গৌতম সরকার

২৯ মার্চ, ১৯২৯। নিঃশব্দে চলে গেল নাট্যকার উৎপলরঞ্জন দত্তের জন্মদিন। বাবা গিরিজারঞ্জন ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষ। তিনি পরবর্তীকালে জেলার হিসেবে ইংরেজ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক (কমান্ড্যান্ট) নিযুক্ত হন। উৎপল দত্তের স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল শিলং শহরের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে। পরে গিরিজারঞ্জন বদলি হয়ে আসেন বহরমপুর শহরে। আনুমানিক ১৯৩৭ সালে ছোট ভাই নীলিন ও উৎপল বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলে ভর্তি হন। বহরমপুর জেল কোয়ার্টারেই কাটে ছেলেবেলার দিনগুলো। বিপ্লবীদের ভয়ে স্কুলে যাতায়াতের সময় তাঁদের সঙ্গে থাকতেন দেহরক্ষী। জেলের পাঠান রেজিমেন্টের জওয়ানদের সঙ্গে উৎপল ড্রিল করতেন। এই সঙ্গই তাঁকে সময়ানুবর্তিতা শিখিয়েছিল। জেল-সংলগ্ন কোয়ার্টারের সদর দরজায় মা শৈলবালার হাতে তৈরি এমব্রয়ডারি করা শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ নাটকের পেমেনিয়াসের সংলাপ ঝুলতো— ‘Never quarrel, never lend or borrow if you are honest’।
বোঝাই যায়, বাড়িতে পাশ্চাত্য শিক্ষার পরিবেশে শেক্সপিয়ারের উপস্থিতি ছিল অগ্রগণ্য। মেজদা মিহিররঞ্জন কিশোর উৎপলকে শেক্সপিয়ারের নাটকের গল্প পড়ে শোনাতেন। পাশাপাশি বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাটক শোনার চল ছিল। উৎপল সেই সব নাটক মন দিয়ে শুনতেন। তাই তো তিনি মাত্র ছ’বছর বয়সেই শেক্সপিয়ারের নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলতে পারতেন। বড়দিদির মাধ্যমে হিন্দুস্থানী মার্গ সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় বহরমপুরের জেল কোয়ার্টারেই। আরও পরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেন। তখনও নাটক তাঁকে টানেনি। ১৯৩৯ সালে বহরমপুর থেকে গিরিজারঞ্জন কলকাতায় বদলি হয়ে গেলে উৎপল বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতার পেশাদার থিয়েটার দেখতে শুরু করেন। সেন্ট জেভিয়ার্সে থাকাকালীনই শেক্সপিয়ারের ‘রিচার্ড দ্য থার্ড’-এ উৎপলের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে নিজের দলে টেনে নেন জিয়োফ্রে কেন্ডাল।
১৯৪৭ সালে নিকোলাই গোগোলের ‘ডায়মন্ড কাটস ডায়মন্ড’ -এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে কলেজ জীবনে উৎপলের নাট্য অভিনয়ের শুরু। তবে বহরমপুর আবার যখন তাঁকে ফিরে পেলো তখন ছিল ১৯৫৩ সাল, নাট্যজগতে তখনও তিনি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেননি। বহরমপুর শহরে ভারতীয় ‘গণনাট্য সঙ্ঘ’-এর মুর্শিদাবাদ জেলার প্রথম সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি রূপে আমন্ত্রিত হয়ে দুপুরের ট্রেনে বহরমপুর আসেন। তখন অবশ্য সংগঠনের বয়স মাত্র দু’বছর, কিন্তু এনার্জিতে ভরপুর স্বেচ্ছাসেবক দলে তাই তো উদ্যমের অভাব ছিল না। তবে প্রকৃতি বাম, বিকেলে প্রকাশ্য অধিবেশন হওয়ার আগেই কালবৈশাখী ঝড়ে নতুন বাজার সংলগ্ন নাট্যমঞ্চ ভেঙে পড়ল। ত্রিপল বাঁশ-খুঁটি সব ধুলিসাৎ। কিন্তু ঝড়ে প্যান্ডেল ভাঙার পরে সন্ধ্যা পর্যন্ত অঝোরে বৃষ্টি। বেগতিক দেখে তাঁকে স্বেচ্ছাসেবকরা সঙ্ঘের ঘরে নিয়ে বসান। ঘরোয়া পরিবেশে নাট্যালোচনা এবং আবৃত্তি পরিবেশনের পরে উৎপল দত্ত খুশী হয়ে বলেন- “কলকাতায় এ ধরনের গান শোনা তো দুর্লভ, এ গান শুনে বেশ ভাল লাগল”। সেইদিন তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের সব আবদার হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন।
