নিবেদিতা প্রামাণিক

ভোট-প্রক্রিয়া নিয়ে বুকের মধ্যে চাপা টেনশন আর উদ্বেগকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লাম ১৬ এপ্রিল সকালে। কারণ, ভোটের ডিউটি ছিল ১৭ এপ্রিল। আমি ও তিন সহকর্মী এক গাড়িতে ডিসিআরসি, সোদপুর গুরু নানক ডেণ্টাল কলেজে পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে জনসমাগম দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ! এ বার দোসর হল ভয়। কোভিড বিধি তো শিকেয়। ভিড়ে ঠাসা লাইনে দাঁড়িয়ে জিনিসপত্র নিতে হচ্ছে। আমরা চার জনেই জিনিসপত্র নিয়ে মাঠে বসে চেকলিস্ট ধরে মেলাতে লাগলাম। তখনই দেখা গেল, বুথের ভোটার তালিকার কোনও কপিই আমরা পাইনি। এই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি ছাড়াও আমরা সব ধরনের পেপার সিল, এএসডি লিস্ট, টেন্ডার ব‍্যালটও পাইনি।
কাউন্টারে ব‍্যাপারটা জানানো হলে সেখান থেকে বলা হল, সেক্টর অফিসার বুথে গিয়ে দিয়ে আসবেন। ঘটনাচক্রে সেই সময় থার্ড পোলিং অফিসার রূপালীদির মোবাইলে একটি ফোন আসে যে, আমাদের ১৬৭ নম্বর বুথের ইলেক্টোরাল রোল তার এক সহকর্মীর টিমের সঙ্গে চলে গিয়েছে। আমাদের ফার্স্ট পোলিং অফিসার শর্মিতা অনেক ফোনাফুনি, অনেক খোঁজাখুঁজির পর সেগুলো উদ্ধার করে আনে। সেই সময় প্রচণ্ড গরমে হঠাৎ করে আকাশ থেকেও যেন কয়েক ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ল। আমরা তখন পাততাড়ি গুটিয়ে মাঠ থেকে হস্টেলের বারান্দায় গিয়ে বসে সবেমাত্র কাগজপত্রের কাজ শুরু করেছি, সেই সময় আবির্ভূত হলেন হস্টেলের নিরাপত্তারক্ষী। তিনি আমাদের তাড়িয়ে দিতে উদ‍্যত হলে অনেক অনুনয় করে দশ মিনিট সময় চাওয়া হল। ততক্ষণে বৃষ্টি উধাও, আমরাও ভোটের জিনিসপত্র আর নিজেদের লোটাকম্বল নিয়ে র‌ওনা দিলাম বাসের দিকে। ওই বাসে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন আরও দুই পোলিং পার্টির লোকজন। এ প্রসঙ্গে বলি ডিসিআরসিতে আমাদের কিছুটা সঙ্গ দিয়ে গাইড করেছেন আমার প্রাক্তন সহকর্মী ও বর্তমান গৃহকর্মী বন্ধু (যিনি কিনা আমার দাদার‌ও বন্ধু) রাজীব পাত্র।
সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ বুথে পৌঁছে একটু ফ্রেশ হয়ে আমি, শর্মিতা, সুদেষ্ণাদি ও রূপালীদি মেঝেতে একটা ম‍্যাট পেতে কাগজপত্র নিয়ে বসে গেলাম। রূপালীদি আবার ওই স্কুলের‌ই শিক্ষিকা। রাতে ওই স্কুলের দারোয়ানজি সুবেশদা আমাদের ‘ডিম্ভাত’-এর ব‍্যবস্থা করে দিলেন। খাওয়াদাওয়া সেরে নিয়ে আমরা প্রায় রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করলাম। তারপর দু’জন বেঞ্চে, আর দু’জন মেঝেতে শোওয়ার পরে মশার ধূপ, রোল-অন সব কিছুকেই হারিয়ে দিয়ে মশাবাহিনী যৌথ ভাবে আক্রমণ করল। তখন শর্মিতার ব‍্যাগ থেকে টেনে বার করা হল একটা বিরাট বড় মশারি। কেউ কারও পূর্ব পরিচিত নয়, অথচ মশাদের অত‍্যাচারে সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করে আমরা এক মশারিতে ঢুকতে বাধ্য হলাম। এ বার চোখ বন্ধ করে ঘুমোনোর চেষ্টা করছি। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে ভোর সাড়ে ৫টায় মক-পোল, অথচ এখনও পর্যন্ত কোনও পেপার সিল পেলাম না। ঠিক সময়ে ভোট শুরু করতে না পারলে লোকজনের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হবে না তো ?
