কৌশিক গুড়িয়া

গুবলুর দাদু এ বছর বিরাশিতে পা দিলেন। কিন্তু এই দু’দিন তাঁর চোখেও যেন ঘুম নেই, এ বই সে বইয়ের পাতা উল্টে কী যেন খুঁজছেন তিনি। যেন এ বয়সে আবারও মাধ্যমিকে বসবেন! আসলে গুবলুই যত নষ্টের আগা, আর নষ্টের গোড়া হলেন তার ইংলিশ টিচার। বসে বসে মাইনে পেলে যা হয় আরকী। মাস্টারের মাথায় বুদ্ধি চেপেছে, আর ওমনি ওই অনলাইন না ফনলাইন কী সব ক্লাস হয় না, সেখানে বসেই দশ-বারোটা নতুন শব্দের মানে লেখার হোম-ওয়ার্ক দিয়ে বসলেন। শব্দগুলো নবীন, শব্দগুলো যেন পাড়ায় নতুন আসা ভাড়াটের মতো! যেন মুখচেনা, অথচ ভোটার লিস্টে নাম ওঠেনি। সে শব্দের আধার হয়নি এখনও, সেও যেন রেশন কার্ডের লাইনে সদ্য নাম লিখিয়েছে …

আর বলা বাহুল্য, প্রথমেই হোঁচট। দাদুর উপর ভার পড়েছে নাতির হোম-ওয়ার্ক সামলানোর। যেখানে প্রথম শব্দটিই হলো হার্ড ইমিউনিটি। দাদু তাঁর ছাত্রজীবনে কেনা ওয়েবস্টার সেভেন্ত্ নিউ কলেজিয়েট ডিক্সনারির পাতা উল্টে ক্ষান্ত হলেন। হয়তো আলগোছে অভিধানের মুচমুচে হয়ে যাওয়া পাতা খসে পড়লো খানিক, কিন্তু হার্ড ইমিউনিটির সংজ্ঞা মিললো কই? আসলে হার্ড মানে যে শক্ত বা কঠিন নয়, হার্ড কথার অর্থ যে হীনবুদ্ধি-পশুদল! যে গবাদি পশুদের ক্ষুরময়তা থাকতেই হবে। সে ভাবনাতেই ছিল গলদ। এ যাত্রায় ডিক্সনারি, দাদু ও নাতিকে উদ্ধার করতে না পারলেও স্মৃতি সেই প্রবীণকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ফেলে আসা যৌবনের মাঠে। অভিধানের শেষ পাতায় আটকে গেলেন তিনি, দেখলেন ১৯. ১০. ৭১ তারিখে ঠিক ১২ টা ৪ মিনিটে কেনা হয়েছিল বইটি। দাশগুপ্ত থেকে। অতিমারির আবহে প্রাসঙ্গিক একটি শব্দের শেকড়েও যে ইতিহাস লেগে থাকে কোভিড তা জানান দিতে ছাড়ে না।

বুড়ো ওয়েবস্টার অবশ্য কন্টেনমেন্ট বা কোয়রান্টিনের মানে বলে দিল সহজেই। আভাস দিল সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং কথাটির। কিন্তু পায়রার খোপের মতো সংসারে যেখানে মাসি-পিসির সঙ্গেও কেবল বৎসরান্তে ফোনেই দেখা হয়, সেখানে আর নাই বা বাড়ালাম দূরত্ব। কোভিড কি তবে সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং এর নামে মানসিক দূরত্বের ষড়যন্ত্রী হয়ে উঠতে চায়! এ সবই সাদাকালো সত্যি আমাদের!

দাদু ধন্দে পড়লেন লক ডাউন কথাটির মানে উদ্ধার করতে গিয়ে। এতদিন চটকলের লক আউট শুনেছেন। সুমন থেকে অঞ্জন গিটার ধরেছেন শ্রমিকদের ছেঁড়া-কাঁথার-স্বপ্নে, কিন্তু লক ডাউন যে আনকোরা শব্দ! আসলে এর জন্ম উত্তর আমেরিকায়। বেয়াড়া প্রজাকে কোমল-গান্ধারে মানিয়ে আনার জন্যেই তাকে সেলে পুরে দেওয়ার প্রথাই লক ডাউন। এখন যেমন আমাদের…। কিন্তু প্রশ্ন হল, কে তবে বেয়াড়া? হোমো স্যাপিয়েন্স নাকি করোনা! এমন লক ডাউনে অত্যাবশকীয় হয়ে ওঠে স্যানিটাইজ়ার ও মাস্ক। যদিও স্যানিটাইজ়ার কেবল হাত-শুদ্ধি হয়েই বাজিমাত করেছে আজ। চিন্তা-শুদ্ধিতে তার তেমন কোনও হাত নেই। তাই কি আমাদের সমস্ত অপারগতাই পক্ষান্তরে মুখ লুকোচ্ছে মুখোশের আড়ালে? হ্যাঁ, তাই। তাকেই আমরা মাস্ক বলে ডাকি, এককালে যে ছিল গরুর মুখে জালতি হয়ে! সেই আজ তিন-স্তরে পুজোর ফ্যাশন।

ততক্ষণে নাতি আবারও অনলাইন ক্লাসে বসে গিয়েছে, আর তার মা বসেছে ওয়েব-সিরিজে। আচ্ছা অনলাইন মানে তো লাইনে থাকা, তবে নিউ নরম্যাল পাঠশালায় সবাইকেই নাকি লাইনে থাকতেই হয়। তারাপদ রায় মনে হয় সে কথা জানতেন, তাই সেই কবে লিখেছিলেন, ‘লাইনেই ছিলাম দাদা’। ওয়েব মানে তো ঢেউ, তারও সিরিজ হয়! তবে কি দিঘায় গিয়ে পা ডুবিয়ে ঢেউ গোনার কথা চলছে? আরে না না, রাজনীতির পাপ্পুদাও জানেন, পর্যটনের দিন নয় অদ্য। কেননা তিনি জানেন, প্যান্ডেমিক পরিবেশে মাইগ্রেশন চলে না। তবে বোঝেন না, মাইগ্র্যান্ট লেবারদের বাড়ি ফেরাই একমাত্র সুরাহা নয়, পেটের সুরাহা করে ভিন্ রাজ্যের রোজগার। বোঝেন না, তুমি-আমি শুধু নয়, পিঁপড়ে থেকে পাখি সকলেই পরিযায়ী ! আর ডাক্তারবাবুরা বোঝেন কো-মর্বিডিটি ভাইরাল লোডের ঝুঁকি বাড়ায়।

সুতরাং, নাতির নোটবুক শেষ পর্যন্ত অনেক নতুন শব্দের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে দূর-নিয়ন্ত্রিত হোমওয়ার্ক। যেমন দূর-নিয়ন্ত্রিত সেমিনারের আদল তৈরি করে ওয়েবিনার। তবে এ কথা ঠিক যে, এমন সব নবীন-শব্দের অনেকেই এখনও বসত করে উঠতে পারেনি ডিক্সনারির পাতায়। যদি সে বসত করেও উঠে, ডিক্সনারি কি আবারও ক্রয়যোগ্য হবে আমাদের। কোনও দিন না, ডিক্সনারি আজ বাতিল পুস্তক। কারণ গুগল সব জানে। যেমন হৃদস্পন্দন মাপতে জানে অক্সিমিটার। যেমন তাপমাত্রা মাপতে জানে থার্মাল গান। তবে থার্মাল গান কতজনের করোনা ধরতে পেরেছে সে তথ্য পাওয়া যায় না…!

ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া।