ড. দেবযানী ভৌমিক চক্রবর্তী

‘গণতন্ত্রের মহোৎসবে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আমি ধন্য’— এ জাতীয় কোনও বিগলিত বক্তব্য প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না৷ কারণ, মহিলাদের ডিউটি করার মতো উপযুক্ত পরিকাঠামোটাই যেখানে নেই সেখানে দু’দিনের নিদারুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে সে কথা আর বলি কী করে! আমার ডিউটি ছিল ২৬ এপ্রিল ২০২১, রবিবার৷ স্থান মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জের রাজা বিজয় সিং বিদ্যামন্দির৷ ভোটের আগের দিন, অর্থাৎ ২৫ তারিখ থেকেই আমাদের চার জনের দলের কাজকর্ম শুরু হয়ে গেল৷
২৫ এপ্রিল সকাল ১০টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মুর্শিদাবাদের ‘সুভাষচন্দ্র বোস সেন্টেনারি কলেজ’-এ৷ আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টার (ডিসি) সেটাই৷ সেখানে গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যেই ভিভিপ্যাট, কন্ট্রোল ইউনিট, ব্যালটিং ইউনিট ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম-সহ দু’টি ব্যাগ সংগ্রহ করলাম৷ তারপর সেই ভিড়ে একে অপরের গা ঘেঁষে বসে তালিকা অনুযায়ী সব মেলাতে বসলাম৷ আমাকে প্রভূত সহায়তা করলেন আমার প্রথম পোলিং অফিসার অতসী সরকার৷ তিনি একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা৷ এ বার আমাদের বুথে আসার পালা৷ শুরু হল বাস-সন্ধান৷ আমাদের জন্য নির্দিষ্ট সেক্টর অফিসার কোভিড আক্রান্ত হওয়ায়, আর একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে৷ তাঁকে ফোন করে করে আমরা প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের মহাযুদ্ধ শেষে সেই ৪ নম্বর বাসের সন্ধান পেলাম৷ নিজেদের সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় লটবহর-সহ ওই সব নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে রোদে রোদে ঘুরে ইতিমধ্যেই আমরা ক্লান্ত৷ আমার তো ব্যথার ওষুধ খেয়েও অসম্ভব মাইগ্রেন শুরু হয়ে গেল৷ বাসে উঠে বসলাম৷ সেখানেও বেশ চাপাচাপি ভিড়৷ বড় বাস তাই ঘুরে ঘুরে গেল, জ্যাম হবে না হলে৷ পৌঁছনো গেলো বুথে৷ সেখানে ১ নম্বর ঘরটিই আমাদের জন্য বরাদ্দ৷
সারাদিনে প্রায় না খাওয়া, তার উপর বাস খুঁজে পেতে এত সময় লাগা, ফলে প্রখর রোদের তাপ লেগে তখন আর বসার মতো অবস্থা ছিল না আমাদের। কিন্তু অনেক কাজ বাকি যে৷ যেগুলো সেরে না রাখলে পরের দিন অসুবিধে৷ এ বার আমাদের স্নানাগার খোঁজা শুরু হল৷ দেখা গেল, সেটি আমাদের ঘর থেকে বেশ অনেকটা দূরে, জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশে৷ সেই পোলিং স্টেশনে ছ’টি মহিলা বুথ, কাজেই চব্বিশ জন মহিলা সেটি ব্যবহার করবেন৷ আবার মিলিটারি জওয়ানেরাও সেটিই ব্যবহার করবেন৷ তাঁদের সংখ্যাটিও নিতান্ত কম নয়! কাজেই কোনওক্রমে একটু হাতে মুখে জল দিয়ে, ফ্রেশ হতে হতেই বুঝলাম বাইরে বিশাল লাইন৷ এমনকি সেখানে আলোর ব্যবস্থাও ঠিকঠাক নেই৷ এবার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদেরকে দু’দিন আমরা রাতের ও দুপুরের খাবার-সহ কত বার চা-ইত্যাদি খাব সেটা জানিয়ে দিলাম৷ প্রিসাইডিং হিসেবে অন্য তিন জনের দায়িত্বও আমিই নিলাম৷ তারপর চা খেয়েই আমরা কাজে লেগে পড়লাম৷
