অনল আবেদিন

বালেশ্বর-দিঘার সমুদ্রোপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যশ আছড়ে পড়ে গত ২৬ মে সকালে। তার দিন দুয়েক আগে থেকে দেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম সেই চূড়ান্ত রকমের অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর সংগ্রহ করতে শুরু করে। এটাই স্বাভাবিক। সেই খবর সংগ্রহের ধরন নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নেট-দুনিয়া তোলপাড়। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক সুচন্দ্রিমা ও তাঁর গাড়ির চালকের অবধারিত মুত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরার বিষয়টি এই তুমুল তোলপাড়ের কেন্দ্রবিন্দু। সংবাদ জগতের দিকপালদের কেউ দায় পালন করতে গিয়ে সুচন্দ্রিমাদের প্রায় প্রাণঘাতী ভূমিকায় আপ্লুত। আবার কেউ নাম না করে সুচন্দ্রিমাদের ভূমিকা নিয়ে ‘মাত্রাজ্ঞান’ ও ‘পরিমিতিবোধ’ এর প্রশ্নও তুলেছেন।
সেই ঘটনার মর্মে প্রবেশ করার আগে একটু অন্য কথা বলি। পরিমিতিবোধ ও কাণ্ডজ্ঞানের প্রতি সদয় হতে গিয়ে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী মিডিয়া হাউস যদি ছবিতে, লেখায় ও কথায় টপকে যায়, তখন কিন্তু এই পরিমিতিবোধের বার্তাবাহকদের দাঁত খিঁচুনি সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীদের বরাতে অবধারিত ভাবে বর্ষিত হয়। মাঠেঘাটে কাজ করা সংবাদকর্মীরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় হাড়ে হাড়ে এই অনিবার্যতার কথা জানেন। এমনকি তখন চোখের জল ও ঝড়ের জল এক করা বিধ্বস্ত সংবাদকর্মীদের চাকরি ‘নট’ হওয়ার হুমকিও মিলতে পারে।
আসলে সব কথা, সব ক্ষেত্রে, সব সময়, একই ভাবে খাটে না। মাইক্রোওভেন, ফ্রিজ ও চিমনি সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক মডিউলার কিচেনের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে কোন রান্নায়, কোন মশলা কী পরিমাণ দিতে হবে, তার মাত্রাজ্ঞান রক্ষা করা বেশ সহজ। অন্তত দক্ষ রাধুনির ক্ষেত্রে সেই পরিমিতিবোধ আশা করা খুবই স্বাভাবিক। নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে পোড়খাওয়া চাষির পক্ষে কিন্তু ঝড়বৃষ্টির তুফানরাতে পটল, করলা, শসা, সিমের মতো আনাজের মাচা অক্ষত রাখা প্রায় কষ্টকল্পনা। কার্যত সম্ভবই নয়। ঝড়ের দাপটে টালমাটাল মাচার বাঁশ-কাঠের খোঁচায়, শিলাবৃষ্টির আঘাতে অভিজ্ঞ কৃষকেরও অনেক সময় প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত হয়। ঝড়ের রাতে সাপখোপের সৌজন্যে অসময়ে অক্কা পাওয়ার সম্ভবনা প্রবল হয়। তাই মডিউলার