রচনা মজুমদার

“একটি কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে?”
নবারুণ লিখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেনও তাই। ফুলকি তো উড়ল। শুকনো ঘাসেও পড়ল। কিন্তু জ্বলল শুধু নির্যাতিতার দেহ। “এ জীবনে যতটুকু চেয়েছি। মন বলে তার বেশি পেয়েছি…”
উঁহু। কিছুই পাইনি। কয়েক বছর আগে একটা অডিয়ো ক্লিপ শুনেছিলাম। এক ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীর গর্ভপাত করাতে চান। তিনি লিঙ্গ নির্ধারণ করে জানতে পেরেছেন, কন্যাসন্তান আসতে চলেছে। আর আরও একটা কন্যাসন্তান এলে আরও একটা ধর্ষণ বাড়বে। শিউরে উঠেছিলাম শুনে।
বাড়ি ফেরার আগে দেখতাম গলির মোড়ে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘‘ঘরে খুব গরম।’’ বাবার হাতে দেখতাম কাগজ। ভোটের হ্যান্ডবিল। সকলেই বলতেন, ‘‘আমাকেই দেবেন কিন্তু।’’ বাবা হয়তো মনে মনে বলতেন, ‘‘দেবো।’’ কিন্তু তারপরে আমার মেয়েটা নিশ্চিন্তে আসতে পারবে তো? সে উত্তর আমার বাবার মতো অনেক বাবা খুঁজছেন। যাঁদের মেয়েরা বাইরে থাকেন। রাত হলেই মেসেজ আসে— ‘কিরে ফিরেছিস?’ না ফিরলেও কিছু করতে পারবে না অসহায় বাবা-মায়েরা। তবে ‘ফিরেছি’ শুনলে হয়তো একটু ঘুমোবে।
প্রচারে বেরিয়ে নেতা-নেত্রীরা বলেন, ‘‘আমাকে ভোট দিও, বাড়ি হবে। আমাকে ভোট দিও, মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব আমার।’’ কখনও শুনি না কোনও ধর্ষিতার বাড়িতে গিয়ে তারা বলছেন, ‘‘ক্ষমতায় এলে ধর্ষণ বন্ধ করে দেব।’’ অবশ্য, বললেই তো হল না। হ্যাপা আছে। হ্যাপার নাম শাস্তি। শাস্তির মেয়াদ আঠারো মাসে বছর। ফলে নিকুচি করেছে শাস্তির। ধর্ষিতার সঙ্গে ধর্ষকের বিয়ে দিয়ে দাও। ব্যাস। সমাধান হয়ে গেল। বিয়ে হল। ধর্ষণ বাড়ল। নৃশংসতা বাড়ল। রতনে রতন চিনল। নেতায় চিনল নেতা। ধর্ষিতাকে নিয়ে রাজনীতি বাড়তে থাকল। অবস্থা বদলাল?
খুব অবাক লাগলেও সত্যি এটাই। এই কি ভোট প্রচারের নমুনা? এই নারী বিদ্বেষ, শালীনতা, সম্ভ্রমের সীমা-পরিসীমা ধুলোয় মিশিয়ে এ ভাবে প্রচার হয়? বাংলায় এসে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে বারমুডা পরার পরামর্শ দিচ্ছেন। বারমুডা খারাপ পোশাক নয়। হাঁটু দেখানোও অন্যায় নয়। অন্যায় তাঁর ভঙ্গী। অন্যায় তাঁর পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। অন্যায় অহং। যে অহং বোধ থেকেই উনি বা ওঁরা রগড়ে দিতে চান। যে অহং বোধ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলতে পারেন, “সোমত্ত মেয়ে বেশি দিন বাপের বাড়ি থাকা মানায় না।” যে অহং থেকে বলতে পারেন জয়া বচ্চন বাংলার কিছু জানেন না। যে অহং বোধ থেকে, যে স্পর্ধা থেকে এক মহিলাকে তিনি বলতে পারেন, ‘‘একদম ন্যাকামি করবেন না।’’ ভয় পান। ভয় পাওয়ারই সময় এসেছে।
কারণ, প্রশ্ন উঠবে আপনার সম্ভ্রম নিয়ে। আপনার শালীনতাবোধ নিয়ে। ভাবতে পারছেন? ভোট ভেবেও তো নেতারা সংযত থাকেন। কিন্তু ওঁদের সেটুকু ভয়ও নেই। এখনই যদি ঔদ্ধত্য আকাশ ছোঁয়, ক্ষমতায় এলে কী হবে? শিউরে উঠছেন? না উঠলে ক্ষতি নেই। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। মূল্যবৃদ্ধি, সুদ, গ্যাস বাদ দিলাম। ন্যায়? পাবেন? পাবেন না। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবেন না। দম্ভ ভেঙে দেওয়া হবে। আর মেয়েদের দম্ভ ভাঙা যায় তার যোনিপথেই। তারপর পুড়িয়ে দিয়ে প্রমাণ লোপাট করতে হয়। তারপর তার পরিবার, তার আইনজীবী সবাই গায়েব হয়ে যান। যাঁরা ছেঁড়া জিন্স ব্যান করেন, বেশি চাল পেতে গেলে বেশি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার কথা বলেন, তাঁরা সব একই গোত্রের।
তবে এরা এখনও এ রাজ্যে নেই। এলে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যাবে। আপনি অভিযোগ করতে গেলে, আপনাকে আপাদমস্তক দেখা হবে। তারপর বলা হবে, “ঠিকই তো আছে। আপনি এমন পোশাক পরেছিলেন কেন?” আমি নিজে সেদিন অদ্ভুত একটা স্টোরি করলাম। ভদ্রমহিলা লিমকা কিনতে বেরিয়ে হেনস্থা হয়েছেন। কারণ তাঁর পোশাকটি নাকি হেনস্থার মতোই ছিল। তৃতীয় দফার দিন পাপিয়া অধিকারীকে মারা হয়েছে। সুজাতা মণ্ডলের পিছনে হাঁসুয়ার বাড়ি মারার চেষ্টা হয়েছে। ভাবুন। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তা নেই। কী হবে আপনার, আমার? দিন কয়েক আগে ট্রেনে বসে লিখেছিলাম, ‘‘আমি সেই সরকার চাই, যার রাজত্বে মেয়েদের পিঠের ব্যাগ বুকে নিয়ে ট্রেনে-বাসে চাপতে হবে না।’’ দেখছিলাম, রোজই শেয়ার বাড়ছে। কেন? কারণ, এ সমস্যা সব্বার। শিকার হতেই কি অভ্যস্ত হচ্ছি আমরা? শুকনো পাতা ঝরবে কি? জানি না। নবীন পাতায় উঠোন ভরবে? তাও জানি না। তাহলে কী জানি? জানি, এ বার ভোটে আমরা নিজেদের জ্ঞানগম্যির পরিচয় দেব। আমরা। উই দ্য পিপল অফ ইন্ডিয়া।
বাংলা কার বা নন্দীগ্রাম কার ভাবার আগে একবার নিজের কথা ভেবে নেব। তর্জনীতে কালির দাগ পেনেও দেওয়া যায়। আমরা এ বার প্রমাণ করব আমরা নাগরিক। ধৰ্ম নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্রের নাগরিক।

(লেখকের মত ব্যক্তিগত। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)