সেই রাতে বেশ কিছু কাজ এগিয়ে তো রাখব, কিন্তু মূল যে বিষয়টি অর্থাৎ স্পেশ্যাল বুকলেটটিই আমাদের দেওয়া হয়নি৷ যার মধ্যে ১৭ এ বুকলেটটি অত্যন্ত জরুরি৷ ডিসি থেকেই আমি এ বিষয়ে খুব উদ্বিগ্ন ছিলাম৷ ওখান থেকেই জানানো হল যে, যা যা লাগবে লিখে দিলে ওঁরা পরে পাঠিয়ে দেবেন৷ রাত বাড়তে থাকায় সেক্টর অফিসারকে ফোন করলাম, বেশ কয়েকবার ফোন করার পরে তিনি দিয়ে গেলেন প্রয়োজনীয় বুকলেট ইত্যাদি৷ রাত ২টোয় অপরিচ্ছন্ন ঘরের মেঝেতেই চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম৷ কিন্তু ৪টেয় উঠতে হবে, কাজেই শোওয়ার সময় থেকেই মাথার ভেতর যেন অ্যালার্মের ঘণ্টি বাজতে থাকল৷ ঘুম আর কোনওভাবেই এল না৷
৪টেয় উঠে চানঘরের পথে যেতেই দেখি এক দীর্ঘ লাইন৷ অনেকক্ষণ ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে ৫টা নাগাদ সুযোগ পেলাম স্নানাগারে প্রবেশের! অন্ধকারে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না৷ ওখান থেকে প্রস্থান করে নিজের আন্দাজশক্তিকে কুর্নিশ করলাম৷ সাড়ে ৫টায় মেশিনগুলো ঠিকঠাক জুড়ে নিয়ে মক-পোল শুরু করা গেল৷ এজেন্টদের সঙ্গে নিয়ে নির্বিঘ্নে সেটিও সম্পন্ন হল৷ বিপদ হল, যখন কোনও একজনের ভুলে আমাদের কন্ট্রোল ইউনিটটি বিপ বিপ করতে শুরু করল৷ অনভিজ্ঞ আমি, কী করব ভেবে মরছি! তার উপর প্রবল মাইগ্রেনের ব্যথা৷ অগত্যা সেক্টর অফিসারের দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোককে ফোন করলাম৷ তিনি তো বললেন, ‘আপনাদের ট্রেনিংয়েই তো সব বলে দেওয়া হয়েছে, আমাকে সব সময় ডাকলে কী করে হবে?’’ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ পরে ১৭ এ -তে তাঁকে সই করাতে গিয়েই টের পেলাম তাঁর পরিস্থিতি! সেখানে কিছু ওঁর মতামত লিখতে হত, সেখানেও তিনি বললেন আমাকেই লিখে নিতে৷ আমি ঠিক বুঝলাম না, ওঁরা কি তাহলে বিনা ট্রেনিংয়েই এইসব বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশিত হয়েছেন!
পুরো ভোটগ্রহণ পর্বে যে আমি সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে পেরেছি সেটি যাঁর জন্য তিনি সমীরণ চৌধুরী, ফিশারি এক্সটেনশন অফিসার৷ আমাদের প্রথম দিনের ট্রেনার ছিলেন তিনি৷ অল্পবয়সী সৌম্য এই মানুষটি প্রথম দিনই আমাদের সবাইকে তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, যে কোনও সমস্যায় তাঁকে যেন আমরা ফোন বা টেক্সট করি৷ সত্যিই তাঁর ধৈর্য দেখে আমার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এসেছিল৷ মেশিনের বিপ বিপ বন্ধ করা থেকে শুরু করে, আরও বেশ কিছু তাৎক্ষণিক সমস্যায় আমি তাঁকে মরিয়া হয়ে ফোন করেছি৷ নিজে কোভিড আক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে আসতে পারছিলেন না৷ কিন্তু ফোনে আমাকে প্রতি মুহূর্তে  সঠিক পরামর্শ দিয়ে আমার সমস্যার সমাধান করে গিয়েছেন৷ পরে শুনেছি, তাঁকে আরও অনেকেই এভাবে ফোন করেছেন৷ অথচ একটি বারের জন্যও তিনি বিরক্ত হননি৷
সব পোলিং অফিসার ও এজেন্টদের সহযোগিতায় ভোটগ্রহণ পর্ব শেষে রাত ৯টা নাগাদ আমরা নির্দিষ্ট বাসে আরসি-র উদ্দেশে রওনা দিলাম৷ আগের দিন বিনিদ্র রাত্রি, তারপর ভোট চলাকালীন প্রতি মুহূর্তে উৎকণ্ঠা, ফলে বাসে উঠে সব লটবহর নিয়ে আমাদের প্রায় নাভিশ্বাস দশা৷ আরসি-তে ঢোকার মুখে দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকা অবস্থায়, নিজের শরীরটাকেই  মনে হচ্ছিল বোঝা৷ যেন তাকে টেনে নিয়ে যাওয়াই কঠিন! অবশেষে পৌঁছনো গেল৷ সবারই তখন তাড়া৷ কাজেই মুহূর্তে বাস ফাঁকা করে সবাই নেমে গেলেন৷ আমার সঙ্গে থাকা তিনটি ব্যাগ ও ভিভিপ্যাট নিয়ে আমি বেশ হিমশিম খেয়ে গেলাম৷ তার উপর শরীর খুবই খারাপ৷ আরসিতে গিয়ে সবকিছু গুছিয়ে জমা করলাম লাইনে দাঁড়িয়ে৷ কৃষ্ণনগরে ফেরার ট্রেনে রিজার্ভেশন করা ছিল, সৌভাগ্যক্রমে রাত ১০.