সুদীপ জোয়ারদার

তখন ঘন ঘন বাংলা বই পাল্টাত না স্কুলে। ফলে বইয়ের এক-একটা গল্প কবিতা বা প্রবন্ধ দশকের পর দশক পঠিত হয়ে ঐতিহ্যের মতো হয়ে যেত। তবে ঐতিহ্য মানেই কিন্তু সম্ভ্রমের দূরত্ব ছিল না। আর ছিল না বলেই সে সময় কয়েক দশক জুড়ে অক্ষয়কুমার বড়াল প্রতি গ্রীষ্মে বাংলার কিশোর-তরুণদের ডাক দিতে পারতেন একেলা জগৎ ভুলে, নদীকূলে পড়ে থাকার।
পাঠ্য কবিতা বা গল্পের আনন্দ ও রহস্যময় আবরণ ব্যাখ্যায়, টিকা-টিপ্পনিতে কিছুটা চটে যায়। কিন্তু কী দুর্নিবার শক্তি এই গীতিকবির! সাহিত্য বিশ্লেষণের নীরসতার মাঝখানেও ‘মধ্যাহ্নে’র এমনই অলস স্বপন জাল বিছিয়ে গিয়েছেন সেদিন যে আমরা তাতে আজও মজে থাকি গ্রীষ্ম এলেই। অক্ষয়কুমারের হাত ধরেই আমরা অনেকে গ্রীষ্মপ্রেমিক হয়ে গেছি আজীবন।
প্রতি বৈশাখে ফিরে ফিরে জন্মান রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু কার্তিকের (১২৭৩) জাতক হলেও অক্ষয়কুমার আমাদের কাছে এই কবিতাসূত্রেই ফিরে ফিরে আসেন প্রতি গ্রীষ্মে। আর আমরা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি নদীতীরে হেলে পড়া নধর বটটির মতো কবিতার নানা এলিমেন্টকে।
অথচ অক্ষয়কুমার মধ্যাহ্নের মতো শান্ত, স্থির কিরণ ছড়ানো কবিতা লিখে গেছেন অজস্র। প্রায় সাঁইত্রিশ বছরের কবি-জীবন অক্ষয়কুমারের। জীবদ্দশায় পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর। পত্নীবিয়োগের পরে তাঁর স্মৃতিতে লেখা কাব্যগ্রন্থ ‘এষা’ তো বিখ্যাত হয়ে আছে আজও। ‘এষা’ সমকালে এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে রবীন্দ্রনাথের ‘মালঞ্চে’র অসুস্থ নায়িকা নীরজাকে তাঁর স্বামী আদিত্যর উদ্দেশে বলতে শুনি—‘এইবার আলো জ্বালাও, আমাকে পড়ে শোনাও অক্ষয় বড়ালের ‘এষা’।’
‘মধ্যাহ্নে’র যে কবি-মানুষটির কাছে আমাদের এত ঋণ, এই গ্রীষ্মে যখন ‘চাতক কাতরে ডাকে, চরে বক নদী-বাঁকে’ তখন একবার ছুঁয়ে দেখা যেতেই পারে তাঁকে।
কেমন ছিলেন কবি-মানুষটি? নানা জনে নানারকম লিখে গেছেন। যৌবনে মোহিতলাল অক্ষয়কুমারের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। মোহিতলাল লিখেছেন—‘বাহিরের জীবনে অক্ষয়কুমার ছিলেন একজন অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী ভদ্রলোক-গৃহী ও বিষয়ী। … তাঁহার কবি-জীবন ও ব্যক্তি জীবনের মধ্যে একটা সুদৃঢ় ব্যবধান ছিল; জীবনে কাব্যাভিনয় তাঁহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল।’
