অনল আবেদিন

যশ-এর দুর্নিবার দুর্যোগ উপেক্ষা করে দুর্গতদের উদ্ধার করতে দুই তরুণ-তরুণী সমুদ্রতটে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলছেন। ২৬ মে বিরূপ মন্তব্য-সহ এমন একটি ভিডিয়ো ক্লিপিং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। আসলে অসততার আশ্রয় নিয়ে হাঁটুজলে সাঁতার কাটার অভিনয় করা হয়েছে। তার জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার ও চ্যানেলটিকে নেটিজেনদের কাছ থেকে ভার্চুয়ালি বিস্তর কিল-চড়-ঘুষি পেতে হয়েছে। সেই একই মুদ্রার অন্যপিঠে আছেন সুচন্দ্রিমা। সেটিও সমান সত্য। সুচন্দ্রিমারাও ভনিতাহীন ভাবে চরম সত্য।
কলকাতা টিভির বিশিষ্ট সাংবাদিক সুচন্দ্রিমা ও তাঁর গাড়ির চালক যশের ‘আঁখো-দেখি’ তাণ্ডব দেখাতে গিয়ে গত ২৬ মে মৃত্যুর নিশ্চিত গ্রাস থেকে কোনও মতে বেঁচে ফিরেছেন। তাঁদের গাড়ি ডুবে গিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের বিপন্ন সংবাদকর্মীদের আন্তরিক চেষ্টায় সুচন্দ্রিমারা কোনও ক্রমে জীবন ফিরে পেয়েছেন। টিআরপি ও অধিক অর্থ আয়ের বিষয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নেটিজেনদের একাংশ সুচন্দ্রিমাদের নিয়ে খিল্লি করেছেন। করছেনও। সাংবাদিকদের চরম বিপন্ন অবস্থা নিয়ে খিল্লি করে নিজেদের বিকৃত মনের সাধ মিটিয়েছেন অনেক বিজ্ঞ-নেটিজেন। তাই নিয়েই এই লেখা। কাজের প্রতি নেশাগ্রস্ত সংবাদকর্মীদের এই রকম পরিণতি, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা না থাকলে সম্ভব নয়। সেই অন্তর্নিহিত অভিজ্ঞতা নিয়ে এই লেখা।
সময়টা ১৯৯৬ সালের ৩০ অগস্ট। পদ্মার সর্বগ্রাসী বন্যায় মুর্শিদাবাদ জেলার রানিতলা থানার আখরিগঞ্জ, শিবনগর ও বাংলাদেশ লাগোয়া পদ্মার দু’টি শাখানদীর মধ্যবর্তী এলাকার নির্মলচর জলের তলায় প্রায় তলিয়ে গিয়েছে। বন্যা ‘কভার’ করতে কলকাতা থেকে এলেন এক ফটোগ্রাফার। নৌকায় করে পদ্মার পাড় বরাবর শিবনগর, আখরিগঞ্জের মতো গ্রামগুলো ঘুরে, বানের জলে ডুবুডুবু পানীয় জলের নলকূপের ছবি তুলে তিনি কলকাতা ফিরে গেলেন। বাংলাদেশের সীমানা লাগোয়া ৮ কিলোমিটার বিস্তৃত উত্তাল পদ্মার ওপারে দিন ২০ ধরে বানের জলে হাবুডুবু খাওয়া নির্মলচরে তিনি গেলেন না। প্রকৃত বানভাসিদের সঙ্গে চিত্রসাংবাদিকের এ হেন নির্দয় আচরণে মনে মনে রুষ্টই হলাম। বনার্তদের উদ্ধার করতে ওই দিন রাতেই ২০-২৫ টি সামরিক গাড়ি বোঝাই আধা সামরিক বাহিনী এসে পৌঁছল বহরমপুর ব্যারাক স্কোয়ার ময়দানের চার পাশে।
পরের দিন সকালে স্থানীয় বিধায়ক আবু সুফিয়ান ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে পাড়ি দিলাম নির্মলচরের উদ্দেশে। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বুঝি নৌকা ডুবল। নৌকার মাথার উপর দিয়ে ঢেউ চলে যায়। নির্মলচরের বাড়িঘর সব জলের তলায়। কেউ কিলোমিটার দুয়েক দূরের বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কোনও ভাবে জেগে থাকা চালের মাথায়। বিশ দিন ত্রাণ না পাওয়া বন্যার্তদের খবর সংগ্রহ করে ও ছবি তুলে প্রাণ হাতে করে ফিরছি। সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। আখরিগঞ্জের পদ্মাপাড় থেকে প্রায় আধ কিলোমিটার দূরে আছি। সেখান থেকে আর্তনাদ ভেসে আসে। সেই আর্তনাদ পদ্মাপাড়ে ভিড় করে থাকা জনতার। কয়েকটি স্পিডবোট আধা সেনাদের নিয়ে উত্তল পদ্মায় ভাসছে। পাড়ে এসে জানলাম, একটি স্পিডবোট নিয়ে তিন জন জওয়ান নিরুদ্দেশ। তাঁদের হদিস করতে গিয়ে ৬ জন-সহ একটি ভুটভুটিও নিখোঁজ।
পরের দিন একমাত্র আমাদের কাগজেই এবং প্রথম পৃষ্ঠায় খবরটি প্রকাশিত হয়। ঘরে বসে থাকা চার জন সাংবাদিক এই খবর জানতে পারেননি। তাই তাঁরা খবরটিই ভুল প্রমাণ করার জন্য সেই সময়ের অতিরিক্ত জেলাশাসক মনোজ পন্থের দ্বারস্থ হন। পন্থ তাঁদের বলেন, ‘‘তিন জওয়ান-সহ নিরুদ্দেশ ৯ জনকেই বাংলাদেশের বিডিআর উদ্ধার করে ফেরত পাঠাচ্ছে। তাকে ভুল বলি কী করে!’’
