তুষার ভট্টাচাৰ্য

বাংলা সাহিত্যের মেধাবী আলোর কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার অন্তর্লীন জগৎ কখনও রোমান্টিক মেজাজের স্রোতে অবগাহন করেনি। আদ্যোপান্ত বামপন্থী মানসিকতায় আচ্ছন্ন এবং সমকালীন সমাজচেতনার দ্যোতনা তাঁর কবিতার অঙ্গে সতত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়েছিল। তাঁর বামমার্গীয় সমাজচেতনা কী ভাবে মূর্ত হয়েছে কবিতায় তা পাঠকেরা অনায়াসে দেখতে পান দেশের স্বাধীনতার পরে ১৯৫১ সালে কোচবিহারে খাদ্য আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পাঁচ জনের মৃত্যু দেখে। এর প্রতিবাদে শঙ্খ ঘোষ লেখেন তাঁর বিখ্যাত ‘যমুনাবতী’ কবিতাটি— ‘নিভন্ত এই চুল্লিতে মা /একটু আগুন দে /আরেকটু কাল বেঁচে থাকি / বাঁচার আনন্দে… যমুনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে /যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে ‘
ম্যাক্সিম গোর্কি একদা লিখেছিলেন, কবি-লেখকেরা হচ্ছেন তাঁর সমকালের কণ্ঠস্বর। সামাজিক মননের আলোকে উদ্ভাসিত কবি শঙ্খ ঘোষের বিভিন্ন লেখাতেও  নিপুণ ব্যঞ্জনা আর রূপকের আড়ালে পরতে পরতে উঠে এসেছে সমকালীন সমাজ ভাবনার মূল সুর। যখন তিনি লেখেন ‘তিসরা ঝাঁকি’ কবিতায়—’তিসরা ঝাঁকি দিকে দিকে, কোনোখানে/কালুবর্গী /কোথাও বা গৌরী লঙ্কেশের /খরা জরা জলস্রোতে রক্তস্রোতে ভেসে যায় /স্বপ্ন যত ভবিষ্যৎ দেশের /গলায় মুন্ডুর মালা /তাথৈ তাথৈ নাচে/গোটা দেশ হয়েছে ভাস্বর /আজ সে পরীক্ষা হবে আমরা শুধু শব বাহক।’
আবার গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছে তিনি এক অখ্যাত বুড়ো কৃষকের কথা লেখেন চমৎকারভাবে—
‘কিংবদন্তি জানে সেই বুড়োটির কথা, যে এখনো
খরায় জড়ানো দিনে মাটির আঘ্রাণ নিতে নিতে
বলে দিতে পারে বুকে কোনখানে জমে আছে জল
সমস্ত গাঁয়ের লোক তাঁর শীর্ণ চোখে চেয়ে থাকে
সেই বুড়ো মরে গেলে পৃথিবী অনাথ হবে
নাকি?
আমাদের বুকে আজ জমেছে আগুন ভরা জল।’
কবি শঙ্খ ঘোষের কলম ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় ‘দেশ’-সহ অন্য পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশে সেন্সর করেছিল সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সরকার। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে তাঁর প্রতিবাদী মনন—’আপাতত শান্তি কল্যাণ’ কবিতায় ফুটে উঠেছে নীরবে শাসকের প্রতি শ্লেষ—
‘পেটের কাছে উঁচিয়ে আছ ছুরি /কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি /এখন সবই শান্ত, সবই ভালো / যে কথাটাই বলতে চাও বলি /সত্য এবার হয়েছে জমকালো ‘
সাম্প্রতিককালে  লেখা তাঁর একটি কবিতাতেও ফুটে উঠেছে এই সময়ের প্রচারসর্বস্ব উন্নয়নেরর ফানুসের কথা—
‘যথার্থ এই বীরভূমি
উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে এসে
পেয়েছি শেষ তীরভূমি;
দেখ খুলে তোর তিন নয়ন
রাস্তাজুড়ে খড়্গ হাতে
দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।’
প্রতিবাদী কবিতার পাশাপাশি শঙ্খ ঘোষ অনেক কবিতা লিখেছেন, যেখানে কবি যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলেছেন। যেমন— ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয় /সারা জীবন বইতে পারা / সহজ নয় /একথা খুব সহজ /কিন্তু কে না জানে /সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়।’ কিংবা,
‘আমার দুঃখের দিন তথাগত
আমার সুখের দিন ভাসমান
এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে
আমার মৃত্যুর দিন পড়ে।’
‘বাড়ি’ নামক একটি কবিতায় কবি লেখেন—
‘আমি একটি বাড়ি খুঁজছি বহুদিন
মনে মনে
আলোর তরল জলে ভেসে যাব কবে’। অথবা—
‘ভয় কেন ভয়?