হঠাৎ দরজায় আওয়াজ। দরজা খুলে দেখা গেল সেক্টর অফিসার এসেছেন পেপার সিল দিতে। সে সব সিল আমরা সেক্টর অফিসারের কাছ থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিলাম। সবকিছু মিলিয়ে নিয়ে, স‌ইসাবুদ করে রাত আড়াইটে নাগাদ শুতে গেলাম। সবে ঘুমটা একটু গাঢ় হয়েছে, অমনি হুড়মুড় করে কিছু ভেঙে পড়ার আওয়াজে আমরা চার জনেই মশারির মধ্যে উঠে বসে পড়লাম। ঘরে আলো জ্বালিয়ে দেখা গেল, ওয়েব কাস্টিং এর ক‍্যামেরা দেওয়াল থেকে খুলে পড়েছে।
তারপরে আর ঘুম হল না। ভোর ৫টা থেকে পোলিং এজেন্টরা আসতে শুরু করলেন। সাড়ে ৫টায় মকপোল শুরু হল। এবং মকপোল শেষে সমস্ত মেশিন সিলিং করে ভোট শুরু হল ঠিক ৭টায়। এরপর নির্বিঘ্নেই ভোট চলতে থাকল। শুধু কয়েকজন কোনও প্রমাণপত্র ছাড়া ভোট দিতে এসেছিলেন। তাঁদের আশাহত হয়ে ফিরে যেতে হল। ভোট চলাকালীন ফর্ম ফিল-আপের পাশাপাশি আমাকে পোলিং এজেন্টদের স‌ই করাতে হয়েছে অনেক ফর্মে। একজন এজেন্ট তো সহাস্যে বললেন, ‘‘ম‍্যাডাম, অমিতাভ বচ্চনকেও এত অটোগ্রাফ দিতে হয় না।’’ তাঁর কথায় সকলেই হেসে ফেললাম। ভোটের দিন আমাদের শুধু কয়েকবার চা খেয়েই কেটেছে। অবশেষে বেলা ৩টের পরে বুথের লাইন একটু ফাঁকা হলে সুবেশদার দেওয়া মাছের ঝোল ভাত খেয়ে মনে হল ‘বিকেলে ভোরের ফুল’।
তেরো ঘণ্টা দড়ি টানাটানির পরে অবশেষে সাড়ে ৬টায় ভোট শেষ হল। বুথের মোট ভোটার ৭২৪। ভোট পড়েছিল ৫৮৫। ভোট চলাকালীন দু’ঘণ্টা অন্তর মেসেজ পাঠাতে হয়েছে। মেশিন ক্লোজ করে, গালা সিল করে এজেন্টদের ১৭সি ফর্ম দেওয়া হল। আমরা সাড়ে ৭টায় পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু পাশের বুথের এক পোলিং পার্টি  ভিভিপ্যাটের ব‍্যাটারি খুলতে না পারায় আমাদের আরসিতে ফিরতে দেরি হল। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে তবেই পুলিশ বুথ ছাড়বে। আরসিতে ফিরতে প্রায় রাত ১০টা বাজল। এত জিনিসপত্র নিয়ে বাস আমাদের প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢেলে দিয়েছিল। সবকিছু জমা করতে করতে রাত ১১টা। সবশেষে দেখি আরসিতে আমার জন্য অপেক্ষমান আমার রুমমেট রাজীব আর বাড়িতে আমার এগারো বছরের যমজ মেয়েরা। কোভিডের প্রোটোকল মেনে নিয়েও ভয়ে ভয়ে যখন ক্লান্ত, অবসন্ন মন নিয়ে চৌকাঠে পা রাখলাম ঘড়ির কাঁটা তখন ১২টার দিকে হাত বাড়িয়েছে।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)