দেবদূত ঘোষঠাকুর

বর্ষার বর্ণনায় ‘আষাঢ়’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার ঘন কালো মেঘের মধ্যে যে বিপদ লুকিয়ে রয়েছে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন— ‘দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ্ দেখি, মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি?’ অর্থাৎ খোলা মাঠে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের নিয়ে কবি যে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন তা ওই একটি লাইনেই স্পষ্ট। কবি সতর্ক করেছেন, ‘ওগো আজ তোরা যাস নে গো তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’
প্রতি বছর বর্ষার ঠিক আগে এবং বর্ষার প্রাথমিক পর্বে বজ্রপাতে দুই বাংলা মিলে শতাধিক লোকের মৃত্যু হয়। ঠিক মতো তথ্য সংগ্রহ করলে দেখা যাবে, প্রায় সকলেই বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় ছিলেন। শতকরা ৯০ জন মাঠে কাজ করছিলেন। ০৭ জুন, সোমবার দক্ষিণবঙ্গে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় ২৭ জনের। তাঁরা প্রায় সবাই কাজ করছিলেন মাঠে। অনেকেই বলছেন, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস বেশ কয়েক দিন আগে থেকে দেওয়ায় আগেভাগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু বজ্রপাত আকস্মিক। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কী করে?
আমরা ছোটবেলায় স্বাস্থ্য বলে একটা বিষয় পড়তাম। সেখানে নিজেকে কী ভাবে সাফসুতরো রাখা যায় তার প্রাথমিক নিদান দেওয়া থাকত। তেমনই ভূগোল পড়তাম। সেই ভূগোল বইয়ে বিভিন্ন ধরনের মেঘের ছবি থাকত। কোন মেঘ বছরের কোন সময়ে আকাশে দেখা যায়, কোন মেঘে কী হয়— সে সম্পর্কে আমাদের একটা স্বচ্ছ ধারণা হত। ছোটবেলার সেই শিক্ষাই চল্লিশ বছর বয়সে আবহাওয়া সংক্রান্ত রিপোর্টিং করতে গিয়ে কাজে লেগে গেল।
গরম কালে, বর্ষার বেশ কিছুটা আগে থেকেই আকাশে উল্লম্ব মেঘ তৈরি হওয়া শুরু হয়। ওই উল্লম্ব মেঘ নিজের মধ্যে যত জলীয় বাষ্প ধারণ করে তত তার দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকে। একেই বলে বজ্রগর্ভ মেঘ। ঘর্ষণজনিত কারণে এই মেঘ যদি ভেঙে যায় তা হলেই বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি নামে। রবীন্দ্রনাথের ‘আষাঢ়’ কবিতায় যে মেঘের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে তা ওই উল্লম্ব মেঘেরই।
সোমবার বিকেলে আমাদের গাঙ্গুলিবাগানের বাড়ির ছাদে বসে যে আকাশ কালো করা মেঘ চোখের সামনে জমতে দেখেছি, তার থেকে যে বজ্রপাত হবে সেটা বুঝতে সাত তাড়াতাড়ি আমরা ছাদ থেকে নেমে এসেছিলাম। দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমার বাসিন্দা, আমার বাড়ির সহায়িকা বলছিলেন, ‘‘মামা পালিয়ে এসো। ভীষণ জোরে বাজ পড়বে কিন্তু!” আমার বাড়ির সহায়িকা বিষয়টার গুরুত্ব বোঝেন। অর্থাৎ তাঁরা জানেন, কোন ধরনের মেঘ থেকে কী হতে পারে। তবুও কেন মানুষ সতর্ক হন না?
বিশ্বকবির সতর্কবাণীর মতো স্থানীয় প্রশাসন যদি একটু সক্রিয় হয়ে, ‘যাঁরা মাঠে আছেন, সাময়িক ভাবে ঘরে ফিরে যান’ এই প্রচারটা চালান তা হলে সব জেনেও ‘অজ্ঞেয়’ হয়ে থাকা মানুষকে হয়তো সচেতন করা যাবে। আর আবহাওয়া দফতরের ভূমিকাও এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের সতকর্তা যদি লাগাতার প্রচার করা যায়, তাহলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরির সূচনা থেকে তার ভেঙে পড়া পর্যন্ত কেন কোনও সতর্কবার্তা আবহাওয়া দফতর দেবে না সেই প্রশ্নও কিন্তু উঠতে বাধ্য। রাজ্য সরকারের বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের ভূমিকাও এখানে উল্লেখযোগ্য। আসলে কাগজে-কলমে এত লোকের মৃত্যু হলেও বজ্রপাত কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। কী বিচিত্র এই দেশ!
প্রকৃতির কাছে আমরা কতটা অসহায় তা বারবার আমরা উপলব্ধি করেছি। কোভিডে যতটা সম্ভব ঘরের মধ্যে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা। প্রবল ঘূর্ণিঝড় বা ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস ঘর বাড়ি ভেঙে মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে দিচ্ছে। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দূখিয়ে ত্রাণ শিবিরের ছোট্ট একটা ঘরে সবাইকে গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য করছে। ভূমিকম্পের সময় বলা হচ্ছে, ঘর ছেড়ে খোলা জায়গায় চলে যেতে আবার বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায় ঠিক উল্টো। খোলা মাঠ থেকে চলে আসতে হবে ঘরে। ভূমিকম্পের প্রাক মুহূর্তেও কোনও পূর্বাভাস থাকে না। কিন্তু আকাশে মেঘের ধর্ম দেখেই গ্রামের বহু মানুষ বুঝতে পারেন, ওই মেঘ একবার ভেঙে গেলে তার ফল কী হতে পারে।
আসলে আমরা জানি সব। কিন্তু বুঝি না!