নবনীতা মণ্ডল

সরস্বতী পুজোর আগের দিন যোগ দিয়েছি নতুন কর্মস্থলে। নতুন সহকর্মী আর নতুন চেনা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মেতেছিলাম পুজোর ঘর সাজানোয়। এমন সময় এল ইলেকশন কমিশনের চিঠি। পনেরো বছরের চাকরি-জীবনে এই প্রথমবার ভোটকর্মী হিসেবে নিয়োগপত্র। প্রথমবারেই প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব। খুব যে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, তা নয়। তবে জীবনে কখনও কোনও কাজে পিছিয়ে যাইনি। তাই একবারও ভাবিনি যে, কোনওভাবে এই দায়িত্ব থেকে পিঠটান দেব। একটু একটু করে তৈরি করেছিলাম নিজেকে। প্রশিক্ষণ কিছুটা প্রাথমিক ধারণা দিল, বাকিটা সহকর্মীরা, ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিয়ো এবং পরিবারের সাহায্য। এছাড়া আর যার কথা না লিখলেই নয় সে হল বন্ধু পরাশর। নিরন্তর সে সাহস জুগিয়েছে আমাকে। এরপর আর ভাবিনি। কাজটা সঠিক ভাবে শেষ করব, পুরো দায়িত্ব সহযোগে কথা দিয়েছিলাম নিজেকেই।
আমাদের ডিসিআরসি ছিল কল্যাণী মহাবিদ্যালয়। সকালেই খবর পেয়েছিলাম, কিছুটা স্পর্শকাতর এলাকায় আমার বুথ। ডিসিআরসিতে প্রচুর লোকের ভিড়, করোনা বিধির লেশমাত্র নেই, ভয়টা পেলাম এ বার। তবে সচেতনতার অভাব এবং কিছু মানুষের ঋণাত্বক মনোভাব, স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করা, এ সব বাদ দিলে মোটামুটি খারাপ ছিল না ব্যবস্থা। একে একে তিন জন পোলিং অফিসার এলে সব জিনিসপত্র তালিকা অনুযায়ী মিলিয়ে নিলাম। যেহেতু প্রথম অভিজ্ঞতা তাই উৎসাহের ঘাটতি ছিল না। যতটা সম্ভব বুঝে নিলাম। এরপর বাড়ির মাসির যত্নে দেওয়া দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। সবার খাওয়া হলে শুরু হল বাস খোঁজার পালা।
জানা গেল, আমাদের বাসে আরও চারটি বুথের পোলিং অফিসারেরা যাবেন। আমার ওয়েব কাস্টিং ছিল, সেটা সহজেই জুড়ে নেওয়া গেল। কিন্তু গোল বাধল পুলিশ ট্যাগিংয়ের কাউন্টারে গিয়ে। পাগলের মতো এ ওর ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে নিজের নির্ধারিত পুলিশ খুঁজছে। কিন্তু কোথায় কী! কয়েকশো লোকের মাঝে থেকে উদভ্রান্তের মতো খুঁজলাম আমার বুথের নির্ধারিত মহিলা পুলিশকে। পেলাম না। তিনি অনুপস্থিত। এই প্রক্রিয়াটি আরও মসৃণ হওয়া উচিত ছিল। যাইহোক ওদিকে বাস আর অপেক্ষা করবে না। দৌড়ে এসে চলন্ত বাসে উঠলাম। শরীর ততক্ষণে গরমে, রোদে আর পরিশ্রমে ক্লান্ত। কিন্তু মনকে শক্ত করলাম।
এ বারের বিপত্তি আমাদের মুর্শিদাবাদবাসী ড্রাইভার আমাদের জন্য নির্দিষ্ট বুথ, যাত্রাপথ কিছুই চেনেন না। বেশ কিছু পথ গোল গোল ঘুরে অবশেষে কুড়ি মিনিটের পথ দু’ঘণ্টায় পৌঁছলাম। ছোট্ট একটি প্রাথমিক স্কুল। সদ্য রং করা। সবই আছে। কিন্তু জলের অভাব। আর শৌচাগারটি বেশ অসুবিধেজনক মহিলাদের পক্ষে। কী আর করার, সেক্টর অফিসারকে অনেক অনুরোধের পরে একটি পৌরসভার জলের গাড়ির ব্যবস্থা করা গেল। ফলে পানীয় জল পর্যাপ্তই পেলাম। পাশেই আর একটি বুথ। তাই মোট দশ জন ছিলাম আমরা। বেশ অপরিষ্কার ঘরটি। ফলে নিজেরা হাত লাগিয়ে (মেয়েরা যেখানেই যাক এই কাজটি পিছু ছাড়ে না… বোধহয় মহাকাশেও না) মোটামুটি কাজ চালানোর মতো করে নিলাম।
তারপরে বসলাম কাজের ঝুড়ি নিয়ে। সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেল! সব পোস্টার, বোর্ড টাঙালাম, ভোটিং কম্পার্টমেন্ট ঠিক করে সবার বসার জায়গা ঠিক করে ফ্রেশ হলাম। কিন্তু পারিপার্শ্বিকের প্রতিবন্ধকতায় রাতের খাবার ঠিকমতো পেলাম না। সঙ্গে যা টুকটাক খাবার ছিল তাই দিয়ে সবার প্রয়োজন মিটল। শুতে গেলাম যখন ঘড়িতে তখন রাত দেড়টা। এক মুহূর্তের জন্যও নিদ্রাদেবী ধরা দিলেন না। বিনিদ্র রাত কাটিয়ে উঠে পড়লাম সাড়ে তিনটেয়। অন্ধকার কাটেনি তখন, তার মাঝেই দেখছি আমাদের সুরক্ষার ভার যাঁদের উপর তাঁদের নিরন্তর টহল, পাহারা।
ঘড়ির কাঁটায় শুরু করেছি মক-পোল। এটা নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। জানতাম মক-পোল উতরে গেলে আমার আর কোনও অসুবিধেই হবে না। হলও না। সব ঠিকঠাক হল। মেশিনগুলোও সহযোগিতা করেছে। এজেন্টদের দেখলাম পারস্পরিক দারুন সদ্ভাব, যা আমাকে কাজে সাহায্য করেছে। আমাদের বুথে  ভোটার ছিল ৮২৪। সুতরাং সকাল থেকেই ভিড় ছিল লাগাতার। পোলিং অফিসারদের সঙ্গে সখ্য হয়ে গিয়েছিল আগেই। সকলেই নিজের দক্ষতার পরিচয় দিলেন পুরো প্রক্রিয়াতে। ভোট শেষ হল ঠিক সাড়ে ৬টায়। ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ বার ডিসিআরসিতে ফেরার পালা। ফিরলাম রাত ১০টায়।  কিছুক্ষণের অপেক্ষায় খুব সফলতার সঙ্গে ডিসিআরসিতে জমা করলাম সবকিছু।
ভোটে অসুবিধে হয়নি তেমন। তবে মারাত্মক শারীরিক পরিশ্রম আর স্নায়বিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে। সেটা যদিও অনুমেয় ছিল। সবচেয়ে বড় কথা কোনও কিছুতেই নমনীয় না হয়ে কর্তব্য পালন করতে পেরেছি। নিজের কাছে এটাই প্রমাণ করার ছিল।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)

(ভোটের ডিউটিতে গিয়ে কেমন হল আপনার অভিজ্ঞতা, ৬০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান এই মেলে— sadakalonewz@gmail.com। নির্বাচিত লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের নিউজ পোর্টালে (sadakalo.in)। সঙ্গে নিজের ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাতে ভুলবেন না)