কৌশিক গুড়িয়া 

খুব ছোটবেলায় রেডিয়োয় শোনা একটি নাটকের কথা মনে পড়ে। তখন দাদু বেঁচে ছিলেন। বাড়ির দালানে বিছানার চাদর পেতে সন্ধ্যা উপভোগ করতাম আমরা। ইংরেজি ‘নয়’ চিহ্নের ফোকর গলে  একটি বিড়াল লাফ দেওয়ার ছবি আঁকা থাকত চারটে লাল ব্যাটারির গায়ে! সন্ধ্যে একটু ঝুলে এলে, ৮টা সাড়ে ৮টা নাগাদ, মনে পড়ে সেদিনের রেডিয়ো-নাটকে কোনও এক মহামারির প্রেক্ষাপট ছিল। বিখ্যাত একাধিক অভিনেতার কণ্ঠে ফুটে উঠছিল পুরাতন বাংলার অনাহার-মৃত্যুর আবহ। অবস্থা এমনই ছিল যে ভাত-ডাল দূরে থাক, শাপলা-কলমিও জুটছিল না মানুষের। ছত্রাক জন্মে গিয়েছিল জলে-স্থলে। হাতের কাছে পাওয়া সেই ছত্রাক খেয়ে পেট ভরাতে গিয়ে আবার তার বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছিলেন অনেকে। যতদূর মনে পড়ে তখন থ্রি-ফোর হবে, তবে কোনও মতেই মনে করতে পারলাম না সেই নাটকের নাম।

কে সেই গুপ্ত দানব?

ইদানীং ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের নাম শুনে সেদিনের মৃত্যু, অনাহার এবং আজকের আবহে কোথায় যেন মিল খুঁজে পাচ্ছি। কিন্তু এই কালো ফাঙ্গাস আসলে কী? তারা হল মিউকরমাইসেটিস গোত্রের বেশ কিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছত্রাক। তারাই মোল্ড। ছোটবেলার বিজ্ঞান বইতে যে রাইজোপাস বা মিউকর জাতীয় নাম শুনেছি আমরা, এরাই সেই কালো ফাঙ্গাস! ফুলের পরাগরেণুর মতো তাদেরও অতি-সূক্ষ্ম রেণু উড়ে এসে আমদের শরীরে ঢুকলে যে রোগ হয় তাকে বলে মিউকরমাইকোসিস। তাকেই বলে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের রোগ। এমন সব প্রজাতি ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্রে ঢুকে পড়লে সুতোর মতো জাল বিছিয়ে কলোনি তৈরি করে তারা।

কী ভাবে আসে?

সাধারণত মাটিতে জন্মায় এরা। পচা শাক-সবজি, ফলমূলের ফেলে দেওয়া অংশই খাদ্য এদের। ফলে মাটির সংস্পর্শে যারা আসবেন, একটু সাবধানে থাকতেই হবে। তারা থাকে ভেজা, দূষিত বায়ু এমনকি পশুর বর্জ্য পদার্থেও। জল অবশ্য এদের সংক্রমণে দায়ী কিনা বলা কঠিন।

কী করণীয়?

বাড়িতে ফল, শাক-সবজি পচতে দেবেন না। যারা বাড়িতে গাছ রাখেন, পরিচর্যার সময় দস্তানা অবশ্যই পরুন, নাক-মুখ ঢেকে রাখুন মাস্কে। পচা জৈব সার আপাতত কিছুদিন ব্যবহার করবেন না।

কেন ক্ষতিকর?

কালো ফাঙ্গাসের কোষে থাকে পাটুলিন, আফ্লোটক্সিন, সিট্রিনিন ইত্যাদি মাইকোটক্সিন্স বা বিষ। এগুলির বিষক্রিয়া ক্ষতি করে আমাদের বিভিন্ন অঙ্গের।

কাদের পক্ষে বেশি ক্ষতিকর?

শর্করা বা সুগার এই কালো ফাঙ্গাসদের প্রিয় খাদ্য। তাই বলা যায় রক্তে সুগার থাকলে আমাদের এই সংক্রমণের গতি বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয়ত, স্টেরয়েড ওষুধে চিকিৎসা চলছে এমন রোগীর ক্ষেত্রে এই ছত্রাকের সংক্রমণ-প্রবণতা বেশি। তাই, কোভিড আক্রান্তদের সাবধান থাকতেই হবে।

রাজনীতির কালো পর্দা

বিজ্ঞানের তত্ত্বে পাওয়া যায় যে, কালো ফাঙ্গাস জন্মাতে সর্বোত্তম পরিবেশগত তাপমাত্রা হল ২৬  থেকে ২৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং উত্তম আর্দ্রতা। অর্থাৎ এমন পরিবেশ অবশ্যই বিশ্ব উষ্ণায়নের পরিবেশ নয়! তাদের উপযুক্ত বৃদ্ধির জন্যে দরকার হয় মাটির অম্ল-ভাব। সাধারণত বৃষ্টির জলের পিএইচ ছয় থেকে সাতের মধ্যেই থাকে এবং তা অম্লত্ব বাড়ায়। তাই বলা যায় সাধারণ বা বেশি বৃষ্টি মাটির অম্ল-ভাব তৈরি করলেই কালো ছত্রাক বাড়তে পারে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বহু বিজ্ঞানীর ‘উষ্ণায়ন-বৃষ্টিহীনতার’ কালো রাজনীতি যে মিথ্যে, সেই পর্দা হয়তো ফাঁস করে দেয় এমন মারণ ফাঙ্গাসের বাড়-বাড়ন্ত! ঠিক যেমন করে, প্ল্যাস্টিক ব্যবহার মানব জাতীর পক্ষে ক্ষতিকর জেনেও সারা পৃথিবীর কোনও রাষ্ট্রনেতাই প্ল্যাস্টিক দ্রব্য তৈরির কারখানা বন্ধের হুকুম দিতে অপারগ! প্লাস্টিকও যে আসলে এক ধরনের কালো পর্দার নাম…