জয়দীপ মুখোপাধ্যায়

প্রাণীকে অনুকরণ করার ইচ্ছে মানুষের অনেকদিনের। বিহঙ্গ-বাসনায় সে চেয়েছে আকাশে উড়তে, তেমনই অতলের আহ্বানে হৃদি ভাসিয়েছে অলকানন্দা জলে। প্রাণীদের কাছ থেকে শেখা এই প্রযুক্তিগুলি বিজ্ঞানের যে শাখায় আলোচনা করা হয় তাকে আমরা বলি বায়োমিমিক্রি। শাখাটির সূচনা দ্য ভিঞ্চির হাত ধরে, যিনি পাখির ওড়ার পদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি করেছিলেন বিমানের প্রথম স্কেচ। পরে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ১৯০৩ সালে সেটিকে বাস্তবায়িত করেন।

১৯৫০ সালে বায়োমিমেটিক্স কথাটি এনেছিলেন জৈবপদার্থ বিজ্ঞানী অট্ট স্কিমিট, যিনি স্কুইডের স্নায়ু-তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে তৈরি করেছিলেন স্কিমিট ট্রিগার কম্পারেটর সার্কিট। অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল ভার্সানের রূপান্তরে এই সার্কিটের ব্যবহার হয়। বুলেট ট্রেন তৈরির সময় স্থপতিদের চিন্তা ছিল এর প্রচণ্ড শব্দ, ত্রাতার ভুমিকায় এগিয়ে এল মাছরাঙা। লক্ষ্য করে থাকবেন, মাছরাঙা কেমন নিঃশব্দে শিকার ছোঁ মেরে তুলে নেয়। স্থপতি ইজি নাকাতসু এবং পক্ষীবিদ জে. আর. ওয়েস্টের মিলিত প্রচেষ্টায় বুলেট ট্রেনের সামনেটা মাছরাঙার ঠোঁটের মতো করা হয়! ফলে আওয়াজ তো কমিয়ে দেওয়া গেলই, সাশ্রয় হল বিদ্যুৎ। বাড়ানো গেলো গতিও।

জর্জ ডি মেস্ট্রাল ছিলেন সুইস স্থপতি। একদিন বেড়াতে বেরিয়ে লক্ষ্য করলেন তাঁর প্যান্ট এবং কুকুরের লোমে একধরনের বুনো কাঁটা লেগে আছে। ছোটবেলায় খেলতে গিয়ে বন্ধুদের মাথায় এই ধরনের কাঁটাযুক্ত ফল ছুড়ে আমরা যেমন মজা করতাম। বিদ্যুৎ চমকের মতো তাঁর মাথায় আইডিয়া এল। তৈরি হল ভেলক্রো। জুতোর স্ট্র্যাপ থেকে পর্দার ফিতে ঠিক মতো চিপকে রাখতে যার ভেলকি দেখি আমরা।

উইপোকাকে আমরা ক্ষতিকারক হিসাবেই দেখেছি, কিন্তু আমরা হয়ত অনেকেই জানি না একটি উইঢিবির ভিতরে কী আশ্চর্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে! উইঢিবির গঠন অনুসরন করেই তৈরি করা হয়েছে জিম্বাবুয়ের ইস্ট গেট বিল্ডিং। বাঁচানো গিয়েছে ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ।

কাঠঠোকরা অবলীলায় সারাদিন কাঠ ঠুকরে যায়, প্রচণ্ড জোরে ঠুকলেও তার মস্তিষ্কে কোনও ক্ষতি হয় না! আমরা করলে কিন্তু আলঝাইমার অবধারিত। এই কারণেই বক্সিং খেলোয়াড়েরা প্রায়শই এই রোগে আক্রান্ত হন। কাঠঠোকরার মস্তিষ্কের বিশ্লেষণ করে বিশেষ শক অ্যাবজর্ভারের অস্তিত্ব মেলে। বিমানের ব্ল্যাক বক্স তারই অনুসরণ। শত আঘাতেও যা নষ্ট হয় না।

যেমন শামুকের ভিজে জায়গায় আটকে থাকার ক্ষমতাকে অনুসরণ করে ও তার দেহ বিশ্লেষণ করে যে রাসায়নিক তৈরি করা হয়েছে সেটি বাজারের অন্য আঠার থেকে কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী, অ্যাঢেসিভ তৈরি হয়েছে টিকটিকির পায়ের গঠন বিশ্লেষণ করে। পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এলইডি আবিষ্কার আরও মজাদার ঘটনা। তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন জোনাকির দেহে থাকা উজ্জ্বল আলো বিকিরক কয়েকটি আণুবীক্ষণিক চুলের কাছে।

