেমন রাশভারি দেখাচ্ছে তোমায়।’
ওর কথায় সজল মেঘ গুম গুম করে হেসে উঠে বলল, ‘আমি বুঝি বড় হব না? একরকমই থাকব? দেখো তোমার সঙ্গে সেবার দেখা হবার পর আজ প্রায় দু’মাস কেটে গেছে। এখন তো আমি মেঘেদের মধ্যে বৃদ্ধ। এতদিন ধরে নিজের শরীরে জল জমাতে জমাতে এমন ভারি হয়ে গেছি। এবার জলগুলোকে তোমাদের পৃথিবীতে ঢেলে দিতে পারলেই আমার ছুটি। আমার আয়ু তখনি শেষ হয়ে যাবে গো।’
এ কথা শুনে চূর্ণির কেমন কান্না পেল। জল ঝরিয়ে দিয়েই মেঘালি শেষ হয়ে যাবে? কি অলক্ষুণে কথা। ‘না না, তোমায় এখনি জল ঝরাতে হবে না। তুমি আমার বন্ধু তো। তুমি শেষ হয়ে গেলে আমার সঙ্গে আর কে খেলবে?’ — চূর্ণির গুমরে ওঠা গলার ভিতর থেকে কান্না ঠেলে বেরোনো কথার উত্তরে মেঘালি বলল, ‘অত চিন্তা কোরো না বন্ধু। আমাদের আয়ু শুধু এই বর্ষাকালটুকুই হয়। কিচ্ছুটি করার নেই। তাই আমরা মেঘেরা তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাই। তোমরা দেখি কত্তোদিন ধরে একই রকম থেকে যাও। ওই তো, সে দিন তোমায় যেমন দেখেছিলাম, আজও সেরকমই আছ। ছোট্ট, মিষ্টি বন্ধু আমার। চিন্তা কোরো না গো আমার জন্য। চলো তোমায় পিঠে চাপিয়ে বাইরের আকাশে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসি। পৃথিবীটা কেমন সবুজে ভরে আছে, তুমি নিজের চোখে দেখ। তারপর তোমায় বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আমি জল হয়ে ঝরে যাব তোমার জানলার পাশটিতেই। তুমি তোমার বুকের ভিতর তোমার এই অল্পদিনের বন্ধুকে চিরদিনের জন্য আগলে রেখে দিয়ো।’
তারপর….
আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা,
চূর্ণি চলে সজল মেঘের ভেলায়…
পৃথ্বী ‘পরে জল জঙ্গল পাহাড়
আপ্লুত হয় আজকে সাঁঝের বেলায়।
মেঘালি তার নরম মনের সাথে
চূর্ণিকে আজ বাঁধল আদর দিয়ে।
বুকের মাঝে আগলে রাখা জল
সিক্ত করে চূর্ণিরানির হিয়ে।…..
‘ওকি! জানলার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে গেছিস এই ভর সন্ধেবেলায়? কি যে করিস তুই চূর্ণি! শিগগির উঠে আয়। ইস্। বৃষ্টির ছাঁট তোর মাথা, গা সব ভিজিয়ে দিচ্ছে আর তোর হুঁশ নেই? ধন্যি মেয়ে বাবা।’
মায়ের ঝংকারে চমকে উঠে চূর্ণি দেখল তার মাথার চুল, মুখ, গলা সব সপসপে ভিজে। মেঘালি তার জল ঝরিয়ে কখন যেন ওর বুকের ভিতর ঢুকে গেছে!

 (অঙ্কন: অর্কজ্যোতি প্রামাণিক)