রান্নাঘরের, মানে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত এডিটোরিয়াল ডেস্কের মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধ রূঢ় বাস্তবের যুদ্ধক্ষেত্রের সাংবাদিকদের কাজে দেয় না। নিজেকে পরিমিতিবোধের নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যেতে গেলে নিয়তির হাতে শস্যখেতের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিয়ে পালাতে হবে। নয়তো প্রাণবাজি রেখে শস্যখেত রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। প্রকৃত সাংবাদিকতার প্রতি, পেশার প্রতি, মানুষের প্রতি, সততার প্রতি দায়বদ্ধতাটা এমনই একটা বিপদসঙ্কুল মহৎ কাজ। নান্য তৃতীয় পন্থা। এখানে তৃতীয় কোনও বিকল্প নেই।
প্রকৃত সাংবাদিকদের কাছে উদ্দিষ্ট সংবাদটাই তখন অর্জুনের পাখির চোখ। ফলে সজ্ঞানে ও অবসর সময়ে চাইলেও কাজের সময় তিনি মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারেন না। বাস্তবিক কারণেই সম্ভব হয় না। তখন অন্য এক ঘোর কাজ করে। অন্য এক বোধ কাজ করে। সেই বোধ, সেই ঘোর ফুট-গজ-মিটার দিয়ে মাপা যায় না৷ বড়জোর তা সৎ অনুভবের আধারে কিছুটা অনুভব করা যেতে পারে। সুচন্দ্রিমারাও তাই মাত্রাজ্ঞানের পরিচয় দিতে পারেননি। সম্ভবও ছিল না। কবিগুরুর কথায়, “জীবনে জীবন যোগ না হলে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।” সংবাদ কি তবে সঙ্গীত? কবিতা? কখনও শিল্প হতে পারে? কেন নয়? কবি বিষ্ণু দের কথায় “সংবাদ মূলত কাব্য।” তাঁর আস্ত একটা কাব্যগ্রন্থেরই নাম ‘সংবাদ মূলত কাব্য’। তাই কাব্যসৃষ্টি আঁক কষে হয় না। পাঁজি দেখে হয় না। আবেগ চায়। দুর্নিবার বিশুদ্ধ আবেগ। তার পাথুরে প্রমাণ দিয়েছেন আঠারো শতকের শেষ দিক থেকে উনিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়কালের বিশ্ববন্দিত ইংরেজ চিত্রকর উইলিয়াম জোশেফ টার্নার (১৭৭৫-১৮৫১)। তাঁর মতো ঝড়ের ল্যান্ডস্কেপ আঁকার জুড়ি বিশ্বজুড়ে আজও জন্ম নেয়নি। তিনি শিল্পের জীবনের সঙ্গে নিজের শিল্পী জীবনের সংযোগ ঘটানোর তাগিদেই তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝার রুদ্ররূপ প্রত্যক্ষ করতেন। সেই ঝঞ্ঝা তিনি দেহে মনে আত্মায় মেখে নিতেন। মেখে নেওয়ার সেই দুর্নিবার তাগিদ পূরণ করতে তিনি অনন্য সাধারণ এক পন্থা অবলম্বন করতেন। প্রবল ঝড়-তুফানের সময় সমুদ্রে ভাসমান জাহাজের মাস্তুলের সঙ্গে নিজেকে তিনি আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখতেন। ঝড়ের প্রকৃতি ও চরিত্র আত্মীকরণের জন্য সেটা ছিল অসম্ভবের চেষ্টা। এ এক অসম্ভবের সাধনা বটে!