এরপর ১৯৬৬ সালে চীনে মাও সে তুঙের নেতৃত্বে ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরু হলে বহরমপুরে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উৎপল দত্ত এবং সহযোগী ছিলেন কৃষ্ণনাথ কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক দীপঙ্কর চক্রবর্তী। এরপর রাজনৈতিক ডামাডোলে এল.টি.জি এর উপর বিধিনিষেধ আরোপ হলে তৈরি করেন-‘পিপলস লিটল থিয়েটার’ নামে নতুন নাট্যগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালের ১২ অগস্ট তাঁরই থিয়েটারের প্রথম নাটক ‘টিনের তলোয়ার’ এর নাট্যরচনা ও পরিচালনা তাঁকে অবলীলাক্রমে ভারতীয় থিয়েটারের সর্বোচ্চ শিখরে স্থান করে দেয়। তখন সত্তর দশকের ভুয়া গণতন্ত্র, ভোটে কারচুপি, জরুরি অবস্থা চলছে। তিনি রক্তাক্ত ও টালমাটাল সাম্প্রতিক সেই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৩০-এর দশকের জার্মানির প্রেক্ষাপটে লিখলেন রাজনৈতিক নাটক ‘ব্যারিকেড’। যার রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে যদিও বিতর্ক হয়েছিল। তবে এটি ছিল অসম্ভব মঞ্চসফল থিয়েটার।
নাট্যমঞ্চে ‘ব্যারিকেড’-এর সফল রূপায়ণ ঘটাতে আনুমানিক ১৯৭২-৭৩ সালে তিনি বহরমপুর এসেছিলেন। সেই সময় পি.এল.টি এর ‘ব্যারিকেড’ ছাড়াও আরও তিনটি সংস্থার তিনটি নাটক সহ চারদিন ব্যাপী ৪টি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রথম তিন দিন টিকিট বিক্রি কম হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বড় লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। তবে শেষদিনে উৎপল দত্ত পরিচালিত ও অভিনীত ‘ব্যারিকেড’ নাট্যানুষ্ঠান সব ক্ষতি পূরণ করেও লাভের অঙ্ক দেখানোই আয়োজকরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। এখানেই শেষ নয়, এরপর ১৯৮৯ সালে মুর্শিদাবাদ জেলা সাংস্কৃতিক উৎসব উপলক্ষে উৎপল দত্ত আবার বহরমপুর আসেন। সভার আয়োজন হয়েছিল গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘের নামে। সময়টা ছিল কাটরা মসজিদের ঘটনা উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতের পর। জেলার চতুর্দিক থেকে আগত লোক শিল্পীদের জাঠা উপলক্ষে বিপুল উদ্দীপনার মধ্যে উৎপল দত্ত এলেন বহরমপুর রবীন্দ্রসদনে। প্রবল বর্ষণ সত্ত্বেও রবীন্দ্রসদনের হলঘর ছাপিয়ে বারান্দা ও ময়দান ভরে যায়। সভা শেষে শুরু হয় মিছিল। তিনি মিছিলে যেতে না পারলেও মিছিলের দু’পাশে পথে দ্বিতলের বারান্দায় উন্মুক্ত জনতার মূল আকর্ষণ ছিলেন উৎপল দত্ত। অন্যদিকে উৎপল দত্তের কাছেও বহরমপুর ছিল আবেগ, ভালোবাসা ও বাল্যস্মৃতির আধারস্থল। তাই তো জেলাবাসীর আহ্বানে কখনোও না বলেননি, মুখিয়ে থাকতেন সুযোগের অপেক্ষায়।।
তথ্যসূত্র : (১) স্মৃতিচারণা: সুধীন সেন, ‘চেতনার চোখ’ – উৎপল দত্ত সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ১৯৯৩, (২) ‘পত্রিকা’- শনিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮, (৩) উৎপল দত্ত ও তাঁর বিতর্কের কালো মেঘ – অরূপ মুখোপাধ্যায়
(লেখক বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলের শিক্ষক। ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)