আমি খুব
শান্ত হয়ে চলে যেতে পারি ‘
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর কবিতার এই পংক্তিতে ধরা রয়েছে উজ্জ্বল ভাবে— ‘আয় আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’ তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত প্রতিষ্ঠান বিরোধী। তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিকে তিনি কখনও সরকারের কাছে বিকিয়ে দেননি। সবসময়ই কবির শিরদাঁড়া ছিল সোজা। তাঁর মনন ও চেতনা বাঙালির আত্মজাগরণের ক্ষেত্রে পাথেয় হয়ে থাকবে ভবিষ্যতে।
কবি শঙ্খ ঘোষ যদি কবিতা না লিখে শুধু প্রবন্ধই লিখতেন তাহলেও তিনি বিখ্যাত প্রাবন্ধিক হতেন। তাঁর লেখা কালের যাত্রা ও রবীন্দ্রনাথ, এ আমির আবরণ, ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি প্রবন্ধের বইয়ে রয়েছে মননঋধ্য জাদু-গদ্যের এক আশ্চর্য মায়াটান।
‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা যুগের অন্যতম কবি ও বিশিষ্ট রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগৎ একজন অভিভাবককে হারাল। ‘কৃত্তিবাসী’ নামে খ্যাত কবি  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আগেই প্রয়াত হয়েছেন। সদ্য কবি শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লিটল ম্যাগাজিন ‘কৃত্তিবাস’ যুগের প্রায় অবসান ঘটল (যদিও একজন কৃত্তিবাসী যোদ্ধা কবি শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় এখনও সৃজনশীল রয়েছেন)।
কবি শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্ৰিয় ঘোষ। কবির আর একটি ছদ্মনামও রয়েছে— কুন্তক। কবির জন্ম ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের চাঁদপুরে। স্কুলজীবন শেষ করে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলা ভাষায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন পঞ্চাশের দশকে। কবি শঙ্খ ঘোষ তাঁর চাকরি জীবনের শুরুতে কিছুদিন বহরমপুর গার্লস কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী অধ্যাপিকা, লেখিকা প্রতিমা ঘোষ  বহরমপুরের সৈদাবাদের মেয়ে। শঙ্খ ঘোষ খাগড়ার বি বি সেন রোডে একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। বহরমপুরে থাকাকালীন এই শহরের সাহিত্য জগতের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। প্রয়াত কবি উৎপলকুমার গুপ্ত সম্পাদিত ‘সময়’ পত্রিকায় তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও শঙ্খ ঘোষ অধ্যাপনার কাজে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন। অধ্যাপক হিসেবেও তিনি ছাত্রমহলে যথেষ্ট জনপ্ৰিয় ছিলেন। শুধু অধ্যাপক হিসেবেই নয় শঙ্খ ঘোষ  কবি প্রাবন্ধিক হিসেবেও বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় যথেষ্ট উচ্চাসনে নিজ প্রতিভায় জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতার বইগুলির নাম— ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মূর্খ বড়ো, সামাজিক নয়’, ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘নিহিত পাতালছায়া’ প্রভৃতি। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। তাঁর প্রবন্ধের গ্রন্থের নাম কালের যাত্রা ও রবীন্দ্রনাথ, এ আমির আবরণ প্রভৃতি বিখ্যাত। শিশুদের জন্যও তিনি  লিখেছেন ছড়া, কবিতা। সুপুরি বনের সারি শিশুদের জন্য লেখা একটি অপূর্ব গ্রন্থ। জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, সরস্বতী পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মভূষণ পুরস্কারও পেয়েছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য একজন প্রকৃত অভিভাবককে হারাল।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)