গৌরব বিশ্বাস

মাথার ভেতর মেঘ করতেই বৃষ্টি নামল ঝেঁপে। ধানই নেই তো মাপব কী দিয়ে! ঠিক তখই রেডিয়ো বলতে শুরু করল— ‘আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, আগামীকালও আকাশ মেঘলা থাকবে। বিকেলের পরে ঝড়-বৃষ্টির …।’
শহুরে ব্যালকনিও কখনও কখনও ফসল উঠে যাওয়া ন্যাড়া মাঠ হয়ে যায়। পকেটে টাকা নেই জেনেও মানিপ্ল্যান্ট ছুঁয়ে ফেলে মাথা। পাশের টবে রাখা তুলসীগাছ জানতে চায়, ‘আর ক’দিন পরেই বৈশাখ রে! সারাটা মাস জুড়ে সন্ধ্যার পরে হরিনামের দল বেরোবে। আসবি নাকি?’
একটু দূরে দাঁড়িয়ে বেদম রাগিয়ে দেওয়া হাসি হাসছে প্রভাত জ্যাঠা। সেই একই ভাবে হাসতে হাসতে বলছে, ‘ক্যাবলা গাইবে হরিনাম! তা হলেই হয়েছে। ও তো পরের লাইনটা পর্যন্ত মনে রাখতে পারে না!’
সঙ্গে সঙ্গে পক্ষ নিল বোনা জ্যাঠা, ‘শোন প্রভাত, ও পারবে। দেখবি, এক দিন ও প্রম্প্ট ছাড়াই মাত করে দেবে।’ বোনা জ্যাঠার মায়াভর্তি চোখ ছলছল করছে, ‘বাপ রে, আমার মানটা রাখিস কিন্তু।’
সবাই বলত, মাধু পিসির নাকি মাথাখারাপ! আমার কখনও বিশ্বাস হয়নি। এখনও হয় না। না হলে যত্ন করে এক বাটি মুড়ি মেখে দেওয়ার পরে কেউ ও ভাবে বলতে পারে, ‘ল্যাখাপড়াটা করিস বাবা!’
কত বার মাকে বলেছি, চৈত্র সংক্রান্তিতে আমি এক বার সন্ন্যাসী হতে চাই! মা বলেছে, ‘তুই বড় দুবলা! এখন কি দিনভর উপোস থাকতে পারবি? আর একটু বড় হ।’ মায়ের কথা শুনে হাসত আমার শেখপাড়ার বন্ধুরা।
আমার বড় হওয়া আর হল না। শুধু চৈত্রের শেষে কংক্রিটের রাস্তায় আমি এখনও বেতের লাঠি হাতে ঘুরি। পরনে রক্তবর্ণ পোশাক। জবাফুলের মতো চোখ। চারপাশে ম ম করে তামাকের গন্ধ।
আজ চৈত্র সংক্রান্তি। সকাল থেকেই মণ্ডপে বিরাট তোড়জোড়। ক’দিন ধরেই বোলান হয়েছে। আজ সঙ হবে। আর হবে বাঘবন্দি খেলা। বোনা জ্যাঠা বাঘ। প্রভাত জ্যাঠা শিকারি। আসরে নামার আগে বাঘ-শিকারি দু’জনেই বিড়ি ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে দু’জনেই পেন্নাম ঠুকে ঢুকে পড়ল মণ্ডপের উঠোনে।
মণ্ডপের চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে থিকথিকে ভিড়। যে ভিড়ের কোনও জাত নেই, ধর্ম নেই। শুধু আছে পার্বণ, পরব। সেই ভিড়ের মধ্যেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বসে থাকে মাধুপিসিও। পাঁচু জ্যাঠার দোতলার ছাদে ভিড় করে আছি আমরাও। দাদা-দিদিদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে সে এক অন্যরকম গ্যালারি। সেই গ্যালারি সমস্বরে বলে, ‘প্রতি বছর বোনাদাদু মারা পড়বে জেনেও কেন বাঘ সাজে বল তো?’
বাৎসরিক খেলা শেষে ফের একসঙ্গেই আগুন ভাগাভাগি করে নেয় আমার দুই জ্যাঠা। আমার দুই স্বজন। দূর থেকে মুচকি হাসে মহাকাল। তার পরে আজীবন শিকারিরাই জিতে যায়। স্রেফ মরার জন্যই বেঁচে থাকে বাঘ, আমজনতা এবং ভোটার!
দেখতে দেখতে রাতেরও বয়স বাড়ে। ছায়াপথ ধরে ফিরে যায় বোনা জ্যাঠা…প্রভাত জ্যাঠা…মাধুপিসি…।
কাকতালীয়? হবেও বা! এ বছর আজ থেকেই শুরু হল রমজান। মাসান্তে চাঁদ দেখেই পালিত হবে খুশির ইদ। শুভ নববর্ষ। আগাম শুভ ইদও। সকলে ভাল থাকুন। সকলের কল্যাণ হোক। মঙ্গল হোক। জীবনের শেষ শ্বাসটুকু পর্যন্ত আমরা সবাই যেন এ ভাবেই আরো বেঁধে বেঁধে থাকতে পারি।
(ফিচার ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া)