এখন প্রশ্ন হল, সাংবাদিক হব? নাকি সাংবাদিকতার নামে কর্পোরেট হাউসের মাস মাইনের কেরানি হব? কোম্পানির ফরমায়েসে পণ্য উৎপাদন করার কেরানি হতে চাইলে মাত্রাজ্ঞান থাকবে, পরিমিতিবোধ থাকবে ও বিশেষ ব্যবস্থায় হাঁটুজলে সাঁতার কাটার শুটিং করার এলেমও থাকবে। রাস্তার পাশের ডোবায় গলা ডুবিয়ে, গায়ে ব্যাঙের বাচ্চা ছেড়ে দিয়ে হাস্যবদনে ঝঞ্ঝার লাইভ দেওয়ার নাটকও চলবে। অন্যায় ভাবে দিল্লির নিজামিয়া মসজিদের অতিথি তবলিগিদের করোনা ছড়ানোর ভিলেন বানানো ভিডিয়ো ক্লিপিংস সম্প্রচার করার বেলায়, খাগড়াগড়ের ও ডোমকলের শৌচাগারের কয়েক ফুট গর্তকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার দূরে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তাল পদ্মার তলদেশ দিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার গোপনসুড়ঙ্গ পথ বলে প্রচার করার সময় মিডিয়ার মাত্রাজ্ঞান ও পরিমতিবোধের উপদেশ বেশিরভাগ মিডিয়া পণ্ডিতের কানের পাশ দিয়ে পালিয়ে যায়। বেশিরভাগ মিডিয়ার এমন গোয়েবলসীয় প্রচারের বিরুদ্ধে মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধের প্রশ্ন তখন উঠতে দেখা যায় না। রগরগে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিষ ছড়াতে গদি মিডিয়া জগতের পাণ্ডা এক ভক্ত গোস্বামীর চূড়ান্ত মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে প্রতিবেশী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ২০ কোটি মানুষকে বিপন্ন করে তুললেও মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধের সুপরামর্শ বাতাসে উড়ে না। আপামর মানুষের ক্ষতি নয়, সুচন্দ্রিমা কেবল একা তাঁর নিজের ও গাড়ির চালকের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিলেন। আর তাতেই মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধের পরামর্শ ভেসে আসে। ২০ কোটির বেলায় ঠোঁটে সেলোটেপ। এই রকম ‘সিলেক্টিভ’ মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধের প্রয়োগ আসলে অসুন্দরের বেদিমূলে অক্ষমদের অমার্জনীয় নৈবেদ্য প্রদান।
এখানে কয়েকটি ছবি দেওয়া হল। মাত্রাজ্ঞান থাকলে, পরিমিতিবোধ থাকলে ওই ছবিগুলো তোলা সম্ভব ছিল না। তার মধ্যে একটি ছবিতে ৭০ বছরের বৃদ্ধ, ম্যাগসেসে পুরস্করপ্রাপ্ত সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ মাটি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতায় নড়বড়ে, কাঁপতে থাকা বাঁশের সাঁকোর উপর পাতা দু’টি বাঁশের উপর দিয়ে পার হচ্ছেন। ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোনও একদিন হরিহরপাড়ার কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামে বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ (ছবিতে সামনের দিক থেকে দ্বিতীয়) প্রাণনাশের সমুহ ঝুঁকি নিয়েই কাঁপতে থাকা বাঁশের সাঁকো পার হয়েছিলেন জীবন হাতে নিয়ে। মাসকেট বাহিনীর ত্রাসে বিপন্ন জীবনের স্পন্দনের সঙ্গে নিজের জীবনের স্পন্দন মেলানোর আকাঙ্খায় জীবন অভিজ্ঞ, প্রৌঢ় সাংবাদিকের এই প্রাণান্তকর প্রয়াস। প্যাশন না থাকলে, বিশুদ্ধ আবেগ না থাকলে এ সব সৃষ্টি হয় না। আবেগহীন উৎপাদন কর্পোরেট হাউসের মাস মাইনের রোবটের তৈরি প্রোডাক্ট ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। ফলে সুচন্দ্রিমাদের ভূমিকা স্বাভাবিক নিয়মেই স্যালুটযোগ্য। কুর্নিশ করতেই হয় তাঁদের সুন্দর আবেগকে। আমার আরাধ্য সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ভাষাভঙ্গি ধার করে বলি, ‘নিশির ডাক’ পাওয়া এই সোনার মেয়ে সাংবাদিকতার স্বার্থে আবারও প্রবল প্রতিকূলতাকে জয় করবেন। সৎ ও সুন্দর সাংবাদিকতার স্বার্থে হিসাবি মনের মাত্রাজ্ঞান ও পরিমিতিবোধ বিপজ্জনক সময়ে অত্যাধুনিক মডিউলার কিচেনে আশ্রয় নেবে!

(উইলিয়াম জোশেফ টার্নারের আঁকা ছবিটি কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্তের সৌজন্যে পাওয়া।
অন্য ছবি ঋণ— দৈনিক ওভারল্যান্ড পত্রিকা ও আনন্দবাজার পত্রিকা)