সুদীপ জোয়ারদার

শরীরটা খারাপ অনেকদিন ধরেই। তার উপরে মাতৃশ্রাদ্ধের ধকল। জীবনের আশা ত্যাগ করেছেন নিজেই। সারাদিন কাটে বিছানায়।
সকালের দিকটা একটু ভাল থাকেন। তখন খবরের কাগজ পড়ে শোনানো হয়। তাতে শরীরের সঙ্গে মনটাও মাঝেমাঝে খারাপ হয়ে যায়। কারণ খবর মানেই তো ইংরেজ সরকারের নানাবিধ অত্যাচারের  কাহিনি। সে সব শুনে কখনও বলেও ওঠেন, ‘আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না।’
এরই মধ্যে একদিন উত্তেজনায় বিছানায় উঠে বসলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। তাঁকে পড়ে শোনানো হয়েছে ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করার চিঠিটি। কিছুদিন আগেই ঘটে  গিয়েছে জালিওয়ানালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সে খবর শুনে সেদিন বিচলিত বোধ করা ছাড়া আর উপায় ছিল না রামেন্দ্রসুন্দরের। আজ তারই যোগ্য প্রতিবাদ কবির।
—‘আপনি অসুস্থ, উঠে বসা ঠিক নয় আপনার!’ সবাই জোর করে তাঁকে বিছানায় শোয়াতে গেলেন।
রামেন্দ্রসুন্দর বললেন, ‘আজ উঠে বসব না তো কবে বসব! আমার কী মনে হচ্ছে জানো? মনে হচ্ছে ছুটে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে আসি।’
—‘অসুস্থ না হলে তো যেতেই পারতেন। কিন্তু আপনি যে উঠে বসতেই…’  বললেন ভাই দুর্গাদাস।
—‘অসুস্থতার জন্য এত বড় একটা কর্তব্য পড়ে থাকবে দুর্গাদাস!’ রামেন্দ্রসুন্দরের গলায় একরাশ বিষণ্নতা।
‘সবুজপত্রে’র সহকারী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ও সেদিন রামেন্দ্রসুন্দরের শয্যাপাশে। রামেন্দ্রসুন্দর তাঁকে শুধোলেন, ‘কবি এখন কোথায়, জানো কি পবিত্র?’
কবি কলকাতায় এসেছেন। পবিত্রবাবু শুনেছেন। রামেন্দ্রসুন্দরকে জানালেন সে কথা।
—‘কবি কলকাতায়! তবু তাঁর পায়ের ধুলো নিতে পারব না! এত বড় একটা দুঃখ নিয়ে মরতে হবে দুর্গাদাস?’ হতাশায় গলা বুজে এল রামেন্দ্রসুন্দরের।
দুর্গাদাস পরের দিন কবির সঙ্গে দেখা করে দাদার অসুস্থতা এবং দুঃখের কথা জানিয়ে বললেন, ‘একটিবার যদি আপনি তাঁর কাছে যান…’
রামেন্দ্রসুন্দরের প্রতি কবির মনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তাঁর পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে তিনি যে অভিনন্দনবার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে রামেন্দ্রসুন্দর সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তোমার হৃদয় সুন্দর, বাক্য সুন্দর, তোমার হাস্য সুন্দর…।’ এমন মানুষের প্রার্থনায় কবি সাড়া দেবেন এ আর বেশি কথা কী! সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলেন।
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩২৫ (ইংরেজি ১৯১৯)। কবি এলেন রামেন্দ্রসুন্দরের পটলডাঙার বাড়িতে। সকাল থেকেই সেদিন রামেন্দ্রসুন্দর চঞ্চল। কবির আসার আশায় বার বার তাকাচ্ছিলেন বাইরের দিকে। রবীন্দ্রনাথ ঘরে ঢুকতেই তিনি উঠে বসতে চাইলেন। সবাই জোর করে শুইয়ে দিলেন তাঁকে। কিন্তু শুইয়ে দিলে তাঁর পায়ের ধুলো নেবেন কী করে? একটু যেন চিন্তিত দেখাল রামেন্দ্রসুন্দরকে।
—‘খুব কাহিল হয়ে পড়েছেন, দেখছি!’ বললেন রবীন্দ্রনাথ।
—‘যাবার পালাটুকু বাকি!’ হাসলেন রামেন্দ্রসুন্দর।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘যাব বললেই হল? দেশের লোকের এখন কত প্রয়োজন আপনাকে! সেরে উঠুন।’
রবীন্দ্রনাথ আসবেন শুনে সেদিন হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও এসেছেন রামেন্দ্রসুন্দরের বাড়িতে। কবির কথার রেশ ধরে তিনি বললেন, ‘আপনি চলে গেলে, বুদ্ধির, জ্ঞানের, চরিত্রের, উদার হৃদয়তার এমন অপূর্ব সমাবেশ আর কোথায় পাব আমরা!’
