গার্গী মণ্ডল

চাকরিতে যোগ দেওয়ার ঠিক এক বছরের মাথায় সেই দিল্লি কা লাড্ডুর চিঠি এল, ভোটের ডিউটি। ছোট থেকে বাবাকে দেখেছি, ভোটের ডিউটিতে যেতে। ভোটের আগে দু’দিন ট্রেনিং, ভোটের দু’দিন ডিউটি, সব মিলিয়ে বেশ কয়েকদিন ব্যাঙ্কের কাজের চাপ থেকে মুক্তি পাব বলে খুশিই হয়েছিলাম। থার্ড পোলিং অফিসারের কাজও তেমন চাপের নয়। যাইহোক, ডিউটি এল রিজার্ভে। কিন্তু ভোটের আগের দিন ডিসিতে গিয়ে একটা টিমে আমার ট্যাগিং হয়ে গেল। টিমের বাকি তিন জনের সঙ্গে আলাপ হল। সকলেই আমার সিনিয়র। সকলেই খুব ভাল, সবারই এটা প্রথম ডিউটি। ডিসি থেকে একসঙ্গে লাইন দিয়ে জিনিসপত্র নেওয়া, প্রচণ্ড রোদে পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে নিজেদের বুথে যাওয়ার বাস খোঁজা, কোন পুলিশ ট্যাগিং না হওয়ায় নিজেরাই সব জিনিসপত্র টেনে নিয়ে যাওয়া— এ সবের মধ্যে দিয়ে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে আমার সময় লাগল না।
বুথে পৌঁছে দেখলাম, চরম অব্যবস্থা। খাওয়ার জল নেই। বাথরুমেও জল, আলো নেই। ধুলোভর্তি ঘর। আবার সেই সদ্য গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব কাজে লাগল। সবাই মিলে হাত লাগিয়ে মোটামুটি একটা ব্যবস্থা করলাম। তারপরে বাড়ি থেকে আনা হালকা খাবার খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে শুরু হল কাজ। রাতে আমি বাইরের এক হোটেল থেকে খাবার আনলাম। টিমের বাকিরা শুকনো কিছু খাবার খেয়েই রাত কাটিয়ে দেবেন বলে ঠিক করলেন। কাজ সেরে ঠিক রাত ১১টায় আমরা শুয়ে পড়লাম। ঘুম আর হল না। ভোর ৩.২০ তে দেওয়া অ্যালার্মে চার জনেই উঠলাম। সব গুছিয়ে ঠিক ৫.৩০ নাগাদ মক-পোল শুরু হল। সেটা ভাল ভাবে মিটিয়ে ৭.১০ নাগাদ শুরু হল আসল ভোট। তখনই বাইরে লম্বা লাইন। ওই স্কুলে আরও তিনটে বুথ, সবার প্রায় ১০০০ মতো ভোটার। তাই বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকল, পাল্লা দিয়ে রোদ-গরমও।
ব্যাঙ্কে চাকরি করার সুবাদে এই লাইন দেখে খুব একটা ঘাবড়ে আমি যাইনি। কিন্তু টের পেলাম একটু পরে। খিদে পেয়েছে, কিন্তু খাওয়ার কোনও ব্যবস্থা নেই, উঠে খেতে যাওয়ারও পরিস্থিতি নেই। সঙ্গে থাকা কেক আর একটা বিস্কুট খেয়ে কাজ চালালাম। কালি রাখার কাপ আমাদের না দেওয়াতে বিশাল এক মগ এর মধ্যে কালিটা রেখেছিলাম এবং খুব অল্প সময়েই আমার ডান হাতের আঙুলগুলো কালিতে মাখামাখি হয়ে গেল। ওহ, বলা হয়নি! আগেরদিন ডিসিতে জিনিসপত্র নেওয়ার সময় বাঁ হাতে কার্বলিক অ্যাসিড পড়ে সে এক কাণ্ড হয়েছিল। আপাতত আহত দুই হাত আর পেটে খিদে নিয়ে সারাদিন কাজ করতে হল। দুপুরে খাবারের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় আবার একটি কেক খেলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় যখন ভোট শেষ হল তখন শরীর আর পেরে উঠছে না। খিদে, ক্লান্তি সব মিলিয়ে শোচনীয় অবস্থা আমার। কাজের চাপে আমার টিমের বাকি কারও যেন খিদে, জলতেষ্টা কিছুই পায়নি। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত তাঁরা কিছু না খেয়ে, একবারও জায়গা থেকে না উঠে কী ভাবে কাজ করলেন তা দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা নেই। এ দিকে আমার তো খিদের চোটে অবস্থা খারাপ। কোনও রকমে একজনকে দিয়ে ডিম টোস্ট আনিয়ে খেলাম। টিমের বাকিরা যথারীতি খেলেন না। জানালেন, সঠিক ভাবে সব জমা দিয়ে তারপরেই তাঁরা খাবেন। কুর্নিশ তাঁদের ডেডিকেশানকে। সবকিছু গুছিয়ে আরসিতে ভালোভাবে জমা দেওয়া হল। এ বার মনে পড়ল, আমি তো একা নই, আমার আশেপাশে অদৃশ্য ভাবে ঘুরছে করোনার রক্তচক্ষু। যদিও আশেপাশের ভিড় দেখে তা বোঝার উপায় নেই। অবশেষে রাত সাড়ে ১১টায় বাড়ি ফিরলাম।
জীবনের প্রথম ভোটের ডিউটি। তাও আবার এই করোনার মধ্যে। ভাল-মন্দ মিশিয়ে একটা অভিজ্ঞতা। সবাই মিলে একজোট হয়ে, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজটা করতে পেরেছি, এটাই ভালোলাগা। হাজার খারাপ লাগার মধ্যেও একটা বড় ভাললাগা হল, এত বড় একটা কর্মযুদ্ধে নিজেকে শামিল করে কাজটা সুষ্ঠু ভাবে করতে পারা।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)
(ভোটের ডিউটিতে গিয়ে কেমন হল আপনার অভিজ্ঞতা, ৬০০-৭০০ শব্দের মধ্যে লিখে পাঠান এই মেলে— sadakalonewz@gmail.com। নির্বাচিত লেখা প্রকাশিত হবে আমাদের নিউজ পোর্টালে (sadakalo.in)। সঙ্গে নিজের ছবি ও ফোন নম্বর পাঠাতে ভুলবেন না)