সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ● টেক্সাস

আমি থাকি আমেরিকার তেলের রাজ্য টেক্সাসের হিউস্টনে।

হিউস্টন শুধু পৃথিবীর শক্তিভাণ্ডারের বাণিজ্যিক কেন্দ্রই নয়, এখানকার মেডিক্যাল ব্যবস্থা ও গবেষণা পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে। কিন্তু কোভিড ১৯ দেখিয়ে দিল, এ সব সত্ত্বেও আমরা কত অসহায়, কত নগণ্য, কত সাধারণ প্রকৃতির কাছে! এ রকম এক আমেরিকার যে সম্মুখীন হতে হবে, সত্যিই কোনওদিন ভাবিনি।

চিনের রোগের বার্তা আর তার ছোঁয়া যখন আমেরিকায় এল, তখন আমি সপরিবার ভারতে। ফেরার সময়, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, চিন গিয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করেই আমেরিকার ইমিগ্রেশন অফিসার ছেড়ে দিলেন। তারপর একমাস স্বাভাবিক জীবন। মার্চে প্লেনে করে একটু ছুটিও কাটিয়ে এলাম। প্লেনে এক ভদ্রলোকের ক্রমাগত হাঁচি আমাকে চমকে দিলেও ভয় পাইনি। কারণ অবস্থা তখনও স্বাভাবিক।

যাইহোক, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই শুরু হল গৃহবন্দি জীবন। ছেলেদের স্কুল আর কলেজ বন্ধ। আমাদের কোম্পানি ‘chevron’ আবার ভীষণ সাবধানী। তাই বাড়িতেই সব ব্যবস্থা করে অফিসের কাজ শুরু হল। স্কুল-কলেজও শুরু হল বাড়ি থেকেই। আমার স্ত্রীর গানের স্কুলের কাজকর্মও অনলাইনেই চলল।

চার ঘরে চার জন। চলতে লাগল আমাদের ‘নিউ নর্মাল’ জীবন। ছ’মাস হতে চলল, এখনও চলছে এ রকমই। একটাই সুবিধা, এখানে বাগানবাড়িগুলোতে জায়গা অনেক। তাই ঘরবন্দি কথাটা আমাদের ক্ষেত্রে একেবারে যে ঠিক তা বলা যাবে না। আর সর্বত্রই যাচ্ছি। তবে দরকার মতো। মাস্ক পরে। ছ’ফুট দূরত্ব বজায় রেখে।

আমেরিকা গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় দেশ। তাই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার চালানো পার্টির উপর নির্ভর করে কোথায় কতখানি নিয়ম খাটবে। আবার আঞ্চলিক আধিকারিক ও স্কুল বা কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের মতো সিদ্ধান্ত নেন।

আমাদের পাশের এক রাজ্যে বাইরে থেকে কেউ ঢুকলেই চোদ্দো দিন গৃহবন্দি থাকার নিয়ম। কিন্তু টেক্সাস, নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনও বিশেষ কড়াকড়ি নেই। যদিও মাস্ক পরা, সোশ্যাল ডিস্টান্সিং রুল আছে। তবে রাস্তায় বেরোলে পুলিশ বা কোনও নেতা কর্মী কাউকে ধরবে না। দোকানে নিয়ম থাকলে তা পালন করা বাধ্যতামূলক।

এর মধ্যে মধ্যে অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমরা একদিন ‘গ্যালভেস্টন’, মানে এখানকার দিঘায় গিয়েছিলাম। দেখলাম, এই করোনা আবহেও চার-পাঁচ কিলোমিটার বিচে গাড়ি রাখার জায়গা পাওয়া দুষ্কর। প্রচুর লোক সমুদ্রে ঝাঁপাচ্ছে। এখানে মাস্ক নীতিরও দেখলাম বালাই নেই তেমন।

আমরা প্রথমে বেশি জিনিস সংগ্রহ বা কিনে রাখিনি। কিন্তু মার্চের দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই বহু জিনিসের আকাল দেখা গেল। অসুবিধায় পড়তে হল। এখন এ অবস্থা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এলেও পুরো হাল কিন্তু ফেরেনি।

ধীরে ধীরে এখন স্কুল, কলেজ খুলছে। ‘অন লাইন’ আর ‘ইন-পার্সন’ দুটো ব্যবস্থাই রয়েছে। স্কুলগুলো দরকার মতো কম্পিউটার বা অন্য আবশ্যিক জিনিস ধার দিচ্ছে যাঁদের প্রয়োজন তাঁদেরকে। পুরো ব্যবস্থা খুব পরিকল্পনামাফিক। কলেজগুলোতেও একই অবস্থা। তবে সর্বত্রই কড়াকড়ি কম। সবাই একটু ভয়েই আছে, যদি অবস্থার অবনতি হয়!

মার্চ-এপ্রিলে সরকার আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারদের কিছু অর্থদান করেছিল। কিন্তু সে অর্থের পরিমাণ ছিল খুবই কম। এতে অনেকেরই প্রয়োজন মেটেনি। বহু লোকের চাকরি যাওয়ার ফলে অর্থ-ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খেয়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, জোগান কমেছে। জিডিপি কমে যাওয়ায় অর্থের ঘাটতি বেশ প্রকট। এটা সামলাতে এখন বেশ কয়েকবছর লেগে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

আর্থিক ব্যবস্থা এমনিতে সব দেশেই অবশ্য ভেঙে পড়েছে। এখানে আলাদা কিছু না হলেও চিত্রটা আগের সঙ্গে তুলনা করলে একটু বেশিই যন্ত্রণাদায়ক। আমেরিকা আর তার লোকেরা দান-অনুদানের জন্য খ্যাত। দেশের (ভারতের) দরকারে এখানকার এনআরআইরা সর্বদাই এগিয়ে যান। তাঁদের অনেককেই চাকরি খুইয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে বা হচ্ছে।

এরই মধ্যে আমরা রয়েছি। ভয়, যন্ত্রণা নিয়ে। সাধারণত আমাদের ‘কাজের লোক’ বলে কেউ বাড়ির কাজে সাহায্য করতে আসেন না। খরচে পোষাবে না। নিজেদের সব কাজ এখানে নিজেদেরকেই করতে হয়। ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিশাল পরিবর্তন অনুভব করিনি। শুধু ‘সোশ্যাল’ ব্যাপারটা ‘ভার্চুয়াল’ হয়ে গিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here