অসিত পাল

আমি এ বারেও প্রিসাইডিং অফিসার ছিলাম তেহট্ট বিধানসভার একটি দেহাতি গ্রাম্য বুথে। নতুন অভিজ্ঞতা সব ভোটেই হয়। তবে গ্রামের বুথে ভোট নিতে গেলে কিছু অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হয়। যা আমার ক্ষেত্রেও হয়েছিল। আজও সেই সব সমস্যা সামলেই ভোট করতে হয়। আমার প্রথম ভোটের কাজে যেতে হয়েছিল চাঁদেরঘাটে। ফার্স্ট পোলিং অফিসার ছিলাম আমি। পঞ্চায়েত ভোটে তখনও ছাপ্পার রক্তদাগ লাগেনি, পঞ্চায়েত ভোট তখনও উৎসবের মতো, তবে অবাঞ্ছিত ঘটনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েই যেত। সেদিনের ঘটনার কথা ভুলতে পারি না আজও।
সেই পঞ্চায়েত ভোটে ভোট দিতে এসেছেন এক বৃদ্ধা। সঙ্গে এসেছেন তাঁর জামাই। ওঁর নামে দাগ মারা হয়ে গিয়েছে। আঙুলে কালি দেওয়া হয়েছে। তারপরেই বৃদ্ধা জানালেন, তাঁর ভোট দেবেন জামাই। এমন মোক্ষম সময়ে এক যুবক দু’জন কনস্টেবলকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ভোটকক্ষে ঢুকে পড়লেন। প্রিসাইডিং অফিসারকে আঙুল উঁচিয়ে সেই যুবক বললেন, ‘‘ভোটের নিয়ম জানেন? কিচ্ছু জানেন না! ঠাকুমার ভোটে কার অধিকার, বলুন? জামাই নাকি নাতির?’’ প্রিসাইডিং অফিসার পড়লেন মহা ফ্যাসাদে! ভোট যে কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয় সে কথা বৃদ্ধার নাতিকে বোঝাতে তাঁর কালঘাম ছুটল। নাতির বোধের মাথায় পুরুষতান্ত্রিকতার মোটা আস্তরণ পড়ে আছে। পুরুষতান্ত্রিকতার এই সব ঘটনা চট করে চোখে পড়বে না। এমন ঘটনা আমি নিজের বাড়িতেও দেখেছি।
আমার মা সিপিএমকে ভোট দিতেন। মা কি বামপন্থা জানতেন? না। মা সিপিএমকে ভোট দিতেন কারণ, আমার বাবা ছিলেন সিপিএমের সমর্থক। বাবা প্রথম প্রথম মায়ের ভোট দিয়ে দিতেন। তারপরে মায়ের মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল, সিপিএমকেই ভোট দিতে হবে। আমাদের গ্রামেও এটা ছিল অলিখিত দস্তুর এবং  এখনও সেটা আছে। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমিও ওই ধারায় বিশ্বাস করতাম। কারণ সেই সংস্কৃতি আমাদেরও মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে প্রশ্নও ওঠেনি, মন প্রতিবাদও করেনি— কেন ভোটও স্বামীর ধর্ম হবে! ভোটকর্মী হিসেবে প্রতি নির্বাচনেই তাই দেখি, কী ভাবে মেয়েদের ভোটটা এ ভাবে লুট হয়ে যায়। সমাজবিজ্ঞানীরা কি জানেন গণতন্ত্রে এ ভাবে মেয়েদের ভোটাধিকার হরণের কথা? আমরা যাঁরা ভোটকর্মী তাঁরা প্রতি ভোটেই এই প্রহসন দেখি।
এ বার আমার বুথ ছিল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। একটি ঘরকে প্লাই দিয়ে ভাগ করে দু’টি বুথ করা হয়েছিল। দুই বুথে চার জন করে মোট আট জন ভোটকর্মী। ন’জন সিআরপিএফ। দু’জন কনস্টেবল। স্নান এবং শৌচ করার জন্য বরাদ্দ একটি বালতি আর একটি মগ। এক বছর স্কুল বন্ধ। শৌচাগারের অবস্থা অনুমেয়। গ্রামে কোনও মুদির দোকান নেই, চায়ের স্টল নেই। আমার তৃতীয় পোলিং অফিসার ব্যাঙ্ককর্মী। তাঁর ঘন ঘন চা খাওয়ার অভ্যাস। অনেকক্ষণ চা না পেয়ে মাঝপথে তিনি একবার বললেন, “চা না হলে আর পারা যাচ্ছে না।’’ খুব কষ্টে ওঁকে ম্যানেজ করা গেলেও শুরু হল সেই কম্পেনিয়ন ভোট নিয়ে ঝামেলা। বেশিরভাগ মহিলা নিজের ভোট নিজে দিতে চান না। সিআরপিএফ ও খুব কড়া। শুরু হল তর্ক। এক মহিলা সমানে বলে যাচ্ছিলেন, ‘‘আমার ভোট উই দিবে।’’ শেষতক আমি বললাম, ‘‘আপনি ফেসবুক করেন তো?” ওঁর স্বামী বললেন, ‘‘গুটা দিন ওই নি থাকে।’’ বললাম তা হলে আপনি ভোট দিতে পারবেন! শেষে সেই মহিলা নিজেই ভোট দিলেন।
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে নারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের ভূমিকা সত্যিই কত মহান! নারীবাদী বা শহুরে উচ্চ-মধ্যবিত্ত মহিলারা এ বিষয়ে তাঁদের মতামত বা থিসিস দিতেই পারেন। কিন্তু থিসিস দিয়ে জীবন-সম্পাদ্যের সমাধান হয় না। আমি বা আমার মতো যাঁরা গ্রামের বৃহৎ নির্বাচক ক্ষেত্রের সদস্য তাঁরা দেখেছি, গণতন্ত্রে মেয়েদের অধিকার বা ভূমিকা বিরাট অংশে শুধুমাত্র ভোটের লাইনে দাঁড়ানো মাত্র। মেয়েদের ভোটটা দিয়ে দেন তাঁর স্বামী বা ছেলে বা নাতি। অনেকক্ষেত্রে এজেন্ট। আমি ছাপ্পা মারার কথা বলছি না। আমার দেশের গণতন্ত্রে ছাপ্পা মারার প্রেক্ষাপট অনেক ভীতিপ্রদ। স্বামী বা ছেলে বা নাতি বা ভাইপো ভোটটা দিয়ে দিলে আমাদের দেশে ছাপ্পা বলে না। ভোটের কাজ করতে গিয়ে এই অবৈধ সাথী ভোটাররা (companion electorate) জ্বালিয়ে মারেন আমাদের।
শহরে ছবিটা অন্যরকম হয়তো। কিন্তু সেখানেও কি পুরুষদের প্রচ্ছন্ন প্রভাব থাকে না? শহরে বহু ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেই ভোট দিতে আসেন। স্ত্রীর ভোট দেওয়া হলে স্বামী ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞেস করেন। স্ত্রী ইশারায় জানিয়ে দেন, সব ঠিক আছে। আমরা যাঁরা প্রিসাইডিং অফিসার, তাঁরা এটাকে রিগিং বলে মনেই করি না। ইশারার থেকে জরবদস্তিও চলে গ্রামের বুথগুলিতে। আগের লোকসভা নির্বাচনে বেথুয়ার প্রত্যন্ত এলাকায় একটি বুথে একবার আমার সঙ্গে একজনের ঝগড়া বেধে গেল। বিএসএফ না থাকলে হয়তো আমাকে মারই খেতে হত। সেই একই ঘটনা। একজন ভদ্রলোক স্ত্রীকে নিয়ে ভোট দিতে এসেছেন। স্ত্রীর ভোটের পালা আসতেই স্বামী বললেন, ‘‘ওর ভোট আমি দেব।’’ আমি বাধা দেওয়ার পরেও সেই একই সুর, “এটাই নিয়ম! জীবনে ভোট কম দিলাম না। আজ আবার নিয়ম ভাঙছে!”
আমাদের প্রিসাইডিং অফিসারের ডায়েরিতে এটা লেখার কোনও প্রভিশন নেই। নির্বাচন কমিশনও বোধহয় এটা জানে এবং দস্তুর বলে মানে।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)
(ভোটের ডিউটিতে গিয়ে কেমন হল আপনার অভিজ্ঞতা, ৬০০-৭০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান এই মেলে— sadakalonewz@gmail.com। নির্বাচিত লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের নিউজ পোর্টালে (sadakalo.in)। সঙ্গে নিজের ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাতে ভুলবেন না)