সুদীপ জোয়ারদার

জরুরি প্রয়োজনে ফোন করেছিলাম বন্ধুকে। ফোন বেজে গেল বার কয়েক। কিন্তু বন্ধুর সাড়া মিলল না। রাতে সব প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরে বন্ধুর ফোন এল, ‘কল করেছিলি? ধরতে পারিনি। ছেলের অনলাইন ক্লাস চলছিল।’

আজকাল এরকমই হয়েছে। ফোন করে অনেক সময়েই ধরা যাচ্ছে না নিকটজনকে। বাড়িতে বাড়িতে মোবাইল ফোন এখন খুদেদের দখলে। অনলাইন ক্লাস। গুগল মিট খুলে বাড়ির খুদেটি স্কুলের বেঁধে দেওয়া সময়ে হুমড়ি খেয়ে বসে রয়েছে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে। উল্টোদিকের স্ক্রিনে স্যরের মুখ, ‘আমাকে দেখতে পাচ্ছ সবাই? কথা শোনা যাচ্ছে?’

দেখা সব সময় যায় না। কথা শোনা বা শোনানোও যায় না। কারণ নেট সার্ভিস এই ভাল তো এই মন্দ। কিন্তু ক্লাস কি থেমে থাকবে? সে তো এগিয়ে চলবে সেখানকার ব্যবস্থাপনায়! সুতরাং ক্লাস চলছে, কিন্তু ক্লাসের সঙ্গে তাল মেলানো যাচ্ছে না প্রায়ই।

ক্লাস শেষে কখনও হয়ত কোনও খুদের হতাশা, ‘আমার অঙ্কটা দেখাতেই পারলাম না স্যরকে!’

এ দিকে বহু গাঁ-গঞ্জে বোতাম টেপা মোবাইলের তুলনায় অ্যান্ড্রয়েড ফোন কম রয়েছে। যা-ও আছে, সেগুলো থাকলেই বা কী? নেট ব্যবস্থা অনেক জায়গাতেই খুব দুর্বল। কোনও কোনও জায়গায় এক কোম্পানির নেট থাকে তো অন্যটার নয়। আবার কোনও কোনও জায়গা নেটের আওতার বাইরে। তাই গ্রাম-গঞ্জের স্কুলে অনলাইনে ক্লাস এককথায় অসম্ভব ব্যাপার।

শহরের কিছু স্কুল পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। কিন্তু সে-ও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো অবস্থা। এবং সে ঘোলেও ওই নেটেরই গোলোযোগে হাজার গন্ডগোল।

তাহলে করণীয় কি? সেই যে মার্চে করোনার কারণে স্কুলের ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে, সে ঝাঁপ খুব শিগ্গির খোলার সম্ভাবনাও নেই। সেপ্টেম্বরে যদি জোর করে স্কুল খুলেও দেওয়া হয়, অনেক অভিভাবকই সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে রাজি হবেন না। কারণ তাঁরা মনে করেন, জীবনের চেয়ে শিক্ষা বড় নয়।

এ দিকে অনলাইন ক্লাসের হিড়িকে যে মোবাইল থেকে ছোটদের দূরে রাখা উচিত বলে সব সময় ডাক্তার-বদ্যিরা এতদিন চেতাবনি দিয়ে গিয়েছেন, এখন সেই মোবাইলই ছোটদের আশ্রয় হয়ে উঠেছে। এর কুফলও তো কম নয়।

তা হলে কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেদিনীপুরের দাসপুরের সেই স্কুলের মতো ক্লাস চালু করে দেওয়াই সমাধান? ওই স্কুলের স্বাস্থ্যবিধি যতটুকু দেখা গিয়েছে সংবাদমাধ্যমে খুঁত ধরা যাবে না। কিন্তু এই স্বাস্থ্যবিধি সব জায়গায় রক্ষা করা যাবে কি? গ্রামের দিকে এখনও রাস্তায় মাস্ক না-পরা লোকের সংখ্যাই বেশি। যাঁদের মুখে মাস্ক রয়েছে, তাঁদেরও অনেকের কাছে মাস্ক পরাটা নিয়মরক্ষার শামিল। মাস্কের প্রকৃতিও ঠিক নেই, মাস্ক নেই মুখের সঠিক জায়গাতেও। শিক্ষকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এখন সে সব স্কুলে হাজির হচ্ছেন বিদ্যালয়ের একাদশ-দ্বাদশের ভর্তি এবং অন্য কাজ সামলাতে।

স্কুল শিক্ষকদের বোর্ড থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া চলছে অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারে। শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য পড়ুয়াদেরকে দেওয়া হয়েছে টোল ফ্রি নম্বর। সময়ও বলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতেও সাড়া মিলছে কই!