৫২-র সেই ট্রেনটি পেয়ে গেলাম মূলত ছাত্র সাদ্দাম হোসেনের সৌজন্যে। মুর্শিদাবাদ স্টেশনে ওর মোটরসাইকেলে দ্রুত পৌঁছে দিয়ে গেল তাই৷ আর এক ছাত্র নিজামউদ্দিন শেখের কথাও না বললেই হবে না৷ আমার বাড়ি কৃষ্ণনগর৷ অথচ ভোটের ডিউটি মুর্শিদাবাদে৷ কাজেই রাতে কী ভাবে ফিরব? ফিরতে না পারলে কোথায় থাকব? এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম থেকেই খুবই চিন্তা করেছে নিজাম৷ ও একজন প্রতিশ্রুতিবান সাংবাদিক৷ ওর আন্তরিক ব্যবহার সবসময়ই আমাকে মুগ্ধ করে৷ ও-ই বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার ট্রেন ধরা বা ট্রেন ধরতে না পারলে কোথায় থাকব, এ সব ব্যবস্থা করে৷ আর এক ছাত্র সৈকত সাহা ও ছাত্রী নবনীতা খাঁ-ও আমাকে নিয়ে অনেক ভেবেছে৷ সত্যিই শিক্ষয়িত্রীজীবনে এগুলোই বড় প্রাপ্তি৷ ছাত্রছাত্রীদের কাছে আমি দিদি, আর সেটাই আমার বড় অর্জন৷
আমার সহকর্মী অধ্যাপক ববিন পট্টনায়কও আমাকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন৷ মাঝে মাঝেই ফোনে খোঁজ নিয়েছেন, “কী রে তোর কাজ হল? কিছু খেয়েছিস?” বর্ষীয়ান অধ্যাপক সুকুমার মালও আমার খোঁজ নিলেন৷ আরও অনেক আত্মীয়-বন্ধু সেই সময় আন্তরিকভাবে ফোনে খোঁজ নিয়েছেন৷ সত্যিই সকলের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা৷ কারণ তাঁদের জন্যই আমি মানসিক জোরটুকু পেয়েছি৷ আমরা তো আমাদের কাজ সুষ্ঠুভাবে পালন করলাম৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, উপযুক্ত পরিকাঠামোর ব্যবস্থা না করেই মেয়েদের এ ভাবে ভোটের ডিউটি দেওয়াটা কি যুক্তিযুক্ত? মেয়েদের যে স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সে সময় অনেক মেয়েরই খুব সমস্যা হয়৷ তখন তাঁদের পক্ষে ওই সব বোঝা বহন করে কাজ করা তো সহজ নয়৷ তার উপর টয়লেট যদি অত দূরে হয়! তাও আবার জওয়ানদের সঙ্গে একই সঙ্গে ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়া! অর্থাৎ এত জন মানুষ একসঙ্গে৷ ইউরিন সংক্রমণ থেকে তো মেয়েদের অনেক বড় অসুখও হয়ে থাকে৷ শুধু তাই নয়, দূরে টয়লেট হলে সেখানে চট করে যাওয়াও মুশকিল৷ আর যদি বৃষ্টি আসে তা হলে তো কথাই নেই৷ তারপর পুরো ইভিএম অর্থাৎ তিনটি মেশিন যদি এক এক করে খারাপ হয়ে যায়, তা হলে তাঁদের ক্ষেত্রে তো আরও সমস্যা৷ ছ’-ছ’টা মেশিন বয়ে নিয়ে যাওয়া তো খুবই চাপের৷ কাজেই সেক্ষেত্রে পুরো ইভিএম ইউনিটটি বুথে পৌঁছে দেওয়া ও ভোটশেষে সেগুলি সংগ্রহের ব্যবস্থা করাটা মনে হয় মানবিক৷ কারণ, বুথ থেকে বাস থাকলেও সে তো অনেকটা দূরে থাকে। এতটা নিয়ে যাওয়া তথা বাসে তোলা ও নামানোর জন্য কিছু সহযোগী অবশ্যই প্রয়োজন৷ মহিলারা কোনও কাজে পিছপা নন৷ নারী পুরুষ সমান, সেটা মেধাবৃত্তিতে৷ শারীরিক শক্তিতেও মেয়েরা দুর্বল নন৷ তারপরেও তাঁদের কিছু বাড়তি কষ্ট ভোগও করতে হয়৷ কাজেই ভোটের ডিউটি তাঁদের দিলেও উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলাটা আগে প্রয়োজন।
লেখক মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ শ্রীপৎ সিং কলেজের সহকারী অধ্যাপক