স্বাতী মিত্র

প্রথম যেদিন জানতে পারলাম আমার ভোটের ডিউটি এসেছে প্রিসাইডিং অফিসার হিসাবে, গর্বে মনটা ভরে গিয়েছিল। একবারও মনে হয়নি নাম কাটাব। আমার স্কুলের আর এক কাছের শিক্ষিকা, মঞ্জুরও একই সঙ্গে এসেছিল ভোটের চিঠি। আমারই মতো মঞ্জুও ছিল নাম কাটানোর বিপক্ষে।
প্রথম ট্রেনিংয়ে বিডিও যখন বললেন, ভোটের দিন প্রিসাইডিং অফিসার হলেন তাঁর বুথের ম্যাজিস্ট্রেট, শুনে ভীষণ আনন্দ হল। এরপর শুরু হল প্রস্তুতি। ইউটিউবে ভোটের কাজ সংক্রান্ত নানা ভিডিয়ো দেখে, সহকর্মী অভিজ্ঞ দাদাদের (একজনের কথা একটু বেশিই বলতে হবে, তিনি রণজিৎ রায়) নানা সাহায্য নিয়ে আমি আর মঞ্জু নিজেদের তৈরি করতে লাগলাম।
প্রস্তুতিপর্ব চলছে, এল থার্ড ট্রেনিংয়ের চিঠি। সে চিঠি পেয়ে আমার মনখারাপ হয়ে গেল। দেখলাম আমাকে ‘রিজার্ভ’ প্রিসাইডিং অফিসার করা হয়েছে। তখনই আমি মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, রিজার্ভ থাকব না। ডিউটি নেব। আমার ভোটের ডিউটি ছিল ২৬ এপ্রিল। বেরোতে হল আগের দিন সকালে। মনে যে একটু টেনশন ছিল না, তা বলব না। বাড়ির সবাই, মানে বাবা, মা, ছেলে সবাই দেখলাম বেশ চিন্তিত। মাকে এই ভূমিকায় ছেলে দেখেনি আগে। ভোট নেওয়া যে বেশ কঠিন কাজ তা বোঝার মতো বড়ও হয়েছে। করুণ মুখে শুধোল, ‘তুমি কখন আসবে মা?’ এর উত্তর অজানা। যাইহোক সবাইকে আশ্বস্ত করে কর্তার বাইকে চেপে ডিসিতে চলে এলাম।
আমার ডিসি লালবাগ নবাব বাহাদুর স্কুল। সেখানে গিয়ে দেখি জনসমুদ্র। রিজার্ভ সেলে গিয়ে বসলাম। এখানে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে আমিই কিছুটা ব্যতিক্রমী। ডিউটি করতে আগ্রহী। ডিউটি পেয়েও গেলাম সামান্য চেষ্টায়। ১০৮ এ বাহাদুরপুর হাই স্কুল বুথে প্রিসাইডিং অফিসার নেই। এই দলের সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন কর্তৃপক্ষ। এই দলের ফার্স্ট পোলিং অফিসার আবার আমার ছাত্রী। চেনা মানুষ পেয়ে ভাল লাগল। জিনিসপত্র ডিসি থেকে তুলে নিয়ে বসে গেলাম লিস্ট ধরে মেলাতে।
৪টের সময় আমাদের বাস নিয়ে এল বুথে। সঙ্গে আরও তিনটে পার্টি। এবং অবশ্যই মেয়েদের। আমাদের বাসটা যখন গ্রামে ঢুকছে, গ্রামবাসী অবাক হয়ে আমাদের দেখছিল। মহিলা বুথ ওদের অভিজ্ঞতাতেও প্রথম। বুথে ঢোকা মাত্রই সেন্ট্রাল ফোর্সের ইনচার্জ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিদিরা দেখা করে গেলেন। আমার দলের অন্য অফিসারেরা খুবই ভাল। সবচেয়ে যেটা অবাক করার মতো বিষয়, আমার থার্ড পোলিং অফিসার তাঁর চোদ্দো মাসের বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন ভোটের ডিউটিতে। ইলেকশন কমিশনের কাছে দরবার করেও তিনি ডিউটি থেকে রেহাই পাননি।
একটু ফ্রেশ হয়ে সবাই বসে গেলাম কাজ সারতে। আমাকে সবাই ম্যাডামের আসনে বসিয়ে দিয়েছেন। আমি সবাইকে নিজের নিজের কাজ বুঝিয়ে দিলাম। সন্তান কোলেই থার্ড পোলিং তাঁর সব কাজ সেরে নিলেন। বুথ তৈরি করার মুখে সেক্টর অফিসার এসে নিজেই বুথ সাজিয়ে দিলেন। এরপর আমাদের নিয়ে পুরো ভোট পর্বে কী কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, ‘কোনও সমস্যা হলে ভয় পাবেন না, আমি আছি।’
কিছু কাজ তখনও বাকি। বসে গেলাম সারতে। দেড়টা অব্দি চলল কাজকর্ম। এরপর ঘুমের আয়োজন। চোখের পাতা কিছুক্ষণের জন্যই বন্ধ হল। ৪টের সময় উঠে স্নানটান সেরে মক-পোলের প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। এজেন্টরা খুবই ভাল। নির্বিঘ্নে মিটল মক-পোল পর্ব। ৭-১৫ নাগাদ শুরু হল আসল ভোট। খুবই শান্তিপূর্ণ ভাবে চলল ভোটদান। সাড়ে ৬টায় পোল ক্লোজড করে শুরু হল সিলিং ও অন্য কাগজপত্র সারার কাজ।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে আমাদের চারটে টিম পৌঁছল রিসিভিং সেন্টারে। সেক্টার অফিসার সমস্যা হলে পাশে থাকবেন বলেছিলেন। কথাটা যে কথার কথা ছিল না, সারা দিন তাঁর অকুণ্ঠ সহযোগিতাতেই বুঝেছি। জিনিসপত্র জমা দেওয়ার সময়েও তিনি আমাদের সহযোগিতা করলেন। সব ভাল ভাবে মিটে যাওয়ায় স্বস্তির শ্বাস ফেললাম। বুঝলাম, ভোট সত্যিই একটা বড় অভিজ্ঞতা। না এলে বুঝতামই না। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দিদিরা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা সবাই অত্যন্ত আন্তরিকভাবে পাশে থেকেছেন। নিজের নিজের দায়িত্ব সুচারু ভাবে পালন করেছেন। আর সেক্টর অফিসারের সহযোগিতা তো তুলনাহীন।
ভোটের কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরে আনন্দ ও গর্ব হচ্ছিল। মেয়েরা কোনও কাজেই এখন পিছপা নয়, নিজের দিক থেকে প্রমাণ করার ছিল। পেরেছি। ভাল লাগছিল খুব। কর্তা নিতে এসেছিলেন। এ বার বাড়ি ফেরার জন্য উঠে বসলাম তাঁর বাইকের পিছনে।
(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)