শুভদীপ ভট্টাচার্য বহরমপুর

বহরমপুর গার্লস কলেজের প্রাক্তন অধ‌্যাপিকা, বিশিষ্ট সমাজকর্মী সুজাতা দে বসু চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। সুজাতাদেবীর মৃত‌্যুতে শোকস্তব্ধ মুর্শিদাবাদ। জানা গিয়েছে, সেপ্টিসিমিয়ায় ভুগছিলেন তিনি।
সমাজের জন‌্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সুজাতাদেবী। আপামর সমাজের জন‌্য নানাবিধ কর্মকাণ্ডে ব‌্যাপৃত ছিল তাঁর জীবন। বহরমপুর বিজ্ঞান মঞ্চের অন‌্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। ছিলেন বহরমপুর বিজ্ঞান মঞ্চের আজীবন সদস‌্য। তাঁরই উদ‌্যোগে সমাজচেতনামূলক নানা কর্মকাণ্ডে সমৃদ্ধ হয় বিজ্ঞানমঞ্চ। স্টুডেন্টস হেলথ হোম গড়ে তোলার নেপথ্যে অন‌্যতম কা​রিগর ছিলেন সুজাতা দে বসু। রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির বিস্তার ও মুসলিম তালাকপ্রাপ্ত মহিলাদের জন‌্য সামাজিক লড়াইয়ে ছিলেন বলিষ্ঠ মুখ। রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির সভাপতিও ছিলেন তিনি।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া কর্মরত মহিলাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সুজাতাদেবীর বিশেষ ভূমিকা ছিল। বানজেটিয়া এলাকায় ৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের জন‌্য তৈরি করেছিলেন রেজাউল করিম প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র। নীলিমা শিশু শিক্ষা নিকেতন নামে আরও একটি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে তাঁরই উদ‌্যোগে। সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার লক্ষ‌্যে তিনি এই দু’টি অবৈতনিক শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলেন নিজস্ব উদ‌্যোগে।
পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের ক্ষেত্রে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল, যুক্ত ছিলেন পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা কমিটির সঙ্গেও। কারাগারে যাবজ্জীবন দণ্ডে দণ্ডিত আবাসিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের জীবনের বিবিধ ঘটনাকে কেন্দ্র করে লিখেছেন অজস্র গল্প। কারাগারে ‘জেল ভিজিটর’-এর পদেও আসীন ছিলেন প্রায় চার বছর। অজস্র বস্তুনিষ্ঠ, তথ‌্যসমৃদ্ধ প্রবন্ধ লিখেছেন নানা পত্রপত্রিকায়।
সমাজজীবনে মেয়েদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে বরাবরই সুচিন্তিত পদক্ষেপ করেছেন তিনি। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অজস্র মায়েদের জীবনকে লেখনীতে দিয়েছেন সামাজিক স্বীকৃতি। তাঁর লেখা ‘আমার পাঁচ মা’ বইটি ‘মা’দের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ‌্য। সুজাতা দে বসু’র প্রয়াণে বহরমপুরবাসী হারালেন এক অভিভাবককে। এমন যুক্তিবাদী, প্রগতিশীল, মুক্তমনা চরিত্রের প্রয়াণে শোকাতুর বহরমপুরের নাগরিক সমাজ।
মুর্শিদাবাদ বিজ্ঞান মঞ্চের সভাপতি তপন সামন্ত বলেন, “আমি ভীষণ শোকাহত। বিজ্ঞানমঞ্চ গড়ে তোলার প্রথম দিন থেকে তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৯২ সালে শিশু বিজ্ঞান উৎসব সফল করার জন‌্য তিনি সবরকম সহায়তা করেছেন। মহিলা ও সমতা সংক্রান্ত নানাবিধ কর্মসূচিতে তিনিই ছিলেন অন্যতম মুখ।’’
রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতির সম্পাদিকা খাদিজা বানু বলেন, “আমি ওঁর ছাত্রী। পরে একসঙ্গে বহু ধরনের সামাজিক কাজ করেছি। আমার মধ‌্যে সামাজিক বোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে ওঁর ভূমিকা অনন‌্য। তিনি নিজেও সামাজিক আন্দোলনে সবসময় সামনের সারিতে থাকতেন। সুজাতা দে বসুর মৃত‌্যুতে জেলা একজন উদারচেতা, যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন, মানবদরদী অভিভাবক হারাল। আমি অভিভাবক হারালাম।”