সাংবাদিক-জীবনের সঙ্গে এ জাতীয় আরও অনেক ঘটনা জড়িয়ে আছে। সে সব আজ থাক। আসলে এই ঘটনার অবতারণার কারণ সাংবাদিকতার শ্রেণি চরিত্র নির্ণয় করা। মিডিয়া হাউসের কয়েক হাজার টাকা খরচ করে বানের জলে নিমজ্জিত নলকূপের ছবি তুলে কলকাতায় ফিরে যাওয়া ক্যামেরা-পার্সন ও মনোজ পন্থের কাছে ঠিক ঘটনাকে ভুল প্রমাণ করতে যাওয়া ঘরে বসে থাকা সাংবাদিকেরা একই জাতের। সুচন্দ্রিমারা অন্য জাতের। কেবল পেশার টানে জান বিপন্ন করে সুচন্দ্রিমা হওয়া যায় না। তাঁর মতো হতে গেলে মানুষের প্রতি মমত্ব এবং জীবনাচরণে সততা থাকা জরুরি। তাই হাঁটুজলে সাঁতারের ছবি দেখে ‘সব শেয়ালের এক রা’ বললে চলবে না। মুড়ি, মিছরি এক করা উচিতও নয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফাঁকি মেরে নিজের ঘরে টিউটেরিয়াল ক্লাস খুলে মগ্ন থাকা শিক্ষকদের একাংশ, সরকারি হাসপাতালে নমো নমো ডিউটি সেরে প্রাইভেট চেম্বার নামের দোকান খুলে বসে থাকা ডাক্তারদের একাংশ, কোভিডকালে বিপন্নদের স্বেচ্ছা পরিষেবা দেওয়ার পরেও ভোট না পাওয়ায় কিছু রেড ভলান্টিয়ারের আফসোস করাটাই একমাত্র সত্য নয়। ফলের আশা না করেই অনেক রেড ভলান্টিয়ার প্রাণ বাজি রেখে আজও বিপন্নদের পাশে আছেন। নাম না জানা, প্রচারের তোয়াক্কা না করা অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সদস্যেরা সেবাধর্মে আজও ব্রতী। উদয়াস্ত গলদঘর্ম হয়ে আজও বহু শিক্ষক-শিক্ষিকা তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রাণপাত করেন। আজও বহু চিকিৎসককে ভগবান বলতে ভালোবাসেন তাঁদের রোগীরা। এই দ্বিতীয় দলেরই মধ্যমণি, সাংবাদিক সুচন্দ্রিমা। তার আরও একটি পাথুরে প্রমাণ পাবেন, কলকাতা টিভির ‘চতুর্থ স্তম্ভ এবং সুচন্দ্রিমা’ নামে নিয়মিত এপিসোডের বিষয় নির্বাচন ও পরিবেশন থেকে। পচনে পিষ্ট এই সমাজে আজও কিছু রৌদ্রকরোজ্জ্বল হৃদয় আছে। প্রশংসা না করুন, কুয়োর ব্যাঙের দর্শনে আটকে থেকে তাঁদের নিয়ে খিল্লি করবেন না প্লিজ!

নির্মলচরের ছবি ঋণ— আনন্দবাজার পত্রিকা