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আপনার দেশপ্রীতিরই আর জোড়া পাওয়া যাবে কোথায়? আপনার হৃদয় যে কত বড় তা বুঝেছিলাম, প্রবল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে আমার পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে যখন প্রশস্তি সভার আয়োজন করেছিলেন!’
রামেন্দ্রসুন্দর এ সব শুনে চুপ করে রইলেন। রবীন্দ্রনাথ বুঝলেন, আত্মপ্রশংসা শুনতে অস্বস্তি হচ্ছে সদাবিনয়ী, নিরহঙ্কার মানুষটির। ক্ষণকাল মৌন থেকে রামেন্দ্রসুন্দর বললেন, ‘আপনাকে আমি এখানে টেনে এনেছি এক বিশেষ অভিপ্রায়ে। আমরা কেউ যা করতে পারিনি, আপনি তাই করেছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ। আপনার পায়ের ধুলো নিয়ে আমি ধন্য হতে চাই।’
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘তা কী করে হয়? আপনি বিজ্ঞ মনীষী, বয়সে একটু বড় হওয়ার জোরে এ অপমান আপনাকে করতে পারি না আমি।’
—‘শুধু বয়সে বড়! আপনি সূর্য আর আমি মাটির মানুষ। আমাদের মধ্যে কয়েক লক্ষ যোজন দূরত্ব।’ রামেন্দ্রসুন্দর আবার হাসলেন তাঁর সেই স্নিগ্ধ হাসিটি।
দুর্গাদাস বললেন, ‘যেদিন আপনার চিঠি বের হল, সেদিন থেকেই অবিরত বলে চলেছেন। আপনার পদধূলি না নিলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।’
একটু ভাবলেন কবি। তারপর বললেন, ‘ওঁকে দুঃখ দেওয়া বন্ধুকৃত্য হবে না।’
প্রণামের ব্যবস্থা হল। একটা টুল এনে রাখা হল রামেন্দ্রসুন্দরের বিছানার কাছে। রবীন্দ্রনাথ দাঁড়ালেন সেই টুলের উপর। রামেন্দ্রসুন্দর রবীন্দ্রনাথের পায়ে অনেকক্ষণ হাত বুলিয়ে সেই হাত কপালে, বুকে ঠেকালেন। প্রণাম পর্ব শেষ হলে, রামেন্দ্রসুন্দর কবির সেই চিঠির কাটিংটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আর একটা আবদার আছে। এই চিঠিটা আপনার মুখে একবার শুনতে চাই।’
রবীন্দ্রনাথ চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগলেন, ‘Your Excellency, The enormity of the massacars…’। পড়তে পড়তে রবীন্দ্রনাথের চোখেমুখে অত্যাচার আর নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এমন বজ্রমূর্তি ধারণ করল যে মনে হল, রুদ্রের পিনাক ও ডমরু বেজে উঠেছে একসঙ্গে।
পড়া শেষ হতে রামেন্দ্রসুন্দর বলে উঠলেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।’ রবীন্দ্রনাথ বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। শান্ত হয়ে শুয়ে রইলেন রামেন্দ্রসুন্দর। ডাক্তার এসে বললেন, ‘আজ তো ভালোই দেখছি!’ কিন্তু ডাক্তার চলে যাওয়ার পরেই রামেন্দ্রসুন্দরের শ্রবণশক্তি লোপ পেল, তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সে ঘুম আর ভাঙল না। ২৩ জ্যৈষ্ঠ (৬ জুন), রাত্রি ১০টার সময় রামেন্দ্রসুন্দর চলে গেলেন সাধনোচিত ধামে।
উপস্থিত সকলে ‘হায়’ ‘হায়’ করে উঠলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আক্ষেপের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘কিচ্ছু করা গেল না, কিচ্ছু না, আমাদের চোখের সামনে ডুবে গেল বিদ্যার একটা বড় জাহাজ!’

(ফিচার ছবি গুগল থেকে নেওয়া)