দীপক সাহা

২১ মে, ২০২১। করোনা বিচ্ছিন্ন করে দিল ভালোবাসার আলিঙ্গনকে। পরিবেশ হারালো তার এক রক্ষাকর্তাকে। আক্ষরিক অর্থেই হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের জনগণ (বিশেষ করে শ্রমজীবী মহিলারা) আজ অভিভাবকহীন। সুন্দরলাল বহুগুণা, এক নির্ভীক গাঁধীবাদী পরিবেশবিদ। যিনি তাঁর স্ত্রী বিমলাকে এই শর্তে বিয়ে করেছিলেন যে, তাঁরা গ্রামীণ মানুষের মধ্যে বসবাস করবেন এবং গ্রামে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি তাঁর জীবন নিঃস্বার্থভাবে উৎসর্গ করেছিলেন সভ্যতার অত্যাচার থেকে পরিবেশকে রক্ষা করতে।
তাঁর প্রতিবাদী পার্থিব কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হলেও, তাঁর আদর্শ ও কর্মকাণ্ড আমাদের আগামী পথ চলার পাথেয়। যাঁরা পৃথিবীকে সুন্দর ও স্বাভাবিক দেখতে চান তাঁদের কাছে সুন্দরলাল বহুগুণা এক বন্দিত নাম। চিপকো আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সুন্দরলাল বহুগুণা ১৯২৭ সালের ৯ জানুয়ারি উত্তরাখণ্ডের তেহারির নিকটে মারোদা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নিয়ে পরিবেশ আন্দোলন এখন গোটা পৃথিবী জুড়েই হচ্ছে। ভারতে এ আন্দোলনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো চিপকো আন্দোলন। উত্তরাখণ্ডে গাছ ও বন রক্ষার জন্য গাছকে জড়িয়ে ধরে যে অহিংস আন্দোলন হয়েছিলো সত্তরের দশকে, তা-ই চিপকো আন্দোলন নামে পরিচিত।
হিন্দিতে ‘চিপকো’ শব্দের অর্থ ‘জড়িয়ে ধরো’ বা ‘আটকে থাকো’। আর গাছকে জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনটি গড়ে উঠেছিল বলে এর নাম ‘চিপকো আন্দোলন’। ১৯৭৩ সালে উত্তরাখণ্ডে কারখানা স্থাপনের জন্য তৎকালীন আমলারা ১০০ গাছ কাটতে উদ্যোগী হন। কিন্তু এ কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ান গ্রামের দুই যুবক— সুন্দরলাল বহুগুণা ও গাঁধীবাদী সমাজকর্মী চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট। গাছকে জড়িয়ে ধরে তাঁরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের একটাই লক্ষ্য, যে ভাবে হোক গাছ ও বন নিধন বন্ধ করে পরিবেশকে রক্ষা করা।
অবশ্য এ আন্দোলনের ভিত্তি রচিত হয় আরও দুই শতাব্দী আগেই। তখন ১৭৩০ সাল। রাজস্থানের প্রত্যন্ত অঞ্চল খেজারিলি গ্রামে একটি রাজপ্রাসাদ গড়ার পরিকল্পনা করলেন তৎকালীন মেওয়ারের রাজা অভয় সিং। রাজার নেতৃত্বেই শুরু হয় গাছ কাটা কর্মসূচি। আর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান তিন সন্তানের মা অমৃতা দেবী। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন গ্রামের বিষ্ণোয়ই সম্প্রদায়ের লোকেরাও। গাছের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখে শুরু হয় এ আন্দোলনের প্রথম প্রতিবাদ। আর এ ভাবেই গাছকে জড়িয়ে ধরে রাখা অবস্থাতেই রাজার সৈন্যদের হাতে তাঁদের প্রাণ দিতে হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় আটকে আছে সে মর্মান্তিক কাহিনি।
