কল্লোল প্রামাণিক বহরমপুর
শঙ্কর মণ্ডল হোগলবেড়িয়া

সরাসরি যশের প্রভাব না পড়লেও বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে নদিয়া-মুর্শিদাবাদের কোথাও কোথাও চাষের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মুর্শিদাবাদ কৃষি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বছর ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ মে পর্যন্ত জেলার স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৯২ মিলিমিটার। সেখানে বৃষ্টি হয়েছে ২৪২ মিলিমিটার। অর্থাৎ প্রায় ২৮ শতাংশ অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়েছে।
শুধু বৃহস্পতিবারেই চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৭৫ মিলিমিটার। যার জেরে মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু চাষের জমিতে জল জমেছে। বিশেষত নিচু জমিতে কোথাও কোথাও হাঁটু জলও জমেছে। রানিনগর, দৌলতাবাদ, হরিহরপাড়া, নওদা, বড়ঞা, খড়গ্রাম, কান্দি ও রঘুনাথগঞ্জ ২ এলাকায় নিচু জমিতে থাকা পাট, তিলের খেতে জল জমেছে। এ ছাড়া সামান্য হলেও মাঠে কাটা অবস্থায় পড়ে থাকা বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। জলঙ্গি ও রানিনগরের চর এলাকায় কিছু বাদাম চাষের জমিও জলমগ্ন হয়েছে। নওদার বাইতিগাছা গ্রামের মিলন মণ্ডল বলছেন, ‘‘বিঘা আটেক জমিতে পাট আছে। এ দিকে যশের প্রভাব না পড়লেও বৃষ্টির ফলে খেতে জল জমে গিয়েছে।’’ মুর্শিদাবাদের এক আনাজ ব্যবসায়ী জানাচ্ছেন, বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে বেশ কিছু এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আনাজচাষ। জমিতে জলও জমেছে বেশ কিছু জায়গায়। এমনিতেই করোনার নানা নিয়মে ব্যবসার অবস্থা ভাল নয়। এ বার আনাজের দাম বেড়ে গেলে আর রক্ষা নেই। তবে যশের প্রভাব পড়লে আর দেখতে হত না।
কৃষি দফতরের কর্তারা জানিয়েছেন, পাটের জমিতে জল জমায় গোড়াপচা রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তিল চাষেও একই ধরনের রোগ হতে পারে। কৃষি দফতরের কর্তারা ওই সব জমির জল দ্রুত বের করে দেওয়ার পাশাপাশি কৃষি আধিকারিকদের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ প্রয়োগের কথা বলছেন। বাদাম চাষেও রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণে কৃষি দফতরের পরামর্শ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। মুর্শিদাবাদের উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) তাপসকুমার কুণ্ডু বলেন, ‘‘বৃষ্টির জেরে জেলার বেশ কিছু ব্লকে তিল চাষের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্য ফসলের কী অবস্থা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
অন্যদিকে নদিয়ার শান্তিপুর ও চাকদহ এলাকায় ঝড়ে ফসলের ক্ষতি হলেও অন্য জায়গায় খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। হোগলবেড়িয়ার চামনা গ্রামের কলাচাষি অমর বিশ্বাস জানান, আবহাওয়া দফতরের দেওয়া পূর্বাভাসে চাষিরা সতর্কতার পাশাপাশি যথেষ্ট আতঙ্কে ছিলেন। তবে বুধবার ঘূর্ণিঝড় যশ রাজ্যের দিঘা উপকূলে আছড়ে পড়লেও এখানে সেই ঝড়ের তেমন প্রভাব পড়েনি। ফলে স্বস্তি ফিরেছে চাষিদের। এলাকার জমিতে এখন পাট, কলা, পেঁপে ছাড়াও পটল, লঙ্কা কিংবা বেগুন চাষের ভরা মরসুম। যশের সামান্য প্রভাব পড়লেও এই সব তৈরি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারত। কৃষি দফতর ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারে ঝড়ের খবরে বেশিরভাগ চাষি সস্তা দামেও গাছের কলা বিক্রি করে দেন। কলা গাছ ভাঙা রুখতে অনেকে বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছগুলিকে শক্ত করে বেঁধে দেন। অমর বলেন, “ঝড়ের ভয়ে বাগানের কিছু গাছের পুষ্ট কলা বিক্রি করে দিয়েছি। আর বাকি কলার গাছ বাঁধার জন্য এক মাসের জন্য অন্য চাষির থেকে বাঁশের খুঁটি ভাড়া নিয়েছি।”
মধুগাড়ি গ্রামের আনাজ চাষি রতন মণ্ডল জানান, পটল ও লাউয়ের মাচা শক্ত করে বাঁধার পরেও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। কারণ ঝড়ের যা দাপট হওয়ার কথা ছিল তাতে মাচা বাঁধার পরেও পটল ও লাউয়ের ক্ষতি এড়ানো যেত না। কাছারিপাড়ার বেগুন চাষি শুভেন্দু বিশ্বাস বলেন ‘‘এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। এক বিঘা বেগুন চাষ করতে যা খরচ হয়েছে তার দশ শতাংশও এখনও ওঠেনি। ঝড় এবং অতিবৃষ্টিতে বেগুন নষ্ট হয়ে গেলে প্রচুর ক্ষতি হয়ে যেত।” নদিয়ার উপ কৃষি অধিকর্তা (প্রশাসন) রঞ্জন রায়চৌধুরী জানান, জেলার কয়েকটি ব্লকে ঝড়ে ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া কিছু নিচু জমিতে জল জমে গেলেও বেশিরভাগ জায়গায় বৃষ্টিতে চাষের উপকার হয়েছে। পাটে শোষক পোকা বা মাকড়ের কিংবা আনাজ চাষে সাদা মাছির যে অত্যাচার হয় এই বৃষ্টিতে সেই উপদ্রব কমবে।

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)