দীপক সাহা     

ভোটোৎসবের আগমনী বার্তা ভোটকর্মীদের খুব একটা আমোদিত করে না, বরং তাঁদের মনের মধ্যে ভয় আরও বাড়তে থাকে। ভোট এলেই শিক্ষক রাজকুমার রায়ের রেললাইনের ধারে ছিন্নভিন্ন দেহাংশের ভয়ঙ্কর স্মৃতি উসকে দেয়। মনের মধ্যে ঢেউ তোলে বলা, না-বলা নানা কথা ও কাহিনি। ভোটের ট্রেনিং-এর সময় ট্রেনার অফিসারেরা বলে চলেন কমিশনের শেখানো গালভরা বুলি, “সুরক্ষিত  নিরাপত্তার ঘেরাটোপে এ-বারের ভোটগ্রহণ পর্বের কাজ চলবে। কোনও ভয় নেই। অন্য ব্যবস্থা নিয়েও আপনারা কোনও দুশ্চিন্তা করবেন না।” একই ভাঙা রেকর্ড প্রতিবার শোনানো হয়। এ সব কাহন শুধু খাতায়-কলমে, ল্যাপটপে ঠান্ডা ঘরেই আবদ্ধ থাকে।
ভোটের আগের দিন জামাই আদর করে ভোটকর্মীদের ডিসিআরসি সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হল। এ যেন গণভোটের উৎসবে ভোটের দিন যূপকাষ্ঠে বলি হওয়ার আগে পাঁঠাকে খাতির-যত্ন করা। এ দিকে অব্যবস্থাপনার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা। ফেস্টুন ছাড়া কোভিডবিধিমালার কোনও নমুনা নেই। ভিড়ে ঠাসা ডিসিআরসিতে ভোটের সাজসরঞ্জাম সংগ্রহ করা থেকেই বিশৃঙ্খলার সূচনা। চারদিকে বিভিন্ন মাইকে তারস্বরে চিৎকার। ভোটের সরঞ্জাম মেলাতে গিয়ে দেখি অনেক গরমিল। গরমিল মিল করতে গিয়ে গড়ের মাঠের ক্যানভাসে বিভিন্ন প্রান্তে ফুটে উঠছে কর্মীদের ব্যস্ততার টুকরো টুকরো কোলাজ। এ যেন এক হট্টমেলা।
পরের পর্বে আরও অব্যবস্থা অপেক্ষা করে আছে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার গাড়ি খুঁজে পেতে কালঘাম ছুটে গেল। গাছপালা, ঘাসবর্জিত ধুলোময় বিশাল মাঠে অনেক খোঁজাখুঁজির পরে বাসের সন্ধান পেলাম, কিন্তু চালক বেপাত্তা। দীর্ঘ ছোটাছুটি, হাঁকডাকের পর ওঁকে পাওয়া গেল। এ বার অপেক্ষা অন্য পোলিং পার্টিদের জন্য। প্রখর রোদের মধ্যে পাক্কা দু’ঘণ্টা অপেক্ষা।
পড়ন্ত বেলায় গাড়ি ছাড়ল। ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেখলাম, শুধু বিল্ডিংটিই অপেক্ষা করছে আমাদের অভ্যর্থনা করার জন্য। ধুলোময় একটা ঘর। ভাঙা একটা টেবিল উল্টে পড়ে আছে। ঘরের জানালায় কাচ নেই। তেষ্টার জল নেই। কিছুক্ষণ পরে সেক্টর অফিসার চারচাকা হাঁকিয়ে হাজির। অভিযোগ জানাতেই রুক্ষ কণ্ঠে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘‘এর থেকে ভাল কিছু ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়।’’ অগত্যা রিটার্নিং অফিসারকে ফোন করলাম। ফোনের অপরপ্রান্তে মেকি আশ্বাস, ‘‘দেখছি।’’ কিছুক্ষণ পরে একটি রাজনৈতিক দলের আশ্রিত স্থানীয় চার স্বঘোষিত সমাজসেবক মুসকিল আসান হিসাবে মোটরসাইকেলে উপস্থিত। একজনের কোমর থেকে উঁকি মারছে সিনেমায় দেখা আগ্নেয়াস্ত্র। ছাপোষা গ্রামের মাস্টারের সেই অস্ত্রের কিঞ্চিৎ দেখেই ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। “স্যর, একদম ভয় পাবেন না। এ বার তো কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে।”, কোমরের নির্দিষ্ট জায়গায় হাত রেখে আকারে, ইঙ্গিতে গণতন্ত্রের সারকথা বুঝিয়ে দিলেন আগন্তুক। সমাজসেবকেরাই চেয়ার, টেবিল ও তেষ্টার জলের ব্যবস্থা করে দিলেন। আর্সেনিকপ্রবণ এলাকাতেও সে তেষ্টার জলের ব্যবস্থা তথৈবচ। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জায়গা দেখলে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসবে।