মশার হুল ফোটানোর চোষক যন্ত্রটিও ছিল প্রযুক্তির আঁতুড় ঘর। হুল বেঁধানোর পরে মশা ১৫ হার্জ কম্পাঙ্কে কাঁপতে থাকে এবং আমাদের অগোচরে শরীরে বিঁধে যায়। জাপানের কানসাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা তার অনুকরণে বিনা ব্যথায় ইঞ্জেকশন দেওয়ার সূচ তৈরি করেন।

সাহারা মরুভুমিতে গবেষণারত একদল বিজ্ঞানী উটের নাকের গঠন বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, উটেরা রাতে নিশ্বাস ছাড়ার সময়, বায়ুকে ঠান্ডা করে এবং জলকণা শোষণ করে সংরক্ষণ করে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নোনা জল থেকে নুন সরিয়ে কৃষিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড ও ওয়াজেনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, হামিং বার্ডের ডানার গঠন তাকে এক জায়গায় ভাসিয়ে রাখে। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের হেলিকপ্টারকে আরও উন্নত করবে।

জিরাফের পায়ের আকার এবং কাফ মাসল আমাদের গঠনের প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু অস্থি সন্ধির চলন কম, ফলে ভার বহনের উপযোগী। ভবিষ্যতে যা কমপ্রেশন তত্ত্বে যুগান্ত আনবে বলে আশা গবেষকদের।

আর্কটিক কড মাছের রক্তে থাকে অতি ঠান্ডায় তঞ্চনবিরোধী একপ্রকার রাসায়নিক। ওয়ারউইকের গবেষকরা সেই বিশ্লেষণ থেকে তৈরি করেছেন পলি ভিনাইল অ্যালকোহল, যা অ্যান্টিফ্রিজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। বিড়ালের জিভের গঠন অনুসরণ করে তৈরি হয়েছে টাং ইন্সপায়ারড গ্রুমিং ব্রাশ যেটি খুব সহজেই সূক্ষ্ম ধুলিকণা বা চুল পরিষ্কার করে। হাম্প ব্যক তিমির পাখনার গঠন অনুকরণ করে, হোয়েল পাওয়ার সংস্থা এক শক্তিশালী উইন্ড টারবাইন তৈরি করেছে।

সিমসন ফ্রাসার বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটস প্রোজেক্টটিও খুব আকর্ষণীয়। প্রজাপতির ডানার বর্ণময়তা টাকার হলোগ্রাম হিসাবে ব্যবহার করে দেখা গিয়েছে এটি জাল করা খুব শক্ত। হাতির শুঁড়ে প্রায় ৪০০০০ মাসল আছে কিন্তু কোনও হাড় নেই, একটি জার্মান কোম্পানি ফেস্টো এটিকে অনুকরণ করে তৈরি করছে বায়োনিক আর্মস, যেটি শুধু ভার উত্তোলনে সমর্থ হবে তাই নয়, প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে তুলতেও সাহায্য করবে। আলবাট্রস ওড়ার সময় কম ডানা ঝাপটায় এবং বাতাসকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ৬০০ মাইল উড়তে পারে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন তৈরি করেছে এমআইটি। আবার হাঙরের চামড়ার বায়ো-মিমিক্রি করে সার্কলেট তৈরি করেছে মার্কিন নেভি, যা কিনা তাদের জাহাজগুলিকে সমুদ্রের আবহাওয়া থেকে সুরক্ষিত রাখবে।

গেকো এক অদ্ভুত সরীসৃপ। তাদের দৃষ্টিশক্তি মানুষের প্রায় ৩৫০ গুণ বেশী। লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়েরর গবেষকেরা এটা জানার পরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ক্যামেরা তৈরি করার কথা চিন্তা করছেন, যা হয়তো ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে কার্যকর হতে পারে। আমাজন নদীর এরাপাইমা মাছের গায়ের চামড়া এত শক্ত যে পিরানহা মাছও দাঁত ফোটাতে পারে না, তাদের ত্বকের গঠন বিশ্লেষণ করে মার্কিন এয়ার ফোর্স উন্নত শিল্ড তৈরির কথা ভাবছে। ক্লাঞ্জার সিকাডা নামক পতঙ্গটির ডানায় এক ধরনের ২০০ ন্যানো মিটার দৈর্ঘ্যের পিলার আছে, যা ব্যাক্টেরিয়ার কোষকে আটকে রাখে ও ছিঁড়ে ফেলে। বিজ্ঞানীরা এর গঠন অনুসরন করে জন-উন্মুক্ত-স্থানে জীবাণুমুক্ত করার কথা ভাবছেন। ভবিষ্যতে করোনার মতো অতিমারিতে যেটি হয়তো আমাদের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

না-মানুষের পাঠশালাও কিন্তু প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিচ্ছে মানুষকে!

লেখক : ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি অফ অ্যানিম্যাল অ্যান্ড ফিশারি সায়েন্সের সহকারী অধ্যাপক

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here