হেমেন্দ্রকুমার রায় ‘যাঁদের দেখেছি’ বইয়ে অক্ষয়কুমার সম্পর্কে লিখেছেন। সেখানে অক্ষয়কুমার দোষে, গুণে একজন সাধারণ মানুষ। বিহারীলালের শিষ্য তিনিও, তাই রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসতেন। ‘জ্যেষ্ঠ কবিভ্রাতা’, ‘অনন্ত দোসর’ ইত্যাদি সম্ভাষণও করতেন। হৃদ্যতাও ছিল। যে কারণে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় শুরু হলে যে অক্ষয়কুমার তাঁর বড় ছেলে অময়কুমারকেও ভর্তি করে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সনেট লিখেছেন, ‘ভুল’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন, আবার একই গুরুর শিষ্য হয়েও রবীন্দ্রনাথ এত দ্রুত এগিয়ে গিয়েছেন যে অক্ষয়কুমার অতি সাধারণ মানুষের মতো ঈর্ষান্বিত না হয়েও পারেননি।
তবে অক্ষয়কুমার নিজের ক্ষমতা ভালোভাবেই বুঝতেন। তাই রবীন্দ্রনাথ যে অনেক দূরের যাত্রী তা বুঝতে দেরি হয়নি। ঈর্ষান্বিত হয়েও তাই দ্বিজেন্দ্রলাল রয়ের মতো প্রকাশ্য রবীন্দ্রবিরোধিতায় নামেননি।
হেয়ার স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু কতদূর পড়াশোনা করেছিলেন জানা যায় না। পড়াশোনা বেশিদূর না করলেও পড়ুয়া ছিলেন খুব। ভাল ইংরেজি বা বাংলা বই পেলে তা না পড়ে থাকতে পারতেন না। সভাসমিতি এড়িয়ে চলতেন। স্বভাবে লাজুক। আর হেমেন্দ্রকুমারের বর্ণনায়  ‘একহারা, ছিপছিপে দেহ, প্রায় গৌরবর্ণ, মুখশ্রী বিশেষ উল্লেখ্য বা তীক্ষ্ণধীজ্ঞাপক নয় বটে, কিন্তু মনে বিরাগও জাগায় না।’
কর্মজীবন কাব্যজীবনের পরিপন্থী ছিল। ‘দিল্লী এন্ড লন্ডন ব্যাঙ্কে’র হিসাব বিভাগের কর্মচারি ছিলেন। একজন গীতিকবির পক্ষে ব্যাঙ্কের হিসেবনিকেশের কাজ কতটা দুর্বিষহ হতে পারে, তা অক্ষয়কুমার লিখেও গেছেন কবিতায়। ‘বিষম জীবিকা-রণ/যুঝে যুঝে অণুক্ষণ/-হা বিধি-লিখন!’ জাতীয় চরণে কান পাতলে বোঝা যায় কবিহৃদয়ের রক্তক্ষরণ।
তবে কবির দাম্পত্যজীবন সুখের হয়েছিল। যদিও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দু’যুগ কবির সংসার আনন্দে সুখে ভরিয়ে স্ত্রী সৌদামিনী প্রয়াত হন ১৯০৭ সালে। স্ত্রীর প্রয়াণ অক্ষয়কুমার মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রীর উপর খুব নির্ভরশীল ছিলেন। একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন স্ত্রীকে হারিয়ে।
আর শেষজীবনে আরও একটা আঘাত পেয়েছিলেন বাস্তুচ্যুত হয়ে। কলকাতা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট যে সব পুরোনো বাড়ি ভেঙে ফেলে, তার মধ্যে অক্ষয়কুমারের পৈতৃকভিটাটিও পড়ে যায়। শেষবয়সে ভাড়া বাড়ির জীবন মন ভেঙে দেয় কবির। শরীর তো অনেক আগে থেকেই ভাঙছিল। ১৯১৯ সালের ১৯ জুন তাঁর সব যন্ত্রণার অবসান ঘটে।
‘খসে খসে পড়ে পাতা, মনে পড়ে কত গাথা/ ছায়া-ছায়া কত ব্যথা ঘুরে ধরাধামে’। পাতা খসে যায়, পাতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবন-গাথাও ফুরোয়। কিন্তু হারায় কি? ছায়া ছায়া যে সব ব্যথা গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে অন্তর্লীন হয়ে থাকে, সেখানে আজও ফুটে ওঠেন তিনি, অক্ষয়কুমার।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)