সন্ধ্যা নামতেই বৃষ্টি, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। লোডশেডিং। ফাঁকা জানলা দিয়ে জলের ঝাপটা। জলময় মেঝেতে ইভিএম মেশিন মাথায় নিয়ে চৈতন্যদেবের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। প্রায় এক ঘণ্টা পরে ঝড়-বৃষ্টির রুদ্রমূর্তি স্তিমিত হল। কিন্তু এ দিকে কমিশনের দেওয়া লাইটের ব্যাটারির চার্জ শেষ। অগত্যা মোমবাতি জ্বালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কাজ সারতে হল। সারারাতের উপরিপাওনা মশার অর্কেস্ট্রা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান একে-ফর্টিসেভেন কাঁধে ঝুলিয়ে সারারাত গেটের মুখে অতন্দ্র প্রহরী। আর ভোটের ঋত্বিক হয়ে মেঝেতে চাদর পেতে সারারাত কাটিয়ে দিলাম ঘুমশূন্য চোখে। ভোরে পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে উঠে পড়লাম। গত রাতে বৃষ্টির সৌজন্যে চমৎকার আবহাওয়া। তিন পোলিং অফিসারদের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সজাগ ও সতর্ক উপস্থিতিতে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যে ৬.৩০টা পর্যন্ত নানা রোমাঞ্চকর ঘাত-প্রতিঘাতের পরে ভোট-পর্ব সমাধা হল।
অপেক্ষার অবসানে রাত ৯টার সময় বাস ছাড়ল। দেখলাম, ভোটের গাড়ির সৌজন্যে প্রায় দু’কিলোমিটার রাস্তায় যানজট। দু’ঘণ্টা পরে নিজেরাই কুলি হয়ে ডিসিআরসিতে ডিপোজিট কাউন্টারের পৌঁছলাম। কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সর্পিল রেখা। রেখা ক্ষুদ্রতম হলে ডিপোজিট কাউন্টারে উভয়পক্ষের মধ্যে খাম গালাবন্ধ করা নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় একসময় গালাগালির পর্যায়ে পৌঁছয়। অবশেষে রাত ১২টার সময় রিলিজ অর্ডারটি হাতে নিয়ে ছুটলাম বাড়ি ফেরার বাস ধরতে।
কিন্তু কোথায় বাস! ভোটপর্ব শেষ, কমিশনের দায়িত্বও শেষ। অগত্যা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ভিড়ে ঠাসা একটা বাসে কোনওরকমে উঠে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে বাড়ির পথে রওনা দিলাম। অবসন্ন, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীর-মন নিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই বাড়ির কলিং বেলে আঙুল দিতেই সদর দরজায় স্ত্রী, পিছনে বৃদ্ধা মায়ের ক্ষীণ কণ্ঠ, ‘‘এসেছিস বাবা!’’ ঘরে ঢুকে দেখি আদরের সন্তান মুখ খোলা অবস্থায় অঘোরে ঘুমোচ্ছে।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

(ভোটের ডিউটিতে গিয়ে কেমন হল আপনার অভিজ্ঞতা, ৬০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান এই মেলে— sadakalonewz@gmail.com। নির্বাচিত লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের নিউজ পোর্টালে (sadakalo.in)। সঙ্গে নিজের ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাতে ভুলবেন না)