এরপর ১৯৬৩ সালে চিন-ভারত যুদ্ধের অবসানের পর উত্তরাখণ্ডে এ আন্দোলন আবার শুরু হয়। তখন কিছু সংস্থা উত্তরাঞ্চলের, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলগুলোর বনজ সম্পদ দখল করতে উদ্যোগী হয়। সরকারের প্রশ্রয়ে শুরু হয়ে যায় বৃক্ষনিধন। বাণিজ্যিক কারণে এ ভাবে বৃক্ষনিধনের ফলে কৃষির ফলন কমে যাচ্ছিল। ভূমিক্ষয়, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছিল সমগ্র অঞ্চলটির উপর। বনাঞ্চল বাঁচাতে আন্দোলনের প্রথম সূত্রপাত হয় উত্তরাখণ্ডের চামেলি জেলায়, পরে তা দ্রুত ভারতের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৪ সালে সরকার কর্তৃক ২,০০০ গাছ কাটা হলে বিক্ষোভ চরমে ওঠে। এ আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন সুন্দরলাল বহুগুণা। সুন্দরলাল এবং তাঁর স্ত্রী বিমলা দু’জনে মিলে সারা দেশের কাছে আন্দোলনের বার্তা পৌঁছে দিতে মানুষের দোরে দোরে ঘোরেন। ১৯৮১-৮৩ সালে তিনি চিপকো আন্দোলনের খবর পৌঁছে দিতে প্রায় ৫,০০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করেছিলেন। সুন্দরলাল গ্রামে গ্রামে গিয়ে নারী, পুরুষ, ছাত্রদের এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। প্রায় দেড় শতাধিক গ্রাম চিপকো আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল।
উত্তরাঞ্চলের এ প্রতিবাদের খবর রাজধানীতে গিয়ে পৌঁছলে তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেম্বতি নন্দন বহুগুণা একটি কমিটি গঠন করেন, যা শেষপর্যন্ত গ্রামবাসীর পক্ষে রায় দেয়। এরপর ইন্দিরা গাঁধী ক্ষমতায় এলে তিনি ১৫ বছর হিমালয় অঞ্চলে গাছ কাটার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। হিমালয় প্রদেশ, কর্ণাটক, রাজস্থান, পশ্চিমঘাটেও পরে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় এবং এক দশকের মধ্যে হিমালয় জুড়ে সবুজের জন্য এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের মতো পিতৃতান্ত্রিক একটি সমাজ ব্যবস্থায় চিপকো আন্দোলন অভাবনীয় অবদান রাখে নারীদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। সর্বপ্রথম এ আন্দোলন শুরু হয় একজন নারী; অমৃতা দেবীর হাত ধরেই। এ অঞ্চলের কৃষির সঙ্গে নারীরা যুক্ত থাকায় তাঁরা এই বিক্ষোভে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন গৌড়া দেবী, সুদেশা দেবী, বাচ্চনি দেবী, চণ্ডী প্রসাদ ভট্ট, ধুম সিং নেজি, শমসের সিং, গোবিন্দ সিং রাওয়াত প্রমুখ।
সুন্দরলাল বহুগুণা ২০০৯ সালে ভারতের অসামরিক সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েও তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর বিনীত যুক্তি ছিল, যতদিন না দেশের সকল নাগরিকদের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততদিন তিনি এ পুরস্কার গ্রহণ করতে পারবেন না। সবুজকে বাঁচাতে গাছের সঙ্গে নিজেকে আটকে রেখে যিনি রক্ত ঝরিয়েছেন, তাঁকে মনে রাখবে সকল পরিবেশপ্রেমী। তাঁর আত্মত্যাগ, সাহস ও প্রেরণা জোগাবে ভবিষ্যৎ পরিবেশ রক্ষাকারী আন্দোলনকারীদের। তাঁর দৈহিক প্রস্থানের মধ্যে দিয়ে তিনি বর্তমান প্রজন্মের কাঁধে এক গুরুদায়িত্ব সঁপে দিলেন, সমগ্র দেশব্যাপী পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। আর সেই সচেতনতার অঙ্গীকারেই আমরা এই মহান পরিবেশবিদ ও সমাজসেবীকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় আলিঙ্গন করব।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)