কল্লোল প্রামাণিক

ভোট-বাজারে বাজির বিরাম নেই!
আজ্ঞে এ বাজি পটকাবাজি বা বোমাবাজি নয়, এ বাজি বেটিং। ভোট-বাজারে মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই ছিটকে আসছে, ‘‘এ সব মুখের কথায় কাজ নেই ভায়া। হয়ে যাক বাজি?’’
পাড়ার মোড় থেকে চায়ের দোকান, গঞ্জের হাট থেকে সীমান্তের মাচা, শহরের রক থেকে খেলার মাঠ সর্বত্রই এক ‘ডায়ালগ’— হয়ে যাক বাজি! অবস্থা এমন জায়গায় গিয়েছে যে বহরমপুরের এক চায়ের দোকানের মালিককে পর্যন্ত দোকানে নোটিস সাঁটাতে হয়েছে— ‘‘এখানে রাজনৈতিক আলোচনা করবেন না।’’
করিমপুরের এক চা-বিক্রেতা আবার বেজায় বিরক্ত, ‘‘আর বলবেন না দাদা, দোকানে একটা খবরের কাগজ রাখি। আগে বাবুরা সব সেখানে তাসের হিসেব লিখতেন। এখন তাস-টাস সব শিকেয়। কাগজের উপরে যে যার মতো ভোটের হিসেব কষতে ব্যস্ত। পেনের কাটাকুটি আর সংখ্যার ভিড়ে খবর পড়াই দায় হয়ে যাচ্ছে।’’
বাজির তালিকায় কী কী আছে? সে এক লম্বা লিস্টি। গাছের কচি ডাব, মাচার লাউ, নগদ টাকা, এক মাসের চায়ের খরচ, পাঁচ লিটার স্যানিটাইজ়ারের জার, এক ডজন মাস্ক, মাটন বিরিয়ানি, দিশির বোতল, বিলিতির খাম্বা, খাসির মাংস এমনকি আইসক্রিম, ফুচকাও আছে।
করিমপুরের এক যুবক যেমন দু’টি বিষয়ে তিন জনের সঙ্গে বাজি ধরেছেন। বিষয় ১: ২ মে রাজ্যে কে ক্ষমতায় আসছে, ঘাসফুল নাকি পদ্মফুল? বিষয় ২: নন্দীগ্রামে কে জিতবেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি শুভেন্দু অধিকারী? রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে তিনি নগদ পাঁচশো টাকার বাজি ধরেছেন। আর নন্দীগ্রাম নিয়ে তাঁর বাজি মাটন বিরিয়ানি।
বহরমপুরের এক প্রৌঢ় আবার বাজি ধরেছেন এক মাসের চায়ের খরচ। আড্ডা চলছিল শহরের একটি চায়ের দোকানে। সেখানেই কথায় কথায় জমে ওঠে তর্ক। বিষয় সেই ঘাসফুল আর পদ্মফুল। তারপরে তর্ক থেকে বাজি। পাশের প্রৌঢ় বলে বসেন, ‘‘শোনো ভায়া, পদ্ম যদি পাপড়ি মেলতে না পারে তা হলে আমার সারা মাসের চায়ের খরচ তোমার। আর উল্টোটা হলে খরচ আমার। রাজি?’’ ‘কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে?’— মাধ্যমিকে ভাবসম্প্রসারণ করে আসা ওই যুবকও সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, ‘‘সামান্য চা! বেশ, আমি রাজি।’’ ব্যস, হয়ে গেল বাজি!
হোগলবেড়িয়ার এক চাষি খেতে কাজ করতে করতে মজার ছলে শুধু বলেছিলেন, ‘‘এ বার তো শুনছি হাওয়াই চটি নাকি ছিঁড়ে যাবে।’’ পাশের চাষি গর্জে ওঠেন, ‘‘বললেই হল! বাংলা এ বারেও নিজের মেয়েকেই জেতাবে। দেখে নিস! বাজি রইল আমার গাছের ডাব।’’ রেজিনগরের এক বৃদ্ধ আবার বাজি ধরেছেন চালের লাউ।
বাজি চলছে মহিলা মহলেও। দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে রানিবাগানের একটা ফ্ল্যাটে লুডো খেলছিলেন চার মহিলা। ছক্কা, পুট-এর গেরো কাটিয়ে হঠাৎ এক মহিলা বলে বসলেন, ‘‘হ্যাঁ রে, দিদিই কি আবার ফিরবেন নাকি…।’’ মুখের কথা শেষ না হতেই পাশের মহিলা বললেন, ‘‘দিদিই আসছেন। বাজি ধরে বলতে পারি। হেরে গেলে তোদের পেটভরে ফুচকা আর আইসক্রিম খাওয়াব।’’
২ মে আসতে আর যেন ক’টা দিন বাকি?
অঙ্কন: অর্কজ্যোতি প্রামাণিক