সুগত সেন

(এক)
বছর কয়েক আগের কথা― সম্ভবত ২০১৩ সাল। উত্তর কলকাতার ‘বিজন থিয়েটার’এ ‘সংস্কৃতি সমন্বয়’-এর কনভেনশন। গোটা রাজ্যের নাট্যদলগুলির প্রতিনিধিরা সেই কনভেনশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, ‘ঋত্বিক’এর তরফে আমিও। অশোক মিত্র সেই কনভেনশনে অন্যতম আলোচক। আমার উপর ভার পড়লো তাঁকে তাঁর বাড়ি থেকে অনুষ্ঠান-স্থলে নিয়ে আসার। বয়স হয়েছে, হাঁটার সময় পা জায়গামতো পড়ে না, আমি তাঁকে সাহায্য করতে চাইলে তিনি বাধা দিলেন। বাড়ি থেকে গাড়ি অবধি টলমল পায়ে নিজেই এলেন। গাড়িতে ওঁকে বললাম, “আশির দশকের প্রথম দিকে কোনও একদিন আমার এক দাদা  আমাকে একটি বই দিয়ে বলেছিলেন― একজন অর্থনীতিবিদ কেমন চমৎকার বাংলা লেখেন পড়ে দেখ। ‘কবিতা থেকে মিছিলে’।  পড়লাম। তারপর থেকে আজ অবধি আমি আপনার কোনও বই সম্ভবত বাদ দিইনি।” অশোক মিত্র বললেন, “যিনি যে বিষয় নিয়েই পড়াশুনা করুন না কেন, প্রত্যেকেরই উচিত মাতৃভাষাটিকে যত্ন করে চর্চা করা।”
(দুই)
“একটি মেয়েলি ছেলে নাবালক ছাগলের মত
চঞ্চল, অধীর, ট্রামের জানালা থেকে হেরিলাম তারে
তাহার উড্ডীন দেহ ভায়োলেট রঙের সেমিজে
আহা কী বা মানায়েছে। ষাঁড়ের ভাগাড়ে
বিপন্ন বাছুর যেন অপরাহ্নে ঘাস খুঁজে ফেরে
কৃষ্ণচূড়ার গাছ লেনিনের পরমাত্মীয় ?
চাইনি, পেয়েছি তবু পৈতৃক ঋণ,
কতিপয় হাড় আর লবেজান এ হৃদয় প্রিয়।
আমাদের স্বপ্ন জানি হবে দানাদার,
দানাদার হয়ে যাবে পুরুষানুক্রমে,
অথবা নিশ্চিহ্ন হবে রুগ্ন পান্ডুলিপি
নিমগ্ন ইঁদুরের নির্ভুল বিক্রমে,
নাবালক ছাগলের প্রগলভতা সহা যায় জানি,
গ্যাংটক আর গাংচিলের প্রহার
মনোহরপুকুরের মনোরমা মুখুজ্জের মুখ
জীবনে আনন্দ যদি এনে দেয় দুদণ্ডের তরে।”
বিগত শতাব্দীর মধ্য চল্লিশে জীবনানন্দের পরিভাষা ব্যবহার করে জীবনানন্দকেই এই কবিতা উৎসর্গ করেছিলেন কবি অরুণ কুমার সরকার। জীবৎকালে তাঁর কাব্য-সংসর্গের যথাযথ স্বীকৃতি পাননি জীবনানন্দ। ভাবা যায়, “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে”র মতো অজস্র অমোঘ পংক্তির স্রষ্টা জীবনের শেষ দিনগুলি সামান্য দুশো-আড়াইশো টাকার চাকরির খোঁজে জুতোর সুকতলা ক্ষইয়েছেন! অভিমানী কবি তাই “মানুষটা মরে গেলে যদি তাকে ওষুধের শিশি / কেউ দেয় ― বিনি দামে ― তাতে কার লাভ” বলে সমকালের কাছে ব্যঙ্গসিক্ত অনুযোগ জানিয়েছিলেন।
ট্রাঙ্কের ডালার নিচে যে কবিতাগুলিকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন জীবনানন্দ, আমি একবার সেই কবিতার পাতাগুলিকে স্পর্শ করবার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছিলাম। মন্দিরের দরজা খুলে প্রতিমা দর্শনের সেই শিহরিত মুহূর্তগুলির কথা আজও মনে পড়ে। যদিও এলোমেলো কিছু অক্ষর, খাপছাড়া কিছু প্রসঙ্গ ছাড়া সেখানে বিশেষ কিছু ছিল না, তবু তো জীবনানন্দের নিজের হাতের ছোঁয়া বুকে ধরেছিল সে পাতাগুলি!
