কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত

সামাজিকতা তো একটি পারস্পরিক সম্পর্ক। তাই শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে কিছু লিখতে বসে মনে হল, সমাজেরও কি কোনও দায় নেই শিল্পীর প্রতি? গত এক বছরের বেশি সময় ধরে এক অভূতপূর্ব সঙ্কটের মধ্যে আমরা সকলেই কমবেশি আচ্ছন্ন। যখনই সভ্যতার ইতিহাসে সঙ্কটকাল আসে তখনই অনুভূতিপ্রবণ মানুষ হিসেবে শিল্পীদের সক্রিয়তা বেড়ে যায়। অবশ্য সবাই যে সমানভাবে যুগসঙ্কটে সাড়া দিতে পারেন এমন নয়। কিন্তু যাঁরা সেটা পারেন তাঁরা আপন শক্তিতেই পারেন। প্রেরণা বা তাগিদ যা কিছু সেটা আসে শিল্পীর অন্তর থেকে। বলাই বাহুল্য, সমকাল সবসময় শিল্পীর এই সক্রিয়তা মেনে নিতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাস পড়লেই এ কথা মালুম হয়। সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা শাসকের ঔদ্ধত্যের বিরুদ্ধে শিল্পকে দাঁড় করালে বহুজনই সেটা মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। আমাদের দেশে বেশিরভাগ শিল্পীই ডায়েরি লেখেন না। লিখলে নিশ্চয়ই জানা যেত এই বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার মর্মস্পর্শী বিবরণ।

দুঃখ, শোক, মৃত্যু, নৈরাশ্যের ছবি আঁকলে অনেকে বলেন, এ সব এঁকে কী হয়? আশার কথা বলুন না মশাই! কিন্তু তাঁরা জানেন না শিল্পী কেন এইসব আঁকেন? ছবি এঁকে আসলে যে ঠিক কী হয়, সে সম্পর্কে বেশিরভাগ লোকেরই কোনও ধারণা নেই। ঠিক যেমন জানা নেই গান গাইলে বা সেটি শুনলে ঠিক কী হয়? একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাব আশার কথা, আনন্দের কথাও কিন্তু শিল্পীরা কম বলেন না তাঁদের সৃষ্টিকর্মে।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা একটু বলি সবিনয়ে। এই তো সেদিন আমি একটি বেওয়ারিশ লাশের ছবি এঁকে পোস্ট করেছিলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। চারদিকে এইরকম ভয়াবহ মৃত্যু, সম্মানের সঙ্গে সৎকার না হতে পারা অসংখ্য শবদেহ, এইসব দেখেশুনে বিমর্ষ ও ক্ষুব্ধ হৃদয়ে সেই ছবিটি রচনা করেছিলাম আমি। যে ঝুলন্ত শবদেহটি এঁকেছিলাম তার নেপথ্যে ছিল ভারতের পার্লামেন্টের আবছায়া রূপ। তাই দেখে একজন খুব সমালোচনা করলেন। বললেন, দেশে নাকি অনেক ভাল জিনিস আছে, যাকে বলে পজিটিভ ব্যাপারস্যাপার। সেইসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে এইসব এঁকে আমি নাকি একদম ঠিক কাজ করছি না ইত্যাদি। যদিও আমি নিশ্চিত জানি না তিনি আমার এতকাল ধরে আঁকা তথাকথিত ইতিবাচক কাজ কতটা দেখেছেন। এটাও জানি না যে তাঁর নিজের শরীরের কোনও অঙ্গে যন্ত্রণা করলে বাকি দেহখানি সুস্থ আছে ভেবে নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারেন কিনা!
শিল্পীর কাছে কী চায় সাধারণ মানুষ? শিল্পী তো নিজের ইচ্ছেমতো আঁকবে। দেশ কাল পরিবেশ সবই তার মানসপটে যে ভাবে ধরা দেবে সেইভাবেই তা ছবিতে ফুটে উঠবে। এটাই স্বাভাবিক ক্রিয়া। এইটা কেন‌ আঁকলেন, ওইটা কেন আঁকেননি— এ ভাবে কিছু কি বলা যায়? শিল্পীরই কি একার দায় নিরপেক্ষ থাকার? ভালো করে ভেবে বলুন তো নিরপেক্ষ বলে আদৌ কি কিছু হয়? তাহলে তো মারণাস্ত্র তৈরির কারখানার কর্মীদের পেটে লাথি মারা হবে বলে যুদ্ধবিরোধী ছবিও আঁকা উচিত নয়। এই যে আমাদের দেশে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের সময় মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণার ছবি এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোরের মতো শিল্পীরা, তা কি ভুল? অপ্রয়োজনীয়? নৈরাশ্যব্যঞ্জক বলে সেগুলিকে কি আমরা খারিজ করে দেবো? বাংলাদেশের রণাঙ্গনে গিয়ে যোদ্ধাদের পাশে বসে মুক্তিযুদ্ধের ছবি এঁকেছিলেন দেবব্রত মুখোপাধ্যায়। নিরপেক্ষতার নিরিখে তাঁর কি সেজন্য শাস্তি হওয়া উচিত ছিল? শিল্পীর কাজ কি গোলাবারুদের আবহাওয়ায় বসে তুলি চালানো? আসলে শিল্পীর যে কী কাজ, সেটা তাঁর নিজের উপরে ছেড়ে দেওয়াই ভালো। কোনও শিল্পীর ছবি দর্শকের ভালো লাগলে তিনি সেই শিল্পীর জন্য আহামরি কী দায় পালন করেন যে শিল্পীকে তাঁর দর্শকের জন্য জীবনপাত করতে হবে? হাল আমলে ছেলেমেয়েদের আঁকা শেখানো ছাড়া আর কোনও দরকারে তো শিল্পীর কোথাও ডাক পড়ে না। তিনি কী ভাবে বাঁচেন, কী ভাবে স্বপ্ন দেখেন সে সবের সন্ধান ক’জনই বা রাখেন? অথচ শিল্পীর সামাজিক ভূমিকা, তাঁর দায়, কর্তব্য ইত্যাদি নিয়ে এক শ্রেণির মানুষের ঘুম নেই। এও কিন্তু কম নৈরাজ্যের লক্ষণ নয়!
তবুও শিল্পীরা কাজ করেছেন, করে যাবেন। কেউ পছন্দ করুন বা না-করুন। তাঁকে রগড়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হোক, কিংবা পুরস্কারের টোপ। সত্যিকারের শিল্পীকে ঠেকানো কঠিন। প্রতিবাদের ছবি কেউ ড্রইংরুমে টাঙান না, গৃহপ্রবেশে উপহার দেন না, হোটেলের রিসেপশনে সাজিয়ে রাখেন না। তারপরেও শিল্পী ছবি আঁকেন। তিনি তাঁর সমস্ত শৈল্পিক জ্ঞান ও রুচি দিয়ে শাসকের বিরুদ্ধে আঙুল তোলেন। সে শাসক দিল্লি, কলকাতা না ওয়াশিংটনের— সে প্রশ্ন অবান্তর।

শিল্পী—  চিত্তপ্রসাদ, জয়নুল আবেদিন ও কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত