অনল আবেদিন

সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় আমৃত্যু নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজ করেছেন। এ পাখি শস্যখেতের হলাহলসম কীটপতঙ্গ খেয়ে কৃষকের উপকার করে বলে নীলকণ্ঠ। দেবতা ও অসুরের যুদ্ধে উত্থিত গরল ও অমৃতের মধ্যে হলাহল গলাধঃকরণ করে দেবতাদের রক্ষা করেছিলেন বলে মহাদেব শিবের অপর নাম নীলকণ্ঠ। আমরা আজ অন্য এক নীলকণ্ঠের খোঁজ করব। তিনি ‘রবিনহুড’, অধীর চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে নাকি আরএসএস-বিজেপির ‘সেটিং’ আছে। সাম্প্রতিককালে এ ধরনের রাজনৈতিক প্রচার চলছে। পরিকল্পিত সেই দীর্ঘ প্রচারের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চকিতে প্রায় দেড়শো বছর আগের বহরমপুর শহর পরিক্রমা করা যাক। তারও আগের কয়েকজন নীলকণ্ঠের খোঁজ নেওয়া যাক।
দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, প্রাণ বাজি রেখে ধর্মনিরপেক্ষতার অনন্য পথিকৃৎ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তখন আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। তখন নেতাজিকে তেজোর কুত্তা, কুইসলিং বলতে স্বদেশের ব্রিটিশ দালালদের জিভ কাঁপেনি। এঁরাই এক সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের দালাল ও বুর্জোয়া কবি বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন। শুভাকাঙ্ক্ষীদের আর্থিক সাহায্যে, অন্যের বাড়িতে, প্রায় বিনা চিকিৎসায় শেষ জীবন কোনও মতে অতিবাহিত করেন দুই স্বাধীনতা সংগ্রামী— অতুল্য ঘোষ ও প্রফুল্লচন্দ্র সেন। শেষ জীবনে তাঁরা প্রায় কপর্দকশূন্য ছিলেন। তাঁদেরকে এ দেশের ‘কমিউনিস্ট’রা বিবাদিবাগ এলাকার কয়েকশো কোটি টাকা মূল্যের স্টিফেন হাউসের মালিক বানিয়ে দিয়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন করতে চাওয়ার ‘অপরাধ’- এ ধৃত অতুল্য ঘোষ মেদিনীপুর জেলে বন্দি ছিলেন। জেলবন্দি অতুল্য ঘোষের চোখে লাঠি ঢুকিয়ে দিয়ে একটি চোখ কানা করে দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। জেলের ভিতরে মেরে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় গুড়িয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশরাজ। ফলে সারা জীবন তাঁকে পিঠের পিছনে লোহার খাঁচা লাগিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয়েছিল। আরএসএসের মতোই ‘কমিউনিস্ট’রাও ওই স্বাধীনতা সংগ্রামীকে ‘কানা অতুল্য’ বলে ব্যঙ্গ করতে দ্বিধা করেননি কখনও। তাঁরা কানা বেগুন বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রেখে বিকৃত উল্লাসে ফেটে পড়েছেন অনেক সময়। অথচ তাঁদের দাবি, তাঁরাই নাকি উন্নততর সংস্কৃতির চর্চা করেন!
গত ১৯৮৯ সালে ‘অলিগলি মে সোর হ্যায়, রাজীব গাঁধী চোর হ্যায়’ আওয়াজ তুলে, ‘বোফর্স গাঁধী’র তকমা দিয়ে আরএসএসের গুরুদেব অটলবিহারী বাজপেয়ী ও লালকৃষ্ণ আদবানিদের সঙ্গে মিলিজুলি ভোট করেন জ্যোতি বসু, হরেকিষেন সিং সুরজিতরা। তার ফলে ১৯৮৪ সালে চার জন এমপি পাওয়া বাজপেয়ী-আদবানিরা ১৯৮৯ সালে ৮৬ জন এমপিতে পৌঁছে যান। এ ভাবে কমউনিয়াল বিজেপির ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে ‘কমিউনিস্ট’দের সৌজন্যে। অতঃপর ‘বোফর্স গাঁধী’ আদালতের রায়ে ‘মিস্টার ক্লিন’ তকমা পান।
বিরোধীদের চরিত্র হননের এ জাতীয় দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আবহে অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। চরিত্র হননের রাজনৈতিক তাগিদে তাঁর গায়েও সম্প্রতি ‘সেটিং’ তকমা লাগিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আরএসএস এবং বিজেপির সঙ্গে নাকি তাঁর সেই ‘সেটিং’! সেই কমিউনিয়াল ‘সেটিং’ তত্ত্বের বাস্তবতা কতটুকু? তার আগে অধীর চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্বের ইতিহাসের সন্ধান করা যাক।
অধীর চৌধুরী তখন সবে দশম শ্রেণি। ঘর, স্কুল ছেড়ে নকশালপন্থীদের শোষণমুক্ত স্বদেশ গড়ার স্বপ্নে বিমোহিত। পরে শ্রেণি সংগ্রামের তাগিদে আত্মগোপনে থাকা জীবনে মাঠে মাঠে আলু পুড়িয়ে পেটের খিদে মেটানো। অধীরের শ্রেণি সংগ্রামের জীবনে আত্মগোপনের সঙ্গী ছিলেন বহরমপুর শহরের জমিদারি এলাকার জালাল শেখের মেজদা আবুল কাশেম।
১৯৮৮ সালের ২৪ জুন কাটরা মসজিদে নমাজ পড়ার অন্যায় দাবি নিয়ে বহরমপুরে সমবেত হয় কয়েক হাজার অসংগঠিত মানুষ। সেই ঘটনায় গণহত্যাকাণ্ড ঘিরে মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার সমূহ সম্ভবনা দেখা দেয়। সেই আতঙ্কে বেশ কিছুদিন ধরে কাঁপছিল সবাই। প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর তখন কিংকর্তব্যবিমুঢ় দশা। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দেওয়া জিপে করে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্গীদের নিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে বেড়ান অধীর চৌধুরী। এ ভাবেই দমবন্ধ করা অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ছিলেন ডাকাবুকো অধীর চৌধুরী। তার পরে তাঁর সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ।
জঙ্গিপুর লোকসভার কংগ্রেস প্রার্থী মান্নান হোসেনের সঙ্গে নবগ্রাম বিধানসভার প্রার্থী অধীর চৌধুরীর প্রাণ শেষ হতে চলেছিল ১৯৯১ সালের ১৯ মে, ভোটের দিন। নবগ্রাম বিধানসভার বাঘিরাপাড়া বুথে। নকশালপন্থার মতো চরম বামপন্থী রাজনীতির আত্মগোপনের জীবনে তাঁর সর্বক্ষণের কমরেড ছিলেন জমিদারির আবুল কাশেম। তারপর ডানপন্থী কংগ্রেসের সংসদীয় রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্বে তাঁর সঙ্গী ছিলেন মান্নান হোসেন। কাশেম ও মান্নান— বিশ্বাসী দু’জনেই মুসলমান সম্প্রদায়ের। অধীরের বাকি জীবনটা আরও বড় ধরণের অসাম্প্রদায়িকতার চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে।
(২)
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বহরমপুর পুরসভার প্রথম মুসলিম সদস্য ও প্রথম মুসলিম পুরপ্রধান হন আকবর কবীর (১৯৯৮-২০০২)। মেয়াদ চার বছর। তার মানে স্বাধীনতার পরে ধর্মনিরপেক্ষ দেশের একটি শহরের মুসলিম পুরপ্রধান হতে সময় লাগে ৫১ বছর। বহরমপুর শহরে অধীর চৌধুরী নামের কাণ্ডারীর আবির্ভাব না ঘটলে, এমনটা ঘটতে আরও কত ৫১ বছর লাগত তা কয়েকশো কোটি টাকার প্রশ্ন! এই ঐতিসিক ঘটনার তাৎপর্য নানা ধরণের। সে বিষয়ে যাওয়ার আগে বলে নেওয়া যাক এ বিষয়ে অধীর চৌধুরীর মতামত। তাঁর কথায়, ‘‘হিন্দু বা মুসলমানকে চেয়ারম্যান করা হয়নি। যোগ্য প্রশাসককে চেয়ারে বসানো হয়েছে।’’ এটা ১৯৯৮ সালের কথা। তাতে তাঁর অসাম্প্রদায়িক মনের গড়নের হদিশ মেলে।
নবাবি জেলা মুর্শিদাবাদের সদর শহর বহরমপুর। বহরমপুর পুরসভার প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৮৫ সালে। তখন এই শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। তাঁদের মধ্যে অভিজাত ও ধনী মুসলমানের সংখ্যাটাও আনুপাতিক হারে এখনকার থেকে বেশি ছিল। দেশভাগের পরে অভিজাত মুসলমানদের সিংহভাগ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়। সে অন্য কথা। ১৯৪৩ সালে বহরমপুর পুরসভার প্রথম মুসলিম পুরপ্রধান হন। তিনি মৌলভী আব্দুল গনি। অর্থাৎ ব্রিটিশভারতে এক জন মুসলিম পুরপ্রধান হতে পুরসভা গঠনের পরে সময় লাগে ৫৮ বছর। সেই পুরপ্রধানের মেয়াদ আবার মাত্র এক বছর (১৯৪৩-১৯৪৪)।
বাংলায় ওই কালপর্বটি দ্বিজাতিতত্ত্ব ও দেশভাগের ইস্যুতে দীর্ণ ছিল। মৌলভী আব্দুল গনির এক বছরের পুরপ্রধানের মেয়াদ ও উপ-পুরপ্রধানের পাঁচ বছরের (১৯৩৮-১৯৪৩) মেয়াদের নেপথ্যে উত্তাল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কাজ করছিল কিনা, তা গবেষণা সাপেক্ষ। ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ৬২ বছরে বহরমপুর পুরসভায় মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন পুরপ্রধান ( মেয়াদ মাত্র এক বছর), এক জন উপ-পুরপ্রধান এবং ২৩ জন সদস্য ছিলেন। তারপর দেশ স্বাধীন হলে বহরমপুর থেকে অনেক মুসলমান দেশান্তরি হয়।
১৯৯৮-২০১৮ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে মুসলিম সম্প্রদায়ের পুরপ্রধান ছিলেন এক জন আকবর কবীর  (চার বছর)। একজন উপ-পুরপ্রধান মৈনুদ্দিন চৌধুরী বাবলা ও একজন সদস্য ডালিয়া বেগম। অধীর চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মুসলিমরা এই মর্যাদাটুকুও পেতেন না। তার বড় প্রমাণ ১৯৮১-১৯৮৩ পর্যন্ত বাম পরিচালিত মিলিজুলি বোর্ডে এবং ১৯৮৫ সালে বামফ্রন্ট মনোনীত বহরমপুর পুরবোর্ডে এক জনও মুসলিমও ঠাঁই পায়নি। সেক্যুলারিজিমের বাম আমলে এমন হলে ডানপন্থীদের আমলে কেমন হতে পারে? না! এখানে উল্টোটাই হয়েছে। বাম আমলে সংখ্যালঘু ও মহিলা মর্যাদা পায়নি, কিন্তু ডানপন্থী অধীর চৌধুরী মুসলিম মহিলাকে পুর-সদস্য করে ও মুসলিম পরিবারের অন্যজনকে পুরপ্রধান করে সংখ্যালঘুদের মর্যাদা দিয়েছেন। তারপরেও বলব, আরএসএস ও বিজেপির সঙ্গে অধীরের ‘সেটিং’ আছে?
২৭ বছরের বাম শাসনে রাজ্যে প্রথম বাম বিরোধী দল কংগ্রেস একটি জেলাপরিষদ দখল করে ২০০৩ সালে। অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে মুর্শিদাবাদ জেলাপরিষদের সভাধিপতি করা হয় সিদ্দিকা বেগমকে। মুসলিম সম্প্রদায় থেকে রাজ্যে প্রথম তিনিই কোনও জেলা পরিষদের সভাধিপতি হন। তাও আবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক জন মহিলা। তারপরেও অধীর চৌধুরী মুসলিম বিরোধী? তারপরেও অধীর চৌধুরীর সঙ্গে আরএসএস ও বিজেপির ‘সেটিং’ থাকার প্রশ্ন তোলাটাই সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন নয় কি?
সময়টা ২০০১-২০০২ সাল। তখন রাজ্যের ‘কমিউনিস্ট’ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রাজ্যের মাদ্রাসাগুলো জেহাদিদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে তারস্বরে মিথ্যা, উগ্র ও সাম্প্রদায়িক প্রচার করে লালকৃষ্ণ আদবানি তখন ক্লান্ত। ক্লান্ত মনুবাদী আদবানীর হাত থেকে মিথ্যা প্রচারের ব্যাটনটা নিজের হাতে তুলে নিলেন কমিউনিস্ট বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। লালকৃষ্ণের ঠোঁট থেকে কেড়ে নিয়ে একাধিক জনসমাবেশে একই রকম প্রচার করলেন বুদ্ধদেব। ‘কমিউনিস্ট’ মুখ্যমন্ত্রীর এই অবাস্তব ও মিথ্যা প্রচারে সংখ্যালঘু প্রধান মুর্শিদাবাদ জেলা অগ্নিগর্ভ। অধীর চৌধুরীর উদ্যোগে বহরমপুর শহরের ওল্ড কালেক্টরেট মোড়ে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল জনসভা। ওই জনসমাবেশ থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে ও শিক্ষা বিস্তারে মাদ্রাসার ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশদে ব্যাখ্যা করেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। তারপরেও বলবেন, আরএসএস ও বিজেপির সঙ্গে অধীর চৌধুরীর ‘সেটিং’ আছে?
মুর্শিদাবাদ জেলায় ৬৭% মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজনের বসবাস। এ জেলার উন্নয়ন মানেই সংখালঘুদের উন্নয়ন। সেই ভাবনা থেকে ২০০৪ সালে প্রণববাবুকে জঙ্গিপুর লোকসভা কেন্দ্রে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য অধীর জেদ ধরে বসেন। নারাজ প্রণবাবুকে রাজি করানোর জন্য নাছোড় অধীরবাবু সাংবাদিক ও রাজনীতিক-সহ বিভিন্নস্তরের প্রভাবশালীর দ্বারস্থ হন। অবশেষে প্রণববাবু জীবনে প্রথম বার নির্বাচিত সাংসদ হন। তার ফলে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আহিরণ ক্যাম্পাস, বহরমপুরে আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট অফিস, ৫০ বছর ধরে আটকে থাকা, ফি বছরের বন্যা প্রতিরোধের জন্য তৈরি ‘কান্দি মাস্টার প্ল্যান’ কার্যকর করা, বহরমপুরে সেনা জওয়ান নিয়োগ কেন্দ্র, নবগ্রাম সেনা ছাউনি, পিএফ অফিস, নির্মীয়মাণ নশিপুর-আজিমগঞ্জ রেলসেতুর মতো বেশ কিছু কেন্দ্রীয় প্রকল্প সম্ভব হয়েছে। তারপরেও বলা যাবে, অধীর চৌধুরী মুসলিম বিদ্বেষী? অধীর চৌধুরীর ইচ্ছাতেই তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুই রাজনৈতিক ব্যক্তি— আবু হেনা ও আবু তাহের মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। সিপিএমের জন্ম ইতিহাস হাতড়ে এমন দৃষ্টান্ত মিলবে না কিন্তু। তারপরেও অধীর চৌধুরীর হৃদয়ে সাম্প্রদায়িকতা কোন কারণে খুঁজে পান সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা?
(৩)
উদগ্র সাম্প্রদিক বিদ্বেষ বিষের চ্যাম্পিয়ন নেতা শুভেন্দু অধিকারী তখন বেশ কয়েকটি দফতরের মন্ত্রী। হৃদয় কন্দরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ সযত্নে লুকিয়ে রেখে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের প্রচারে বেরিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলায় তিনি শতাধিক বার বলেছেন, ‘‘অধীর চৌধুরীর সঙ্গে আরএসএসের গোপন সম্পর্ক আছে। ভোটের পরেই অধীর চৌধুরী বিজেপিতে যোগ দেবে। কথা দিলাম, তাঁকে এই ভোটে হারাতে না পারলে আমি জীবনের মতো রাজনীতিই ছেড়ে দেব।’’ বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে নেতানেত্রীরা কবে আর কথা রেখেছে! তাই অধীর চৌধুরী জিতলেও শুভেন্দু রাজনীতি ছাড়েননি। উল্টে অধীর নয়, সাম্প্রদায়িক শুভেন্দুই বিজেপিতে গিয়েছেন। এবং বিধানসভায় বিজেপির পরিষদীয় দলের নেতা হয়েছেন।
তৃণমূলের মুর্শিদাবাদ জেলা সভাপতি আবু তাহের খান সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারপর্বে অধীর চৌধুরীকে বিজেপির দালাল বলেছেন বারবার। পাশাপাশি ২০২০ সালে করোনা কালে অধীরের ভূমিকার সমালোচনা করে তাহের বলেন, ‘‘অধীর চৌধুরী গত বছরের করোনার সময়, জেলায় ছিলেন না। তিনি দিল্লিতে বসে ছিলেন।’’ অকস্মাৎ সার্বিক লকডাউন হওয়ায় দিল্লিতে আটকে পড়েলেও নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকেননি অধীর চৌধুরী। সারা রাজ্য থেকে চিকিৎসা ও জীবিকার প্রয়োজনে সারা দেশের প্রত্যন্তপ্রান্তে ছড়িয়ে থাকা হতদরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিক ও বিপন্ন মধ্যবিত্তের আর্তনাদ পৌঁছয় দিল্লিতে অধীর চৌধুরীর কাছে। সেই ডাক তাঁর কাছে আরও বেশি করে ও সহজে যাতে পৌঁছতে পারে তার জন্য অধীর চৌধুরী দিল্লির বাসভবনে নিজস্ব একটি ক্ষুদ্র আইটি সেলও খুলে ফেলেন।
লকডাউনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়া মুর্শিদাবাদ-সহ সারা রাজ্যের লাখ লাখ অসহায় বিপন্ন মানুষের ডাকে সাড়া দিলেন অধীর চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার স্পিকার, রেলমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, বিভিন্ন রাজ্যের জেলাশাসক, এমনকি আন্দামান, নিকোবর, অরুণাচলপ্রদেশ ও হিমাচলপ্রদেশের মতো প্রত্যন্ত এলাকার বিভিন্ন থানার ওসিকেও ফোন করেন লোকসভার কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতা অধীর চৌধুরী। এ ভাবেই তিনি করোনাকালে বিভূঁইয়ে আটকে থাকা অসহায়দের মুখে খাদ্য ও পানীয় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আটকে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকেদের বাড়ি ফেরানোর জরুরি তাগিদে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বরাবরের অস্বাভাবিক সম্পর্কের কথা শিকেয় তুলে রেখে, অধীর চৌধুরী বারবার মুখ্যমন্ত্রীকেও আবেদন করেন।
পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানোর তাগিদে তিনি মমতাকে চিঠি লিখে বলেন, ‘‘প্রয়োজনে আমাকেও আপনি ব্যবহার করুন। কাজে লাগান। পরিযায়ীদের ফেরাতে আপনার নেতৃত্বে আমি কাজ করতে রাজি আছি!’’ একই উদ্দেশ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী, রেলমন্ত্রী ও লোকসভার স্পিকারকে একাধিক বার চিঠি লেখেন। লকডাউনে আটকে থাকা অসহায় পরিযায়ীদের জন্য তাঁর আান্তরিক আকুলতার প্রমাণ মেলে এই সব ঘটনায়। পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বাংলার হতদরিদ্র মুসলমান। অধীর চৌধুরী মুসলিম বিদ্বেষী হলে ‘বিদেশ’-এ আটকে থাকা বিপন্ন মুসলিম পরিযায়ীদের বাড়ি ফেরানোর জন্য তাঁর এত আকুলতা থাকবে কেন?
কোনও ইস্যুতে তিনি ‘মিস গাইডেড’ হলে, ভুল বুঝতে পারার পরে ভুল সংশোধন করতে তিনি কালক্ষেপ করেননি কখনও। তাঁকে দাম্ভিক ও সাম্প্রদায়িক বলে গালমন্দ করলেই হবে না, অভিযোগের পক্ষে তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে। সে সব কোথায়? বিজেপিকে ঠেকাতে পারবে তৃণমূলই, এই ভাবনা থেকে বাংলার অসাম্প্রদায়িক মন তৃণমূলকেই সঠিক ভাবে বেছে নিয়েছে এ বারের ভোটে। তারই ফল বিধানসভায় কংগ্রেস শূন্য। বিশেষ উদ্দেশ্যে অতিসন্ধিগ্ধ মন ছাড়া এটাকে অন্য কেউ বিজেপির সঙ্গে অধীর চৌধুরী সেটিং বলতে পারে না। সেটিং মানে তো দেওয়া-নেওয়া। দুর্মুখ ঈর্ষাকাতরদের কথা মতো বিজেপি ও আরএসএসের সঙ্গে অধীর চৌধুরীর সেটিং হলে বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের ভাঁড়ার শূন্য হয় কী করে? তিনি বিজেপিকে শুধু দিয়েই গেলেন, তিনি নিলেন না কিছুই! তাহলে সেটিং তত্ত্ব কোন ফর্মুলা অনুসারে ধোপে টেকে? সেটিং মানে তো ‘দেবে আর নেবে’। তাই না! নইলে সেটিং কিসের!
২০০৩ সালের জুন-জুলাই। অজানা জ্বরে ও প্রায় বিনা চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর মড়ক লেগেছিল লালগোলার থানার নশিপুর ও লাগোয়া ২-৩টি গ্রামপঞ্চায়েত এলাকায়। মৃত শিশুরা প্রায় সবাই মুসলিম পরিবারের। অধীর চৌধুরীর আন্দোলনের ধাক্কায় রাজ্য তোলপাড়। দিল্লি ও পুণে থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল এল লালগোলায়। কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করলেন অধীর চৌধুরী। মামলায় তিনি জিতলেন। মৃত শিশুদের পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেল। তিনি সাম্প্রদায়িক হলে বসতির প্রায় ৮০% মুসলিম অধ্যুষিত লালগোলার জন্য অধীরের পক্ষে এই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব ছিল কি? ছিল না। ২০১৩ সালে বহরমপুর পুরনির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হল। সেই বারই প্রথম তৃণমূল দু’টি আসন পাওয়ায় বিরোধী শূন্য বহরমপুর পুরসভার তকমা মুছে গেল। বহরমপুর কলেজের গণনা কেন্দ্র থেকে অন্য কাগজের এক সাংবাদিকদের সঙ্গে হেঁটে ফিরছি। ওয়াইএমএ মাঠের সামনে আসতেই সেই সাংবাদিকের স্বতঃস্ফূর্ত গর্বিত মন্তব্য, ‘‘এই দু’টি আসন পাওয়া খুব উচিত ছিল তৃণমূলের। খুব ভাল হল!’’ কেন উচিত ছিল? কেন ভাল হল? জবাব মেলেনি। আসলে ঈর্ষার কোনও জবাব থাকে না। তাই পেশাগত সেই সহকর্মীর কাছেও কোন জবাব ছিল না। ডোমকলে এনআইএ আমদানি করেছে আল কায়দার তত্ত্ব। ভুল সোর্স থেকে পাওয়া সেই ভুল তত্ত্বে মিস-গাইডেড হয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। হয়তো সেই সোর্সটাই সাম্প্রদায়িক। ওই একবারই এ জাতীয় ভুল দেখেছি তাঁর। একবারই। পরে ভুল বুঝতে পেরে ভুল সংশোধনও করেছেন তিনি।
তখন বাম আমল। ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের ঘটনা। বহরমপুর শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রয়েছে শ্রীগুরু পাঠশালা ও চালতিয়া বিল। ওই স্কুল ও বিল লাগোয়া অধিকাংশ জমির মালিক ছিলেন ভাবতার জমিদার হাজিরা। বহরমপুর পুরসভার প্রাক্তন উপ-পুরপ্রধান বাবলা ওরফে মঈনুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘‘মুসলমানদের ওই এলাকায় জমি কিনে বসতি স্থাপন করা নিয়ে আপত্তি ওঠে। অধীরদার হস্তক্ষেপে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাদ মেটে। তার পর থেকে ওই এলাকায় শতাধিক মুসলিম পরিবার বসবাস করছে।’’
তারপরেও অধীর চৌধুরীকে সাম্প্রদায়িক বলে গাল পাড়তে হবে? আসলে এটা সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের রীতিমতো ষড়যন্ত্র। অপপ্রচার মাত্র। তবে পরিবর্ততিত পরিস্থিতিতে সব ক্ষেত্রে অধীর চৌধুরীর প্রচেষ্টা ও প্রভাব কাজ করবে ধরে নেওয়াটা যুক্তি ও বিচার সঙ্গত হবে না।
আসলে এ সব সোয়াশো বছরের প্রাচীন রাজনৈতিক অসূয়া-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। বদ-রাজনৈতিক সংস্কৃতির নোংরা উত্তরাধিকার হজম করতেই অধীর চৌধুরীকে নীলকণ্ঠ হতে হয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে সংখ্যালঘু মুসলিম অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলা বিভিন্ন কারণে, বিভিন্ন সূচকের নিরিখে পিছিয়ে থেকেছে। সেখান থেকে এই মুসলিমপ্রধান জেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছেন দু’জন রাজনৈতিক ব্যক্তি। প্রথম জন কয়েক দশক আগের কিংবদন্তি মন্ত্রী, লালগোলার ভূমিপুত্র আব্দুস সাত্তার। দ্বিতীয় জন বহরমপুরের ‘রবিনহুড’ অধীর চৌধুরী। ঈর্ষাকাতর কৃতঘ্নদের মগজ থেকে উদগিরিত বিষ ধারণ করে তিনি এখন নীলকণ্ঠ! গলায় হলাহল ধারণ করেও মমতা সরকারের বিরুদ্ধে মোদী সরকারের ভোট পরবর্তী একাধিক অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করতে ‘সেটিং-অধীর’ কালক্ষেপ করেননি। তিনি যে মননে ও আচরণে ধর্মনিরপেক্ষ ও নীলকণ্ঠ!
ব্যক্তি অধীরকে বুঝতে হলে, রাজনীতিতে তাঁর আবির্ভাবের মাহেন্দ্রক্ষণকে আগে বুঝতে হবে। ভুল পথে চালিত হলেও নকশালপন্থী রাজনীতির উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি কেউ কখনও। আবেগপ্রবণ, মেধাবী তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীর দল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে সব ধরণের শোষণ থেকে মুক্তস্বদেশ গড়তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আগুনপাখিদের অন্তর সদা মানবপ্রীতির রসায়নে ভরপুর ছিল। কৈশোরে চর্চিত সেই অসাম্প্রদায়িক মনন জীবনভর পথ চলার পাথেয় হয়ে থাকে। সেই মননকে যাঁরা সাম্প্রদায়িক বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করেন, আসলে তাঁরাই সাম্প্রদায়িক।

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)