মহম্মদ জাহাঙ্গীর আলম

দেশে যখন করোনা এল, আমি ভয় পাইনি। ভেবেছিলাম, বড়লোকদের অসুখ। ফলে সতর্ক হয়ে স্কুল এবং স্কুল সংলগ্ন এলাকায় যতটুকু সম্ভব কাজ করলাম। ছেলেমেয়েদের বাড়ি গেলাম। আমি বহু দিন ধরে ক্রনিক অ্যাজমায় ভুগছি। তবে করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হইনি। কিন্তু ফেসবুক, সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, করোনা ফুসফুসকে আক্রমণ করে। আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট, কিডনি, হার্ট, ফুসফুসের অসুখে ভোগা মানুষকে করোনা আক্রমণ করলে তাঁকে নাকি বাঁচানো মুশকিল হয়।

ফেসবুকের কয়েকজন বন্ধুরও ফুসফুসে সংক্রমণ ছিল। জুলাইয়ের শেষ দিকে তাঁদের কয়েকজন কোভিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। তখন ভয় পেতে শুরু করলাম, করোনা আক্রান্ত হলে বাঁচব না। ৩১ জুলাই থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হল। ওষুধ এবং ইনহেলার ব্যবহার শুরু হল। ১২ অগস্ট থেকে ইনহেলার ব্যবহার করেও স্বস্তি পেলাম না। ডাক্তার বদল হল। ইনহেলার এবং ওষুধ বদল হল ১৩ অগস্ট। কিন্তু শ্বাসকষ্ট এবং হালকা জ্বর পিছু ছাড়ল না। ডাক্তার জানালেন, কোভিড টেস্ট করাতে হবে। আমি ভাবলাম, এ তো আমার অ্যাজমার চেনা লক্ষণ। কিন্তু শরীর খারাপ করতে শুরু হল। শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকল। ভাবলাম, যদি করোনা পজ়িটিভ হয়, তা হলে আমার যা শ্বাসকষ্ট তাতে ওরা জোর করেই কোভিড হাসপাতালে পাঠাবে। এবং কোভিড হাসপাতালে গেলে আর ফিরে আসব না!

এই সময় আমার পরিচিত এক ডাক্তার বললেন, ‘‘দেখুন, এই সময় আপনার শ্বাসকষ্টের চিকিৎসা কোথাও পাবেন না। দু’ধরনের রোগী চিকিৎসা পায়, কোভিড পজ়িটিভ এবং কোভিড নেগেটিভ। মাঝামাঝি থাকা রোগীরা কোনও চিকিৎসা পায় না।’’ কথাটা সত্যি মনে হল। কারণ, বহরমপুরে কোনও ডাক্তার আমায় দেখতে রাজি হননি।

১৭ অগস্ট অ্যান্টিজেন টেস্ট করালাম। পজ়িটিভ। বাড়ির তিনতলার এক ফাঁকা ঘরে আমার জায়গা হল। আমি আলাদা হয়ে গেলাম। ডাক্তার ফোনে জানালেন, ভয়ের কিছু নেই। থেকে যান বাড়িতে। কিছু হবে না। করোনার জন্য বহুল ব্যবহৃত অ্যাজ়িথ্রাল আমার পাঁচটির জায়গায় আটটি খাওয়া হয়ে গিয়েছে। ফলে আমাকে ইনহেলার, পাফ এবং নেবুলাইজ়ার ব্যবহার করতে বলা হল। তার সঙ্গে আরও কিছু ওষুধ। কিন্তু সমস্যা হল, কোনও কিছুতেই আমার শ্বাসকষ্ট কমল না। অথচ পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেন লেভেল ৯৫। সারারাত শ্বাসকষ্ট এবং জ্বরে ছটফট করলাম। ঘুম এল না।

পরের দিনও একই রকম কাটল। ইনহেলার বদলানো হল। কিন্তু শ্বাসকষ্ট কমলো না। ঘুমও আসছে না। রাত ১১টা। ভাইয়েরা ভয় পেল। আমার পালস রেট বেড়ে ১৫০ হল। সাড়ে ১২টায় বাড়ির সামনে কোভিড অ্যাম্বুল্যান্স এল। পড়শিরা কেউ বেরিয়ে এলেন না। সবাই জানলা-দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার আত্মীয়-স্বজনেরা দূরে দাঁড়িয়ে। পিপিই কিট পরে সঙ্গী হল আমার জামাই।

রাত ২টো। কোভিড হাসপাতালে পৌঁছলাম। সবাই আমাকে নিয়ে আতঙ্কিত। আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পরে আমাকে একটি সিঁড়ি দিয়ে উঠে যেতে বলা হল। তার পরে একটি বন্ধ লোহার গেটের সামনে দাঁড়াতে বলা হল। কুড়ি ফুট দূর থেকে নার্সরা নির্দেশ দিলেন, ‘‘ওই যে ওখানে একটি যন্ত্র আছে। আঙুলে লাগান।’’ লাগালাম। বললাম, পালস ৮৫, হার্ট রেট ১৪০।