কারণ, এত আয়োজন, এত ভাবনাচিন্তা যাদের জন্য তাদের মধ্যে পড়াশোনার ইচ্ছে এখন কতটা? যাদের মধ্যে রয়েছে তাদেরও স্কুল নির্ভরতা কম। তাই টোল ফ্রি নম্বর দিলেও তার মাধ্যমে যোগাযোগের সেতু রচনা করে পড়াশোনা চালু কতটা সফল হবে বলা কঠিন।

তবে পড়ুয়ারা ফোনে যোগাযোগ করছে না তা কিন্তু নয়। কিন্তু তা পড়াশোনার ব্যাপারে খুব একটা হচ্ছে না। কবে ভর্তি, কবে ফর্ম ফিল-আপ, বিবিধ স্কলারশিপ, অনুদানের খোঁজখবরেই সীমাবদ্ধ থাকছে বেশিরভাগ ছাত্র-পড়ুয়ার কথোপকথন। এ বারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সব পরীক্ষা না দিয়েও যে অপর্যাপ্ত নম্বর হস্তগত হয়েছে একেবারে নিম্নমেধার ছাত্রদের, তা পড়াশোনার ইচ্ছেতে জল ঢেলে দিয়েছে অনেকেরই।

শহরকেন্দ্রিক যে সমস্ত ইস্কুলে (বেশিরভাগই বেসরকারি) অনলাইন পড়াশোনা চলছে, সেখানে ক্লাসে যে বোঝা চাপত এখন তার ঢের বেশি বোঝা চাপানো হচ্ছে পড়ুয়াদের ঘাড়ে। সে সব সামলাতে তাঁদের একেবারে ওষ্ঠাগত প্রাণ। স্বাভাবিক সময়ে পালা-পরবে তাদের ছুটি ছিল। এখন সে সব গিয়েছে। সবসময়েই অনলাইনে সারি বেঁধে আসছে প্রশ্নমালা।

করোনার জন্য শুধু বাড়ির বড়রা নয়, ছোটরাও রয়েছে যথেষ্ট ভয়ে। তার উপর তাঁদের বিকেলের মাঠ গিয়েছে, গিয়েছে স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে মজা-মশকরা, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা-আইসক্রিম খাওয়া এখন যেন মনেও পড়ে না। এই অবস্থায় অনলাইন চাপ সামলাতে বিরস মুখে সারাদিন শুধু খাতা-বইয়ে ব্যস্ত থাকা অন্য কোনও বিপদ ডেকে আনছে না তো! পড়াশোনা জীবনের জন্য দরকার, তা বলে এতটা!

আমাদের বড়দের বোধবুদ্ধি কি লোপ পেয়েছে যে ভেবেও দেখছি না, যাদের জন্য এতকিছু, কেমন রয়েছে তারা বা তারা কী চায়। পড়াশোনায় এক আধটা বছর এদিক-সেদিক তো এমনিতেই কতজনের হয়ে থাকে। জীবন তার জন্য থেমে থাকে না। সফলতার নুড়ি কুড়িয়ে সে ঠিকই পৌঁছে যায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যে। এমন বহু উদাহরণ রয়েছে।

সারা বিশ্ব যেখানে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, চুপচাপ অপেক্ষা করছে নতুন ভোরের, সেখানে আমরা কোথাও ছোটদের এই অসময়েও ঠেলছি জোরে ছোটার জন্য। আবার কোথাও তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় নির্ঘুম কাটছে আমাদের রাত, কখনও বা নানা পরিকল্পনায় কাটছি ব্যর্থ আঁকিবুঁকি। সত্যিই এ যেন এক বিষণ্ন কৌতুক।

ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here