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে মঞ্জুশ্রীদি আমার সঙ্গে এমএ ক্লাসে পড়তেন। মঞ্জুশ্রী দাশ, জীবনানন্দের কন্যা। তিনি জার্মানিতে কর্মরত ছিলেন, সেখানকার কাজ ছেড়ে এসে কলকাতায় একটি লাইব্রেরিতে কাজ নেন। অতি সামান্য বেতনের কাজ, তাঁর বাবার মতোই খুব লো-প্রোফাইল মানুষ ছিলেন মঞ্জুশ্রীদি। কবিতা লিখতেন, কোথাও প্রকাশ করতেন না। আমি তখন ‘প্রাহ্ণ’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতাম, সেই পত্রিকার পাতা তাঁর কবিতায় সম্পন্ন করার অধিকার আমি পেয়েছিলাম।
কেন জানি না, মঞ্জুশ্রীদির অকৃপণ স্নেহ পেয়েছি আমি। মফস্বল শহর বহরমপুরের ছেলে, নবাবের দেশ থেকে ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত রাজধানী শহর কলকাতায় পড়তে গেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, ‘দল’ করেছি চুটিয়ে (এখনও করি, না করে উপায় কী!), কিন্তু ‘দলবাজি’ করিনি কখনো। তখন আমার বাইশ-তেইশ, স্বপ্ন দেখছি সুন্দর পৃথিবীর, সুন্দর জীবনের ( দুর্ভাগ্য, এখনও দেখি ! ), পড়াশোনা শিকেয় তুলে স্বপ্নসম্বল আমি গান-কবিতা-ছবি আঁকা আর আড্ডার আকাশে মেলে দিয়েছি দগ্ধ ডানা। হয়তো সে কারণে, কিংবা আমার বোধের অগম্য কোনো হেতুতে মঞ্জুশ্রীদি আমার মাথায় হাত রেখেছিলেন। ১৯৮৬ সাল নাগাদ, তিনিই আমাকে নিয়ে যান সেই বেহেস্ত-এর দোরগোড়ায়, যেখানে তাঁর পিতার নিভৃত সাধনা পারিজাতের মতো পুষ্পিত হয়েছে !
(তিন)
অশোক মিত্র ‘পুরানো আখরগুলি’ গ্রন্থটির ‘বিপন্ন বিস্ময়’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “…’রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে আর এক দফা প্রচুর ঢলাঢলি হবে, কেউ ভুলেও তথ্যটি উল্লেখ করবেন না এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত তথাকথিত কবিতাবলী আদৌ প্রকাশযোগ্য বলে তাঁর জীবদ্দশায় জীবনানন্দ নিজে অন্তত মনে করেননি, তোরঙ্গের গহন গভীরে তারা নির্বাসিত ছিল। একটু মনঃসংযোগ করলেই প্রতীয়মান না হয়ে পারে না, ‘রূপসী বাংলা’-র পদ্যগুলির অধিকাংশই একটি আর একটির অনুলিখন, … ‘রূপসী বাংলা’-র পুরোটাই তাই এক হিসেবে প্রক্ষিপ্ত, অপ্রয়োজনীয়।”
অশোক মিত্রের এই লেখা পড়তে পড়তে আমার মনে পড়ছে, কোনও মেঘলা দুপুরে কিংবা মোমজ্বলা আলোয় বুকের নীচে বালিশ, উপুড় হয়ে মশারির নিভৃতে ‘রূপসী বাংলা’-র কবিতাগুলি পড়ে কতই না কেঁদেছি!
(চার)
১৯৫৭-র অগস্টে, জীবনানন্দ দাশের প্রয়াণের পরে প্রকাশিত হয় ‘রূপসী বাংলা’। এই গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলির রচনাকাল যদিও তিরিশের দশকের গোড়ার দিক। কোনও কবিতারই আলাদা করে কোনও শিরোনাম নেই, কিন্তু কবির নির্বাচিত প্রচ্ছদনাম ― ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’। কবির নিজের দেওয়া এই প্রচ্ছদনাম থেকেই অনুমান করা যায়, এই কবিতাগুলি প্রকাশের ইচ্ছে কবির ছিলো, হয়ত পরিমার্জনার প্রয়োজন ছিলো, তাই ট্রাঙ্কের ডালার নীচে কবিতাগুলিকে পরিমার্জনার জন্য অপেক্ষমান রেখেছিলেন কবি। দুর্ঘটনাজনিত অকালপ্রয়াণ তাঁকে অবকাশবঞ্চিত করে!
‘রূপসী বাংলা’র প্রত্যেকটি কবিতাই কাঠামোগতভাবে সনেট। এই সনেটগুলি সম্পর্কে কবি স্বয়ং বলেছেন, “এরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা, স্বতন্ত্র সত্তার মতো নয় কেউ, অপরপক্ষে সার্বিকবোধে একশরীরী, গ্রামবাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ-প্রসৃতির মতো ব্যষ্টিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পরনির্ভর।”
এখন প্রশ্ন এই, রূপসী বাংলা-র কবিতাগুলি যদি একটি অপরটির অনুলিখন হয়, তবে তারা পরস্পরের পরিপূরক বা পরস্পরনির্ভর হয় কী করে? ‘পরস্পর’ শব্দটিতেই কবিতাগুলির পৃথক সত্তার অস্তিত্ব অনুভূত হয় না কি ? দ্বিতীয়ত, কবিতাগুলির দেহ সাজানো হয়েছে অজস্র অপূর্বচয়িত উপমায়। আর তাদের চৈতন্যে রয়েছে ইতিহাস, প্রকৃতি, রয়েছে অমোঘ মৃত্যুর হৈম আর তার মধ্যে থেকেও জমে উঠেছে বাংলার প্রতি অনির্বচনীয় এক গাঢ় সংরাগ। উপকথা, রূপকথা আর অতিকথার মানুষজন নিয়েই জেগে উঠেছে রূপসী বাংলাদেশ, যার রূপ শুধু বহিরঙ্গের নয়, অন্তরঙ্গেরও। ‘জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের’, ‘কিশোরীর চাল-ধোয়া ভিজে হাত’, ‘কিশোরের পায়ে-দলা মুথাঘাস’ আর নদীর চড়ায় কৃষ্ণাদ্বাদশীর মৃত জ্যোৎস্নার ক্যানভাসে যে লোকায়ত পুরাণকে স্থাপন করেছেন কবি, সে ছবি থেকে উৎসারিত একটা স্নেহময় দরদী হৃদয়ের আদরকেও দিব্য অনুভব করা যায়।
রূপসী বাংলায় বিধৃত ইতিহাসের বিশাল ব্যাপ্ত ক্যানভাসের সামনে যখনই আমরা অসহায় বোধ করেছি, তখন কবি আমাদের বারবারই পৌঁছে দিয়েছেন ঘরোয়া সন্নিধির ঘনিষ্ঠ আশ্রয়ে। রোম-এশিরিয়া-ব্যাবিলনের ধুলো এখানে এসে জমেছে ধলেশ্বরী নদীর তীরে, সেই ধুলোর ‘পরে গজিয়ে ওঠা মুথাঘাসে পা ফেলে আমরা নিশ্চিন্ত বোধ করি, আরাম বোধ করি। রূপসী বাংলা-র কবিতাগুলি কফিনের ডালার নিচে মৃত্যুঘুমে নিষ্পন্দ থাকলে আমরা, হাজারো ব্যারামক্লিষ্ট বঙ্গভাষী, এই নিশ্চিন্তির শ্বাসটুকু থেকে, এই আরামটুকু থেকেও বঞ্চিত হতাম না কি ?
২০১৮ সাল, পয়লা মে-র সকালে খবর পেলাম, ‘কবিতা থেকে মিছিলে’-র কবি অশোক মিত্র আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। মনে পড়লো, তাঁর লেখাগুলি পড়তে পড়তে বারেবারেই তাঁর সাথে ভিন্নমত হয়েছি, তাঁর সাথে মনে মনে কতই না তর্ক করেছি, কোনওবারই তর্কে জিততে পারিনি।
কিন্তু ‘রূপসী বাংলা’ প্রসঙ্গে কিছুতেই হারতে চাই না ― কারণ এই জয়ের অধিকার, যাবতীয় যুক্তিতর্ক বাদ দিয়েও, আমি অশ্রুমূল্যে অর্জন করেছি!