এ বার এক ডাক্তার পঁচিশ ফুট দূর থেকে বললেন, ‘‘আর কী সমস্যা?’’ আমি বললাম, আমি ক্রনিক অ্যাজমায় ভুগি। এখন খুব শ্বাসকষ্ট এবং হালকা জ্বর। ঘুমোতে পারি না। নার্সের কথা মতো একটা বিশাল ঘরে ঢুকলাম। অক্সিজেন নিয়ে প্রায় সবাই ঘুমোচ্ছেন। একজন শুধু গোঙাচ্ছেন। আমি অবসন্ন ছিলাম। একটি ফাঁকা বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমার কিন্তু ঘুম এল না। এপাশ, ওপাশ করতে করতে সকাল হল। সকাল হতেই দেখলাম, পিপিই কিট পরে নার্সরা নাম ধরে ডেকে সবাইকে দূর থেকে ছুড়ে ওষুধ দিচ্ছেন। আমি মনখারাপ করিনি। কারণ, করোনাকে সবাই ভয় পায়।

অপেক্ষা করতে শুরু করলাম, কখন ডাক্তার আসবেন। আমায় ওষুধ দেবেন। ডাক্তার এলেন না। কেউ কোনও ওষুধও দিলেন না। আমি যেমন ছিলাম, তেমন রইলাম। চা এল। কলা, পাউরুটি, ডিম সহযোগে টিফিন এল। দুপুরে কুমড়ো এবং পুঁইশাক দিয়ে তৈরি তরকারিও এল। ওষুধ এল না। দিনে তিন-চার বার নার্স এলেন। অক্সিজেনের টেকনিশিয়ানরা বারবার এলেন।

এক প্রভাবশালী বন্ধুকে বিষয়টি বলার পরে সকালে তিন জন ডাক্তার আমার কাছে এলেন। পালস দেখে বললেন, ‘‘আপনি ভাল আছেন।’’ তখন মৃত্যু চিন্তা মনের মধ্যে গেঁথে বসেছিল। চোখের সামনে একটি আঠেরো-কুড়ি বছরের ছেলে অক্সিজেন নিতে নিতেই কখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। তখন ভাবলাম, আমিও তো ওইরকম হতে পারি। ভয় কিসের? কিছু লোকজন অক্সিজেন নিয়েও ‘মরে গেলাম, মরে গেলাম’ বলে চিৎকার করছেন। এ ধরনের রোগীদের আইসিইউয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও আমার পাশে থাকা এক রোগীর অক্সিজেন লেভেল ৫০-এ নেমে এলেও আইসিইউয়ে নিয়ে যাওয়া হল না। সকাল হতেই মাইকে ঘোষণা, অমুক অমুক রোগীকে বের করা হচ্ছে। বাড়ির লোক আসবেন। বুঝতে পারছি, মৃতদেহ বের হচ্ছে। সারাদিন এইরকম ঘোষণা হতেই থাকে। তখন ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত। আমার থেকে কিছুটা দূরে দুই বৃদ্ধ ছিলেন। খুব দরিদ্র। তাঁরা সারা দিন ঘুমিয়ে থাকতেন। খাবার দিয়ে গেলেও খেতেন না। আসলে, খাবার প্যাকেট খুলে খাওয়ার মতো শক্তিও ওঁদের ছিল না। আমিও পারতাম না ওঁদের সাহায্য করতে।

আমাকে মৃত্যুচিন্তা থেকে বের করে আনেন আমার এক বন্ধু। সুস্থ রোগীদের দেখে মনে শক্তি আসত। ক্রমে ক্রমে ভয়কে জয়কে করলাম। খুঁজে পেলাম জীবনের অন্য মানে। সাত দিন থাকার পরে বন্ডে সই করে বাড়ি চলে আসি। কারণ, আমার তখন জ্বর ছিল না। শ্বাসকষ্টের কোনও চিকিৎসা হচ্ছিল না। পরে হলেও বুঝেছি, করোনাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। হাসপাতালে থেকে এটুকু বুঝেছি, সুস্থ-সবল দেহে করোনা কোনও সমস্যা তৈরি করতে পারে না। যাঁরা ওখানে ভর্তি হয়েছেন, তাঁরা প্রায়ই সকলেই শারীরিক ভাবে খুব দুর্বল। কিডনি, হার্ট, হাই ব্লাড সুগার, এবং শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি কোনও না কোনও অসুখে ভুগেছেন। ভিটামিন সি, লেবুজল, মুসুম্বি লেবু, আদা-রসুন, গোলমরিচ, লবঙ্গ দিয়ে তৈরি পানীয় খেয়েও উপকার পেয়েছি। আমার একটাই পরামর্শ, মনকে শক্ত রাখুন, ভয় পাবেন না।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া।